পূর্বজন্মের কথা : উন্মেষ মিত্র

পর্ব-১

হঠাৎ করেই পাড়ায় খেলার মাঠের জন্য সমস্যা শুরু হল সেবার।এতদিন যেখানে খেলতাম সেখানে বছরখানেক আগেই পেল্লাই পাঁচিল তুলে তার উপর নিপুণ কৌশলে ভাঙা কাঁচ-পেরেক বসিয়ে সুরক্ষিত দুর্গ বানিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন জমির মালিক।আমরাও দমবার পাত্র ছিলাম না।কার বাড়ি থেকে হাতুড়ি জোগাড় করে এক সন্ধ্যের আধো অন্ধকারে জয় করে ফেলেছিলাম সেই দুর্গ।হাতুড়ির দাপটে গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল পাঁচিলের কয়েকফুট দৈর্ঘ্যের সমস্ত কাঁচ,মাথা নুইয়ে ছিল কতশত উন্নত পশ্চাৎ পেরেক।তারপর সেই দুর্গে প্রবেশের জন্য আমাদের মতন নাতিদীর্ঘ প্রাণীদের ভরসা ছিল হরমোনের আজব খেয়ালে সেই বয়সেই তাল্ গাছের সাথে কম্পিটিশনে নামা বন্ধুদের কাঁধ।

পাঁচিল পর্যন্ত ঠিক ছিল।একদিন কোদাল-গাইতি হাতে হাজির হল রাজমিস্ত্রির দল।আমাদের প্রাণপ্রিয় খেলার মাঠে নাকি বাড়ি হবে ! ব্যাট-উইকেট বগলে নিয়ে এহেন আকস্মিক বজ্রপাতের ধাক্কায় দিশেহারা হয়ে বাড়ি ফিরলাম।এখন কি করা যায়?কারণ বিকেলের খেলা ছাড়া জীবন অচল।বিকল্প মাঠ হিসেবে মনে পড়ল খানিক দূরেই আমার মামা কয়েক কাঠা জমি কিনেছে কয়েকদিন আগেই।পরদিন থেকে বদলে গেল খেলার মাঠ।কিন্তু সমস্যা কি আর অত সহজে পিছু ছাড়ে? দিন দশ বাদেই বন্ধুদের ডেকে-ডুকে ব্যাট-উইকেট হাতে মাঠে পৌঁছাতে বোধহয় খানিক দেরি হয়ে গিয়েছিল।মাঠে পৌঁছে দেখি খেলা চলছে ! আর ব্যাট-বল হাতে অচেনা সব মুখ । বুঝতে সময় লাগল না ‘আমাদের’ খেলার মাঠ ‘দখল’ হয়ে গেছে । আমাদের মধ্যে থেকে একজন এগিয়ে গিয়ে জোর গলায় প্রতিবাদ জানালো “এটা তো আমাদের মাঠ,আমরা খেলি এখানে,তোরা খেলছিস কেন?” ওদের খেলা থমকে গেল। ব্যাট কাঁধে একটা ছেলে এসে পালটা প্রশ্ন করল, “তোদের মাঠ মানে?মাঠে কি কারর নাম লেখা আছে?” আমার বন্ধুটি জানত এটা আমার মামার জমি,সে বেশ কলার উঁচিয়ে আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “এই তো এটা ওর মামার জমি।” ব্যাট হাতে ছেলেটি বয়সে খানিক বড় ছিল,দমে না গিয়ে বলল, “কই জমির দলিল কোথায়?” আচমকা প্রশ্নে ঘাবড়ে গিয়ে আমি আমতা আমতা করে কোনো উত্তরই দিতে পারলাম না।ওদিকে ওদের দলের সবাই হো হো করে হাসতে শুরু করেছে।স্লিপে ফিল্ডিং করতে দাঁড়ানো ছেলেটা ব্যাঙ্গের সুরে বলল, “লে আমিো বললাম এটা আমার দাদুর জমি,চল ফোট,আমরা আগে এসেছি,আমরাই খেলব।” আমাদের জবাব দেওয়ার মতন কিছু ছিল না,মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরলাম।

তারপর শুরু হল সময়ের সাথে অসম যুদ্ধ। যে করেই হোক সবার আগে মাঠে পৌঁছাতে হবে।স্কুল থেকে ফিরে কোনো মতে জামা বদলে মায়ের বকুনি শুনতে শুনতে ছুটতাম মাঠের দিকে। কোনোদিন পৌঁছে দেখতাম আরেকদল খেলা শুরু করে দিয়েছে আবার কোনোদিন আমরা আগে মাঠে পৌঁছে বিজয় নিশানের মতন ব্যাটের হ্যান্ডেল ঠুকে মাটিতে উইকেট পুঁতে নিজেদের বিজয় জাহির করতাম।

এভাবে আর কতদিনই বা চলতে পারে? তখন সময়টা এমনই ছিল যে বিকেলে খেলা না হলে সারাদিন পেটের ভাত হজম হত না। এই সমস্যার একটা হেস্তনেস্ত না করলে কিছুতেই চলছিল না।হঠাৎ করেই বুদ্ধিটা এসেছিল আমার মাথাতেই। একদিন পেট ব্যাথার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে স্কুল যেতে পারলাম না,যথারীতি বিকেলের আগেই পেট ব্যাথা সেরে গেল । সাত তাড়াতাড়ি ব্যাট উইকেট হাতে মাঠে পৌঁছে গেলাম,বন্ধুরাও চলে এল খানিক পর।আমার প্ল্যানের ব্যাপার তাদের আগে থেকেই বলে রেখেছিলাম।উইকেট পোঁতা হল,কিন্তু খেলা শুরু হল না,একটু পড়ে আরেকদলও মাঠে হাজির হল।মাঠে আমাদের দেখে হতাশ মুখে তারা ফিরে যাবে এমন সময় আমাদের মধ্যে থেকে একজন এগিয়ে গেল আমাদের প্রস্তাব নিয়ে তাদের কাছে।প্রস্তাব শুনে তারা খানিক্ষন ভাবল,তারপর রাজি হয়ে গেল।আসলে সবাই এই খেলা না খেলার যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ চাইছিল।প্রস্তাবটা ছিল , “মাঠে সেদিন দুই দলের একটা ১০ ওভারের ম্যাচ হবে।যে দল জিতবে এই মাঠে তারাই খেলবে।” পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারছেন এই ঘটনার কিছুদিন আগেই আমির খান অভিনীত “লাগান” সিনেমাটি রিলিজ করেছিল এবং আমাদের মনে বেশ ভালোই প্রভাব ফেলেছিল। সাদা কাগজ জোগাড় করে শর্তের কথা লিখে দুই দল থেকে একজন করে সই করল।তারপর শুরু হল ”ম্যাচ”। খেলার কথা খুব অল্প অল্পই মনে আছে।এটুকু মনে আছে যে, টসে হেসে আমরা প্রথমে বল করেছিলাম।টস মানে তখন ছিল ঘাসের একটা টুকরো ছিঁড়ে সুকৌশলে ফেলে দিয়ে বা হাতের মধ্যে রেখে মুষ্টিবদ্ধ হাত সামনে এগিয়ে “আছে কি নেই?” বল হাতে আমি এক ওভারে ৩ টে ছয় খেয়েছিলাম সেটাও দিব্যি মনে আছে আছে।আর ওই দলের একটা ছেলে বল করেছিল পুরো জাহির খানের অ্যাকশনে,মানে ডানহাতি জাহির খান।তাকে সামলাতে আমাদের ভালোই বেগ পেতে হয়েছিল।যাইহোক শেষপর্যন্ত আমরাই ম্যাচটা জিতেছিলাম।তারপরের অনুভূতিটা ছিল বিশ্বজয় করে ফেরার সমান।মুখ চুন করে বাড়ি ফিরেছিল আরেকদল।তারপর সেই ঐতিহাসিক জয়ের কাহিনী কাকে না বলতাম পাশের বাড়ির জ্যেঠিমা,স্কুল নিয়ে জাওার সময় রিক্সাকাকু,অঙ্ক করাতে আসা দাদা…

তারপর মাঠের ওপর আমাদের একক রাজত্ব। কেউ কিছু বলতে এলে সই করা কাগজ তো আছেই।তারপর আবার নিয়মিত খেলা শুরু হল,অন্য দলের ছেলেরা জুলজুল চোখে ঘুর ঘুর করত মাঠের পাশে,প্রথম প্রথম অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাতাম,ম্যাচের কথা শুনিয়ে ঠাট্টা-টিটকিরি করতাম। এর মধ্যেই জানতে পেরেছি মাঠের পিছনের দিকে পাড়ায় থাকে ওরা,ওরাও যে মাঠে খেলত সেখানে বাড়ি হচ্ছে। দিন কুড়ি পর ওদের হোতা মতন ছেলেটা কাছে এসে বলল, “খেলা নিবি আমাদের?” ভ্যাগিস তখন ছোট ছিলাম,ভ্যাগিস ইগো,স্বার্থ ইত্যাদি জিনিস গুলোর তখনও জন্ম হয়নি।সরল মন হয়ত ভাবিয়েছিল, ‘ওদেরও তো মাঠ নেই,একসাথে খেললে কিসের অসুবিধে?’ সেদিন এই দল আর ওই দল এর পাঁচিল গুলো খুব সহজেই ভেঙে গিয়েছিল। তারপর থেকে রোজ টীম তৈরির ডাকাডাকির সময় দান হাতি জাহির খান হয়ে গিয়েছিল সবার ‘প্রথম ডাক’ কিংবা দুদিন খেলতে না এলে ওই হোতা মতন ছেলেটাই প্রথম খোঁজ নিত, “কীরে কি হয়েছিল,দুদিন খেলতে আসিস নি যে?”

তারপর কবে যেন বড় হয়ে গেলাম।ছোট ছোট কারনে অর্জন করা ‘সব পেয়েছির আনন্দ’ গুলো হারিয়ে গেল বিকেলের মাঠের সাথে সাথে।সরলতার শব দেহের ওপর জন্ম নিল অতম্ভরিতার বিষবৃক্ষ। খুব সহজেই এই দল ওই দলের পাঁচিল ভাঙতে পাড়া ছেলেটাই আরও একা হতে থাকল বারবার দল ভাঙতে ভাঙতে।হয়ত এটাই নিয়ম,এভাবে ছাড়া বড় হওয়া যায় না…

 

 

ক্রমশ…

Facebook Comments
শেয়ার

One Reply to “পূর্বজন্মের কথা : উন্মেষ মিত্র”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *