‘রিফিউজি ক্যাম্প’ বলতে আপনি কী বোঝেন : শুভদীপ মৈত্র

শুভদীপ মৈত্র, কবি, গদ্যকার, সাংবাদিক। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির স্নাতক ও সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর। সাংবাদিকতা দিয়ে জীবন শুরু। টেলিভিশনের নানা সংবাদ চ্যানেলে, খবরের কাগজেও কিছুদিন। ২০০৯ সালে মূলধারার সাংবাদিকতা ছেড়ে পুরোপুরি লেখার সঙ্গে যুক্ত হন। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই সাহিত্য চর্চা করেন। বাংলায় প্রথম কবিতার বই ‘জাদুকরি বইঘর’ প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে, দ্বিতীয় বই ‘আদার ব্যাপারী যাবে আর্মেনী ঘাটে’ ২০১৬।  

প্রথম উল্লেখযোগ্য গল্পের প্রকাশ বাংলাদেশের কালি ও কলম-এ। তাঁর গল্প শূন্য দশকের গল্পের একটি সংকলন গ্রন্থ ‘শূন্য দশকের গল্প সংগ্রহ’-তে প্রকাশিত। সাহিত্য একাডেমির পত্রিকা  ইন্ডিয়ান লিটারেচার সহ আরো নানা দেশ বিদেশের কাগজে তার লেখা ও লেখার অনুবাদ ছাপা হয়েছে। করেছেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের অনুবাদ।  

 ঘুরেছেন দেশের নানা প্রান্তে যোগ দিয়েছেন সাহিত্য উৎসব, সেমিনার ও কর্মশালায়। ২০১৪ সালে হিন্দু লিট ফর লাইফ ফেস্টিভালে প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের নির্বাচিত ২৫ জন কবির একজন। সাহিত্য একাডেমির যুব সাহিতি-তে আমন্ত্রিত কবিতা পাঠের জন্য একই বছর। কাহানি পাঞ্জাব-এর উদ্যোগে ডালহৌসি-তে গল্পের কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন।

 

******সাদিক হোসেন-এর ‘রিফিউজি ক্যাম্প’ বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া******

 

স্টোরিটেলারকে আমি চিনি বেশ কিছুদিন ধরে – সে সিগারেটখোর, দোক্তা, গুটখা, পান-পরাগেও তার আপত্তি নেই, সঙ্গে বিয়ার গাঁজা চরস – এমত স্টোরিটেলার আমার সঙ্গে বাস করে বহুকাল বলে মনে হয় তারপর সন্দেহ কারণ স্টোরিটেলার গল্প বলছে এই তার কাজ এ ভিন্ন তার কোনো পরিচয় আমাদের কাছে থাকতে পারে না তবু স্টোরিটেলারের কাজ তাকে ক্রমশ আমার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। গল্প যে বলে তা তো বানিয়েই বলে তার শুধু একটাই গল্প নয় ঝোলায় নিত্য নতুন নব নব কলেবরে গল্প চাই নাহলে লোকে শুনবে কেন আসবে কেন অথচ স্টোরিটেলার নিজে সেই গল্পের ভিতর ঢুকে পরে চিত্তির বাঁধিয়ে বসে আছে। তার কোনো দেশ নেই সাকিন ঠিকানা মুছে যাচ্ছে একটা বড় রিফ্যুজি ক্যাম্পে সে কীসের মাজাকিতে ধুর তার আবছা আবছা কিছু ছবি পাওয়া গেল যেমন জলছবি লাগাতে গেলে ঘষা ঘষা আধখানা সিকিখানা ছবি ভেসে উঠত।

এযাবৎ মোকাম কলকাতা ও তার লাগোয়া শহরতলী ও মফঃস্বল ঢুঁড়ে যে গল্প তুলে এনেছে সময় তার সঙ্গে কতটাই বা যোগ রাখি আমি বা স্টোরিটেলার কিন্তু তাহলে এগুলো কী –

 

এটা কী সাইকাডেলিয়া না বিভ্রম?

এটা কী কমলকুমার না জীবনানন্দ?

এটা কী ঠাট্টা না ডাইরেক্ট পোঁদে লাথ?

 

কীভাবে একটা গল্পের কথনের মধ্যে ঢুকে পড়ে তারপর তার ভিতর অন্তর্ঘাত করা যায়, মোকাম্মেলের আশিস নন্দী বা কমরেড সেরির স্টোরিটেলার জানে, জানে গল্প মানে একটা বারুদ অথবা স্রেফ ধাপ্পা, ভুল – বারুদ এবং স্রেফ ধাপ্পা। রিফিউজি ক্যাম্প তাই অনুচিত ভাবে স্টোরিটেলারের মতো নয় বলে শাশ্বত গল্পের খোঁজ দেওয়ার একটা মিচকেমি করলে তাকে বালখিল্যপনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না (এমনকি আজগুবি ফরাসি কবি ও তার আস্ত একটা মিথ্যে কবিতা পয়দা করলেও নয়) কারণ প্রতিটা ঘটনাই এত বেশি চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বা ঘটমান যে পাঠক পাঠক আপনি হাঁফ ছেড়ে ভাবতে বাধ্য যে সব ঝুট হ্যায় নাহলে আপনার চাকরি, সখের সিনেমা, পর্নসাইটে উঁকিঝুঁকি, মায় আপনার বাঙলা সাহিত্যে যে অসামান্য বুৎপত্তি (কারণ আপনাদের অনেকেই আজকাল লেখকটেখকদের চেনেন তা কটু তৈলের বিজ্ঞাপনই হোক বা ফেসবুকে যাতায়াত আমি উৎসাহী নই জানতে) তালগোল পাকিয়ে যেতে পারে – বরং কিছু মজা নেওয়া যাক।

স্টোরিটেলার বেশ ধুরন্ধর তাই আপনি মজা নিন জুনিয়র-অমিতাভে কারণ আপনি নেবেন না কী ভাবে লাল থেকে নীল থেকে লাল থেকে নীল পার্টি আসলে জুনিয়র-রাজনীতি, মোকাম্মেল বচ্চনের আয়না শুধু নয় শুধু ফিরে ফিরে আসে একই ক্ষমতার দখলদারিত্ব আর ব্যক্তির অসহায় অবস্থানে থেকে যাওয়া।

আপনি মজা নিন যখন ছাত্র-আন্দোলন আসলে গাঁজা আর সেক্স আর অ্যানার্কি এই জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে মনে হচ্ছে স্টোরিটেলার এই বইয়ের কারণ আপনি বাইনারি ভালবাসেন। আপনার সুভাস বোস বিয়েই করতে পারে না, আর অনুশীলন সমিতি বোমা মারে কিন্তু শুধু বোমাই (কমলবাবুর রুক্মিণীকুমার পড়লেও না), অথবা আপনি চান এই ডেকাডেন্স এই ছেলেগুলো বিপ্লব করতে গিয়ে শুয়ে পড়ল আর কোন এক মলয় জ্ঞান দিল অনেকটা সত্যজিতবাবুর প্রতিদ্বন্ধীর সেই কফি হৌসের(?) দাদাটার মতো (সত্যজিৎ থেকে রি.ক্যা-র লেখক সময়টা অনেক তবু বেচারা মলয়রা টাইপকাস্ট জ্যাঠা টাইপের হয়ে রইল এটা দুঃখের, আমি একজন মলয়কে চিনি রাজনীতি করেন, তাঁকে বলব ভাবছি এবার তোমার গপ্প তুমিই লেখো বাপু) কিন্তু সেটা শুনলো না এলা ও সাদিক নামের ছেলেমেয়ে দুটো। অথচ সেলিব্রেশন নেই? কেন নেই? কারণ কামগন্ধহীন বিপ্লব ও বিপ্লবহীন সেক্স আমাদের প্রভূত আশ্বস্ত রাখে।

আপনি আরো মজা পাবেন দেখে যে ইকড়ি মিকড়ি খেলার শুরুর ভয়ঙ্কর পঙক্তিটা আরো ভয়ঙ্কর ফাঁদ কারণ আপনি জল হয়ে এসেছেন এবার এবার বিবাহ রঙ্গ ভাল লাগতেই পারে যেমন ইনচেস্তো ইনচেস্তো চেঁচালেও মেকি সাহেবকে কেউ বোঝে না শহরতলীতে আর তাই সরকারের হস্তক্ষেপে বর বউ ভাই বোন হয়ে পয়দা করতে পারেই নাজায়েজ – আপনি খবর-করিয়ের মতোই নির্দোষ থেকে যাবেন।

তুঘলকের মার খাওয়া নিয়ে যখন দুঃখ করছেন ভুলে যেতেই পারেন যে তার নাম মাহাত্ম – যা প্রগ্রেসিভ না পাগলামি না বৈপ্লবিক না নিষ্ঠুরতা আজো তো বোঝা যায়নি।

এটা কী পোস্টমডার্ন না আঁতলামি?

এটা কী ঐতিহ্যিক না সাবভার্সিভ?

এটা কী ককটেল না তালমিছরি?

এমন বিশুদ্ধ আজগুবি প্রশ্ন রি.ক্যা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল কারণ এতে যা আছে সবই জানা অথচ যা দেখছি তা নতুন বিন্যাস যেভাবে মাকড়শার বুনন বিস্ময় জাগায়, বিন্যাসকে ভয় করাটা দস্তুর নয় আমাদের এখানে – তাও গল্পে গল্পে স্টোরিটেলার বলে দিয়েছে, নাকি সাদিক বলে চরিত্রটা? মহা মুশকিল আমি তিনখান সাদিককে দেখছি এখানে যেমন দুখান মলয়ের কথা বলেছিলাম আগে। একখান ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত, বেরাদর কথাকার সাদিক হোসেন, দু নম্বর হল গিয়ে এই রি.ক্যা বইটার লেখক, আর তিন এই চরিত্র। তিনজনের মধ্যে কী ঝগড়া বাঁধল? মহাজনেরা যাকে ডায়ালেক্টিকস বলেন আর আমার মনে হয় আসলে অনেকগুলো গল্পের মাঝে মধ্যে একে অপরের সঙ্গে যখন দেখা হয়ে যায় তখন তাদের মধ্যে যে কথা হয় তেমন কোনো কিছু একটা – সে যাক কথাটা তা নিয়ে নয় – কথাটা হল এইখানে বিন্যাসের কথা বলে বিন্যাসকেও ফিকটিভ বা কাল্পনিকতার সন্দেহে ফেলে দেওয়ার প্যাঁচ রয়েছে। বড়ো নির্মোহ এই লেখাগুলো বাংলা ভাষায় বিরল যা শুধু মাথার ভিতর যুক্তি ও প্রতর্কের নানা পরীক্ষা নিতে বাধ্য করে। রিফিউজি ক্যাম্প তো খুব সহজ জায়গা নয়, মায়াময় নিত্যের বাসস্থান বলে আমরা যে ভিটে মাটিকে মনে করি এমনকি জীবনের নশ্বরতা জেনেও, তার থেকে আলাদা একটা সচলতা একটা মারাত্মক গতিময় অথচ অসহায় স্থবিরতা দ্যোতক হয়ে উঠল রিফ্যুজি ক্যাম্প যেন তার বাস্তবতা আমাদের ঘাড়ের উপর উঠে নিশ্বাস আটকাল।

 

বিঃ দ্রঃ

১। লেখার শুরুতে পাঠ প্রতিক্রিয়া বলে একটি শব্দ আছে তার গূঢ়ার্থ – লেখক যে রিভিউ লিখে টাকা পান না ও যার বই তার গাল খান না তার নাম পাঠ প্রতিক্রিয়া।

২। এই লেখাটায় যে প্রশ্ন বাচক পঙক্তিগুলো রয়েছে যেমন এটা কী সাইকাডেলিয়া না বিভ্রম তা সাদিক হোসেন নামের এক লেখকের গল্প থেকে ইন্সপায়ার্ড হয়ে। বলা বাহুল্য সে গল্প এই বইয়ে নেই, কারণ সে সাদিক হোসেন নিশ্চয়ই অন্য গল্প সংগ্রহের লেখক হবেন। কারণ এক লেখক কখনো দুটো বই লিখে উঠতে পারেননি আজ পর্যন্ত যেমন এক নদীতে কেউ খেতে পারে না জল….

 

Facebook Comments
শেয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *