ফ্যাকাশে আত্মা ও একটি আনকোরা কালার প্যালেট সম্পর্কে এই মাত্র যা ভাবলাম/দেবজিৎ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়

পর্ব ৫

 

ঝ।

” clean the windows, there is a world behind them”

এই পর্বে পৌঁছানোরই ছিল। সারা ও হেনরির ইদানীং এর অশান্তি চরমে উঠেছে। হেনরি ও সারা হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছালে, আমাকে নাক গলাতেই হলো। সারা তাদের বেডরুম থেকে একটা বড় প্লাস্টিক ( যা সম্ভবত জামাকাপড় কিনলে দেয়) এনে হেনরির দিকে ছুঁড়ে দেয়। সম্বিত ফিরতে দেখা গেল, প্লাস্টিক থেকে ব্যবহৃত কন্ডোম বেড়িয়ে পড়েছে। আমার গা গুলিয়ে ওঠে। হেনরি সোফায় মাথা নিচু করে,তালু তে তার মুখ ঢাকা। সারা গজরাতে গজরাতে বলে,”তুই আমাকে এতবার লাগিয়েছিস…এতবার…বেশ্যার ব্যাটা গোন… মফস্বলের দিকে যখন থাকতাম বছর দুই আগে…একবার পেট করে দিয়েছিলিস…মনে আছে?…নাকি ওই মাগির গুদে তোর ফ্যাদার মত ঘিলুও ঢেলে এসেছিস?”।

সারা তাদের সমস্ত সঙ্গমের সাক্ষ্যপ্রমাণ রাখতো। হয়তো খুব ভালবাসা থেকেই। কিন্তু আমার গা গোলাচ্ছে। সারা ঘরে কিরকম একটা ভ্যাপ্সা গন্ধ ভরে গেছে। আমি সিগারেট জ্বালাতে বাধ্য হলাম। হেনরি হাঁটুর মধ্যে মুখ ঢেকে ফেলে।

সারা তখনও বলে চলেছে,”কি আছে ওই মাগীর? ওই তো চুপসানো বুক,খুদে খুদে পাছা। কি দেখে গেছিস? আমার গুলো দেখ। দেখিস নি? ” বলে বিচ্ছিরি ভাবে নিজের বাঁ হাত দিয়ে নিজের বাঁ বুক টা ঠেলে ধরে। হেনরি আরো মাথা নিচু করে।

আমি গলা খাঁকারি দিলে, সারা খানিক চুপ হয়।হেনরি মাথা তোলে। শান্ত ভাবে বলে,”আমি আর থাকবো না”। সারা তেড়ে গিয়ে বলে,”কোথায় যাবি? ও মাগীর খোঁয়াড়ে? সালা একটা বুড়ির প্রেমে তুমি পাগল? মিস ব্ল্যাক ঠিক বলেছিলো, ওই ডাইনি তোকে বশ করেছে”। আমার দিকে তাকিয়ে বলে,”দেখো,ভালো করে দেখো,ওর চোখ মুখ কদিনেই কেমন পালটে গেছে না?”।

রাত প্রায় আড়াইটে। হেনরি নিজের যা কিছু নিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে। আমার মাথার মধ্যে শান্তি লাগছে কোথাও। সারা ডাইনিং এর কোণে বসে চেপে চেপে গোঙাচ্ছে। আমার সামনে এসে বলে,” আমি জানি এতদিন ওই গানটাকে তুমি আসলে ভীষণ যৌনতার গান ভাবতে। আমি ইচ্ছা করে তোমার ধারণা ভাঙিনি। আজকের পর আমাদের আর কোনদিন দেখা হবে না হয়তো। তাই বলে যাচ্ছি। আসলে ওটা বিপ্লবের গান। রাজতন্ত্রের অবসান চেয়ে গান। এই গানের গীতিকারকে প্রকাশ্য রাস্তায় মাথা কেটে মারা হয়। তখন তার আট বছরের মেয়েটি এই গানটা গাইছিলো পুতুল খেলতে খেলতে”।

সারা শেষমুহুর্ত পর্যন্ত হেনরি কে অভিশাপ দিলো। হেনরি শেষ বারের মত বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছে। আমি ব্যালকনি থেকে দেখছি,রাস্তার পরিচিত কুকুর গুলোও ঘুম ভেঙে হেনরির দিকে তাকিয়ে। হেনরি একজনের কান নেড়ে দিলো,গলা চুল্কে দিলো। কিছু বলছেও সম্ভবত। তারপর এক সময় হেনরি মোড়টা ছাড়িয়ে ফেলার পর তাকে দেখা যাচ্ছিলো না। যদিও তারপরেও দাঁড়িয়ে থাকতে ভালোই লাগছিলো। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। সিগারেট ধরাই। সারা সেই একই জায়গা থেকে গুঙিয়ে বলে ওঠে,”ফিরে এসো…আমি ভালো নেই”।

 

জ।

” lady, though you carried a poet in your womb,I carry it in my brain ”

হেনরির কাব্য প্রতিভা যে বেশ ছোঁয়াচে তা আরো দুদিন বাদে বোঝা গেল। সবে শহর থেকে ফিরেছি। ক্লান্ত লাগছে খুব। ফেরার পরে পরেই মিস শূন্যের ভোলাভালা চাকরটা আসে( যাকে সারা ‘কালো বিড়াল’ বলে ডাকে) একটা ফ্যান্সি খাম নিয়ে। হেনরির হাতে তা দিয়ে সে যথারীতি আওয়াজ না করেই ফিরে যায়। আমাদের মেইন গেটটার নাট বল্টুগুলো জং লাগা,তবুও তার হাতে যে কি করে আওয়াজ হয় না -সেটা আশ্চর্যের বিষয়।

হেনরি খামটা যত্ন করে ছেঁড়ে।এত সুন্দর খাম বিচ্ছিরি ভাবে,একটানে ছিঁড়ে ফেললে বেশ খারাপই লাগতো। তার ভেতর দামী কাগজে কিছু লেখা। আমি বাথরুম ঘুরে আসার পরও, যাতে মোটামুটি ৫মিনিট সময় তো লেগেইছে,দেখি হেনরি তখনও তা পড়ছে। একটা হাল্কা ‘বাহ’ বলে, আমার দিকে কাগজখানা এগিয়ে দিতে দিতে বলল, দেখো মিস শূন্য কি কান্ডটাই না করেছেন। দেখলাম,তাতে নাতিদীর্ঘ একটা কবিতা লেখা। যথারীতি সেই কাগজ দিয়ে গন্ধ ভুরভুর করছে। যদিও আগের দিনের থেকে আলাদা। কবিতাটা এরকম-

“আমি চর্বি ঝড়িয়ে
লাস্যময়ী হয়ে উঠেছি
এসো
চেখে দেখো হার্ডকোর
নৌকাগুলিকে যেমন পিষেছো
বন্দরে জমা হওয়া মরা মাছের লাশের মত গন্ধ আমার ভালোবাসায়
ইতিউতি ঠোঁট উড়ে আসে
আমি তাদের প্রত্যেককেই খাঁটি চুমু খেয়ে থাকি,
গাঢ় কাজল পরি রোজ বিকেলে
পোষ্য পায়রারাও ফিরে আসছে ঠিকঠাক

এক মাঠ দাপানো বালকের সুখের কান্না,কাকুতি ও পাগলামিতে
আমি ভুলে যাই
আর বছর পাঁচের বাদেই
আমার মনোপজ”

ম্যাডাম শূন্য
২৬/৬/১৫

আমার পড়া শেষ হলে,হেনরি ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে,কেমন?
– ভালোই।
– শুধু ভালোই? অসাধারণ না?

আমি হাসি।এড়িয়ে যাওয়ার হাসি।

সারা এসব কিছুতেই ছিল না। সে রাগী ময়নার মত বারান্দায় ফুঁসছিলো। যাকে ছোলা দিতে গেলেই আঙুল ফুটো করে দেবে ক্রোধে। আজ অশান্তি বাঁধলে আমাকে আজ কথা বলতেই হবে। কারণ এই বাড়ির সমান ভাড়া আমিও দি ও দীর্ঘদিন চলতে থাকা অশান্তি আমার মোটে ভাললাগে না।

 

ফ্যাকাশে আত্মা ও একটি আনকোরা কালার প্যালেট সম্পর্কে এই মাত্র যা ভাবলাম পর্ব ৪

Facebook Comments
শেয়ার

One Reply to “ফ্যাকাশে আত্মা ও একটি আনকোরা কালার প্যালেট সম্পর্কে এই মাত্র যা ভাবলাম/দেবজিৎ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *