শিশা : জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

 

ঘরের ভেতর নজরে পড়ার মত তেমন কিছু  নেই। নোনা ধরে ড্যাম্প দেওয়াল নীল রঙটা কোথাও গাঢ় নীল হয়ে গিয়ে মানচিত্র তৈরী করেছে। আবার কোথাও ক্যানভাসে অ্যাক্রাইলিকে আঁকা আধুনিক চিত্রকল্প। একটা স্টোভ, ফোল্ডিং খাট আর তার নিছে রাখা কিছু বাসন-পত্র, খাটের ওপরে একটা সস্তা ইয়ারফোন, জড়িয়ে পেঁচিয়ে রাখা। একটা স্যুটকেস আর তার ওপর রাখা কিছু শার্ট-প্যান্ট, আর হুকে ঝোলানো গেঞ্জি, জাঙ্গিয়া, আরও কিছু জামা-প্যান্ট। এই দশ বাই বারোর ঘরে হালকা ঘাঁটাঘাঁটি করে এর  বেশি কিছু পাওয়া গেল না। আলমারি-টালমারির বালাই নেই। স্যুটকেস ভেঙেও ভ্যাপসা গন্ধ জামা-প্যাণ্টই বেরলো। কেবল পুরুষেরই পোশাক, সব প্রায় একই মাপের। চিরুনি, সাবান, শ্যাম্পু… এসব থাকলেও আলাদা করে মহিলাদের ব্যবহার যোগ্য কিছু পাওয়া গেল না। এগুলো ছেলেরাও ব্যবহার করে।

আর হ্যাঁ, দেওয়ালে একটা ছোট আয়না ছাড়াও… আরও তিন-চারটে আয়না পাওয়া গেল খাটের তলায়। সব ক’টাই কাঁচ ভাঙা।

 

যা কাগজ পাত্র তা ওই গাড়িতেই ছিল। লাইসেন্স, ইনশিওরেন্স, চালকের পরিচয়পত্র… এইগুলো ক্যাবিনেটের ভেতরে ঢোকানো ছিল। একটা দুলিটারের জলের বোতল। একটা তোয়ালে। একটা লাল রঙের কাপড়। আর ডিকিতে একটা স্পেয়ার চাকা, রেঞ্চ, জুট, মোবিল… এইসব। রেঞ্চ আর অন্য যন্ত্রপাতিগুলো অবশ্য নিয়ে নেওয়া হয়েছে… ফরেন্সিকের কাজে লাগবে। এ ছাড়া গাড়ির ভেতরেও নজরে পড়ার মত কিছু নেই। সব জায়গা থেকে আঙুলের ছাপ খোঁজাও এক অমানুষিক কাজ!

 

—   —   —   —

 

ওপরওয়ালা এই থোবরাটা কেমন দিয়ে পাঠালো, এটা বহৎ জরুরি চিজ। আর এটা যদি ফেঁসে যায়, তাহ’লে সেকণ্ড হ’ল বাপের টাকা। দুটোর কোনওটাই যদি না থাকে তাহ’লে… এই আমার মত।

এইসব সিনেমায় যে যতই দিল-ফিল বলে লেকচার দিক, সব ঢপ… সব… সব বাল। আমার থেকেও বাজে দেখতে ছেলেগুলোকে দেখি পেছনে আইটেম তুলে বাইকে ঘুরছে, সিনেমার হিরো সেজে বসে আছে। সিরফ বাপের মাল আছে বলে। আমার সালা সব দিকে থেকে ফাটা। বেশ করেছি এখানে চলে এসেছি। কামাচ্ছি, খাচ্ছি, ওড়াচ্ছি… বেশ করছি। কোনও লাইফ আছে নাকি ওই পান-বিড়ির দোকানে বসে? গ্যারেজের কাজটা কপাল জোরে জুটে গেল। রাজেনের সঙ্গে খেল খেল মেঁ ড্রাইভিং লাইসেন্সটা বার করে নিয়েছিলাম। ওসব উধার-ফুধার সব সেট হয়ে যাবে। ক’বছর গাড়িটা চালাই। সব সেট করে দেবো।

“পান-বিড়িকা দুকান, শিশে মেঁ শকল দেখ আপনা!’… বিয়ে তো করলি সেই দর্জির ছেলে হানিফ শেখকে। ক্যায়সা লা-জবাব দেখতে সবাই জানে। ক্লাস টেনও পাশ করতে পারেনি।

 

এইসব ভাল-ফাল ফালতু কথা, আচ্ছা ইনসান না বাল। আব্বা মাঝে মাঝে মাল খেয়ে ঘরে ঢুকত রাতে। এখনও খায়। আমি খাই না। ক্লাস এইট থেকে দেখছি বন্ধুদের সিগারেট-বিড়ি খেতে। আমি খেতাম না বলে লেডিস বলত, মেয়েছেলে বলত। মেয়েছেলেরাও খায়, আমি খাই না। ইচ্ছে করে না। পানের দোকানে দিনরাত বসে থেকেও একটা তিরঙ্গার প্যাকেট দাঁতে ঠেকাইনি। কোনওদিনও কারও থেকে একটা টাকা মারিনি। গ্যারেজে অনেক রকম মওকা ছিল, একস্ট্রা সরানোর… করিনি। মানে… পারিনি। রাণ্ডিবাজী করতে যেত সব। যেতে পারতাম না বলে হিজরা, ভাড়োয়া বলত। এখনও বলে। অথচ একটা চড় মারলে মাথা ঘুরে পড়বে! মারিনি কখনও… তাই জানে না। তো এত কিছু না করে, আর এত কিছু করে… কী ছিঁড়লাম? যারা সব রকম মস্তি করে মজায় কাটাচ্ছে… তারাও তো আমার থেকে আচ্ছা লাইফে আছে। পুরা মৌজ মেঁ । আমি সালা আচ্ছা ইনসান মারিয়ে গেলাম… আম্মির কথা শুনে।

 

আর কিছু না। নিজের কথা আর এইভাবে নিজেকে উল্লু বানানোর কথা মনে পড়লে এখন জ্বলে যায় পুরো। এখন ইনকাম আছে, ব্যাঙ্কে ব্যালেন্স বাড়বে. সব সেট হবে। আম্মিকে নিয়ে আসব ঠিক টাইম ম’ত। বুড়োটা না মরলে আসবে না। সিরফ আম্মিকেই আনব, বাকিরা যা পারে করুক। আমার কোনও সর-দর্দ নেই। এখন সব ভুলে ট্যাক্সিটা ক’বছর চালাব। ফির নিজের একটা গাড়ি তুলব। ঔর ফির দেখব – কে কার মুখ দেখে আয়নায়। অনেক আয়নার কাঁচ ভেঙেছে এই ক’বছরে।

 

—  —   —   —

 

– চুপ করে আছিস কেন? জল খাবি?

কোনও উত্তর না দিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল রিমি। সালোয়ারের ওড়না দিয়ে নাকটা মুছে সর্দি টানার মত একটা শব্দ করল শুধু। মাথার চুল এলোমেলো হয়ে কপালে এসে পড়েছে। চলন্ত ট্রেনের বাইরে থেকে আসা হাওয়া উড়ছে। লোকাল ট্রেন। যেভাবে হোক রাজ্যের বাইরে যেতে হবে কাল সকাল হওয়ার আগে। তারপর সেখান থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার প্ল্যান। আপাতত রাতের মধ্যে আসানসোলে ঢুকতেই হবে। অবশ্য এই চিন্তাগুলো রিমির মাথায় ঘুরছে কি না, তা দেখে বোঝা যায় না।

– কি রে? একটু জল খাবি?

আবার একবার জিজ্ঞেস করে জলের বোতলের ছিপিটা খুলল শুভায়ু, তারপর এগিয়ে দিলো রিমির দিকে। সন্ধের ট্রেন, এখন ক্রমে রাত হচ্ছে। রাতের দিকে লোকাল ট্রেনের কামড়া ক্রমে খালি হয়ে আসে। যারা অভ্যস্ত নয় তাদের অস্বস্তি হয়, গা ছমছম করে। আর যারা অভ্যস্ত তারাও একটু বেশি সচেতন হয়ে ওঠে। ওদের উলটো দিকে বসে থাকা দু’জন লোক রিমিকেই যেন দেখে যাচ্ছিল একটানা। শুভায়ুর খালি মনে হচ্ছিল – ওরা রিমিকেই দেখছে, একটা আপাত নির্বিকার দৃষ্টিতে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ইচ্ছে করেই শুভায়ু কথা বলার চেষ্টা করল… মানে, ওই জল খেতে বলা। তার থেকে যদি আরও কিছু কথা বলে পরিস্থিতিটা হালকা করা যায়। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করার সময় ট্রেনের ঝাঁকুনির সাথে রিমির কাঁধে একটা ধাক্কা লেগে গেছিল শুভায়ুর কাঁধের সঙ্গে। রিমি ফিরে তাকিয়ে বোতলটা হাত থেকে নিলো, তারপর যন্ত্রের মত কিছুটা জল খেয়ে ফিরিয়ে দিলো বোতলটা। শুভায়ু আবার জিজ্ঞেস করল “খিদে পাচ্ছে? আমরা আসনসোলে নেমেই কিছু খেয়ে নেবো বুঝলি… রাতও হয়ে যাবে অনেক।'”

রিমি একবার অদ্ভুত ভাবে শুভায়ুর দিকে তাকালো, যেমন মানুষ আহত হ’লে তাকায়, চেপে রাখা ‘আহ্‌’-টা নিয়ে। তারপর উৎকণ্ঠা মেশানো গলায় বলল “আ-আ-আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না শুভ! পারছি না!” শুভায়ু ছ্যাঁকা খাওয়ার মত সজাগ হয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে হাতটা খামছে ধরল রিমির। এই নিয়ে ট্রেনের ভেতর রিমি আরও বেশি কিছু বললে দুজনেই মুশকিলে পড়বে। লোকদুটো কেমন ভুরু-কুঁচকে তাকিয়ে আছে। যেন এখনই চেপে ধরবে ওদের দু’দিক থেকে। যতটা সম্ভব চোখের ইশারা করে রিমিকে চুপ থাকতে বলল শুভায়ু। রিমি হাতটা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে কামড়ার অন্য প্রান্তের দিকে উঠে চলে গেল। সেদিকটা একেবারেই খালি। একটা জানলার পাশে আগের মতই বসল, রডে মাথা রেখে। শুভায়ু লোকদুটোর চোখের দিকেই তাকালো না আর। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে উঠে চলে গেল ওই সিটের দিকে। রিমির থেকে একটু দূরেই বসল। যেন পালিয়ে এলো লোক দুটোর থেকে।

 

রিমি জানে, ওই ছেলেদুটো কারা। শুভায়ু না চিনলেও রিমি চেনে ওদের। ট্রেনের লোকদুটো না, সেই ছেলেদুটো যারা পিছু নিয়েছিল। ওদেরই এক রিশ্তেদারের ছেলের সঙ্গে রিমির নিকাহ ঠিক করেছিল ওর বাবা। ওরাই বা বেইজ্জতি বরদাস্ত করবে কেন? এতক্ষণে নিশ্চয়ই রিমিদের বাড়িতেও অনেক বড় ঝামেলা হয়ে গেছে। ছেলেদুটো রক্তারক্তি করলে পুলিশও আসবে। নিজের মোবাইল ফোনটা একদম সুইচ অফ করে দিয়েছিল রিমি। ট্রেনে ওঠার পর শুভায়ুর দেওয়া অন্য একটা সিম লাগিয়ে নিয়েছে। রিমিকে আর ফোনে পাওয়া যাবে না। কাল-পরশুর মধ্যে ফোনটাই বদলে ফেলতে হবে। শুভায়ুর ফোনটা সুইচ অফ ছিলো না, সাইলেণ্ট করে রেখেছিল শুধু। এখন ফোনটা বার করে দেখল চার্জ কমে এসেছে… আর কুড়িটার বেশি মিস্‌ড কল। কাউকে জানানো হয়নি। মাকেও না। মা জানে খড়্গপুরে এক বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছে… পিকনিকে। এবারে ফোন করে একটু কিছু মিথ্যে বলে এখনকার মত আশ্বস্ত করতে হবে। আজেবাজে কিছু খাচ্ছে না, রাত জাগবে না, ফোন চার্জে ছিল… এরকম কিছু কিছু কথা। ফোন থেকে চোখ তুলতেই দেখল রিমি ওর দিকে তাকিয়ে আছে… সেই এক বিহ্বল দৃষ্টি নিয়ে। ওর ঠোঁট দুটো অল্প কেঁপে উঠল, ক্ষীণ কণ্ঠে বলল – “লোকটা যদি মরে যায়… নিজেকে কোনওদিন ক্ষমা করতে পারব না শুভ!”

 

—  —   —   —

 

– আরে নাম কী করে জানব, যারা নিয়ে এসেছিল তারা ঠিক নাম লিখবে এর মানে আছে? নাম একটা এনট্রি করিয়েছে… তবে মনে হচ্ছে ফল্‌স।

– মানে?

– মানে আবার কি… পুলিশ কেস। বলছে ওই স্ট্যাণ্ডের ট্যাক্সি নয়। ওরা চেনে না। সব সেয়ানা হয়ে গেছে।

– তো আপনারা কি করছিলেন? পুলিশকে তো স্টেটমেণ্ট দিতে হবে। ট্যাক্সিটা পাওয়া গেছে? ওতেই তো আইডি প্রুফ কিছু থাকবে। এতদিন ধরে হাসপাতালে কাজ করছেন… একটু মাথা খাটান?

– আরে আমরা এখানে বসে মাথা খাটিয়ে কী করব স্যার? আপনি ফালতু আমাকে চোটপাট করছেন। ওরা কি ট্যাক্সি নিয়ে এসেছে? না আমি ট্যাক্সিটা দেখেছি?

– পুলিশ তো দেখবে!

– হ্যাঁ, পুলিশ দেখবে। আমাকে জিজ্ঞেস করলে আপনাকে যা বললাম ওদেরও তাই-ই বলব। ট্যাক্সিতে কিছু পেলে আমাদের বলুক… লিখে নেবো। এক কপি জেরক্স করে রেখে দেবো তখন।

– হুম, পুলিশ আপনাকে দেবে ডকুমেণ্ট… জেরক্স করার জন্য।

– তাহ’লে আর কি… সেন্স আসুক, জেনে নেবো।

– ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট। আদৌ সেন্স ফিরবে কি না ঠিক নেই। ট্রিমেণ্ডাস ব্লাড লস হয়েছে। আরও রক্ত দিতে হবে। আপনারা সত্যিই পারেন বটে! সেন্স আসলে নাম জানবেন পেশেন্টের… ওফ!

 

রাউণ্ডে থাকা সিনিয়র ডাক্তার চোখে-মুখে স্বাভাবিক বিরক্তি নিয়ে গটগট করে চলে গেলেন অন্য ওয়ার্ডের দিকে। এতক্ষণ ধরে চুপচাপ বসে বসে শুনছিল, এমন একজন হঠাৎ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, কেসটা কি মশাই? অ্যাক্সিডেণ্ট?” এতক্ষণ ধরে ডাক্তারের কাছে ঝার খেয়ে যথেষ্ট তেতো হয়ে গেছিল মুখটা, তারপর এমন একটা অযাচিত কৌতূহল দেখে খিঁচিয়ে উঠলেন বসাক বাবু, “যান তো, নিজের পেশেন্ট নিয়ে ভাবুন। অ্যাক্সিডেণ্ট না খুন… এত ইন্টারেস্ট কিসের?!”

– আরে, আমি নিজেই পেশেণ্ট। রিপোর্ট নেবো তাই বসে আছি। ফালতু রাগ দেখিয়ে লাভ আছে?

– কিসের রিপোর্ট? কোন ডাক্তার?

– ইসিজি… বসে আছি, তো বসেই আছি।

– বসে আছেনই বা কেন? কাল এসে বা সন্ধেবেলা এসে নিয়ে নেবেন।

– কালও এই কথাই বলেছিল দাদা। সেই কারণেই বসে আছি। বলল লাঞ্চের পর দিয়ে দেবে। তা ওই ট্যাক্সির কেসটা কি? অ্যাক্সিডেন্ট?

বসাক বাবু হাতছানি দিয়ে ভদ্রলোককে কাছে ডাকলেন, তারপর গলা খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন “অ্যাক্সিডেন্ট ফ্যাক্সিডেন্ট নয়। ক্যালাকেলি হয়েছিল। পেটটা ফাঁসিয়ে দিয়েছে একেবারে!”

“সেকি!” বলে ভদ্রলোক দু’পা পিছিয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে। বসাক বাবু চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে বললেন ‘এই জন্যেই বলি। হার্টের প্রবলেম… চুপচাপ রেস্ট নিন। এত খোঁজখবরে কী দরকার? এটা হাসপাতাল… এমন কত কেস আকছার আসছে!’

 

— — —  —

 

– কেমন কণ্ডিশন?

– ভাল না, এখনও জ্ঞান ফেরেনি।

– কেউ এসেছে? রিলেটিভ্‌স?

– না স্যার, ফ্যামিলির ট্রেস পাওয়া যায়নি এখনও। যেখানে থাকত সেখানেও কেউ ফ্যামিলির ব্যাপারে জানে না। আজিমগঞ্জের ভোটার কার্ড দেখলাম, মুর্শিদাবাদ। মনে হয় ওখানেই…

– দেখো, বাবার নাম… ঠিকানা…এসব থেকে যদি ট্রেস করা যায়। ঐ এরিয়ার লোকাল থানায় একটা ফোন করে জানাও।

– হ্যাঁ স্যার। আর…
– আর?

– না, মানে যারা অ্যাডমিট করতে এসেছিল… মানে, ছুরি মেরেছে বলছে… দু’টো ছেলে।

– আই উইটনেস আছে?

– হ্যাঁ। সবার সামনেই…

– ধরতে পারেনি?

– নাহ্‌… বাইকে এসেছিল।

– অতগুলো লোকের সামনে স্ট্রাগল হ’ল… তারপর বাইকে করে চলেও গেল।

– সেরকমই তো মনে হচ্ছে… মানে, যা বলছে সবাই…

– যা বলছে সবাই… বুঝেছি। বাইকের নম্বরও নিশ্চয়ই কেউ নোট করেনি। ছেলে দুটো ভিকটিমকে চিনতো?

– নাহ্‌, বাইকের নম্বর কেউ ঠিক মত বলতে পারেনি।

– বেঠিক মত বলেছে? সেগুলো থেকেই কাজ শুরু করা যায় কি না দেখো।

– তবে একটা ব্যাপার আছে স্যার।

– কী ব্যাপার?

– মানে… দুটো ছেলে-মেয়ে ছিল…

– দুটো ছেলে-মেয়ে? কাপল?

– হ্যাঁ ওই একসাথে আর কি… অন্য ট্যাক্সি করে এসেছিল। ছেলে দুটো বাইক থেকে নেমে ওদের সঙ্গেই প্রথম ঝামেলা শুরু করেছিল। মাঝে এই ড্রাইভারটা ঢুকে পড়ে…

– ইন্টারেস্টিং! এটা আগে জানাওনি তো? ছেলে-মেয়ে দুটো কোথায়? ভিকটিম ওদের চেনা নাকি?

– জানি না স্যার। ওখানকার লোকজন ওদের আর খেয়াল করেনি। মানে, ভিড়ের মধ্যে মিশে পালিয়ে গেছে। আমার মনে হয়ে বাইকের ছেলে দুটো ওদেরকেই কিছু করতে এসেছিল। শিওর বাড়ি থেকে পালানো কেস!

– ছেলে-মেয়ে দু’টোর ডেসক্রিপশন?

– ঐ অল্পবয়সী, মোটামুটি ডিটেলস পেয়েছি। কলেজে পড়াও হ’তে পারে। আবার…

– ম্যাচিওর্ড হ’লে ঝামেলা কম। মাইনর হ’লে… বিশেষ করে মেয়েটার যদি বয়স কম হয়… টানাটানি হবে।

– সে তো হবেই…

– মিসিং রিপোর্ট এসেছে কোনও? দু-তিন দিনের মধ্যে?

– না স্যার… এই থানায় তো আসেনি।

– অন্য থানা আমার এরিয়া নয়। ভাবতে হবে না। আর এই নিয়ে কাউকে এখনই খোঁচানোর দরকার নেই। অন্য এরিয়া থেকে মিসিং অ্যালার্ট এলে একটু নজর রেখো। মনে হয় মেয়েটার ফ্যামিলি থেকে অন্ততঃ একটা রিপোর্ট ফাইল করবে লোকাল থানায়। সূনার অর লেটার।

– শিওর স্যার।

– পারলে রাতের দিকে আর একবার যেও হাসপাতালে… বুঝলে? একটা স্ট্যাটাস কল নিও। ফোনে জানার শর্ট কাট করো না। কণ্ডিশন কেমন তা নিজে চোখে দেখলেই ভাল। সেরকম দরকার হ’লে আমি কাল সকালে রাউণ্ডে বেরিয়ে একবার ঘুরে আসব। যদি রিকভার করে, একটা স্টেটমেণ্ট দরকার লোকটার। ট্যাক্সিটা ওরই তো?

– না স্যার। অন্য মালিক। গাড়িতে মা কালীর ফটো, জবা ফুলের মালা… এসব দেখেই ডাউট হয়েছিল।

– হা হা হা… ছেলেটা মুসলিম বলে বলছ? অনেক মুসলিম ড্রাইভারের নিজের গাড়িতেও মা কালী বা এরকম অন্য হিন্দু দেবদেবীর ছবি থাকে সুমন্ত। তার অনেক কারণও থাকে… যাক গে…  গাড়িটা ওলা, উবার?

– না না… এমনি ট্যাক্সি।

– মানে পাতি হলুদ, তাই তো?

– হ্যাঁ হ্যাঁ। ওলা উবার হলে অনেক হ্যাপা হয়ে যেতো আমাদের। এটা হলুদ ট্যাক্সি।

– মালিক এসেছিল থানায়? গাড়িটা আটকেছো তো?

– হ্যাঁ হ্যাঁ… গাড়ি আমাদের কাছেই। মালিক এসেছিল। ড্রাইভারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে কি না… এইসব দুশ্চিন্তা করছিল। আপাতত এসব চিন্তা না করে হাসপাতালের খরচটা দিতে একটু চাপ দিলাম। আর ইউনিয়নের দাবী তো থাকবেই।

– গাড়িটা এখনই ছেড়ো না। মালটা গাড়ি ফেরত পেয়ে গেলে পুরো হাত ঝেড়ে নেবে কেসটা থেকে…

– সে আর বলতে!

 

— — —  —

 

শুভায়ু ভাবতে পারেনি ব্যাপারটা এমন জটিল হয়ে উঠবে। বাড়ি থেকে পালানোর ব্যাপারটা মোটামুটি ঠিকই ছিল… শুভায়ু আর রহিমার বাড়ি থেকে কেউ মেনে নিচ্ছিল না ওদের ব্যাপারটা। শুভায়ুর এক বন্ধু রাঁচিতে চাকরি করে, সেখানেই গিয়ে উঠবে ঠিক করেছিল। তারপর সেখান থেকে পরের ব্যবস্থা। এমনিতেও আর কিছুদিনের মধ্যে শুভায়ুর জয়েনিং ডেটও এসে যাওয়ার কথা… যদি না কপাল সত্যিই খুব খারাপ হয়। দু’দিন আগে রহিমার বাড়ি থেকে রাতারাতি বিয়ের তোড়জোড় শুরু করতে হঠাৎ করেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হ’ল। কিন্তু তখনও বোঝেনি ছেলে দুটো ওই ভাবে পিছু নেবে। ট্যাক্সি থেকে নেমে ভাড়া দেওয়ার সময় কোথা থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পর পর কীসব ঘটে গেল। শুভায়ু রাস্তায় পড়ে যেতেই অন্য একটা ট্যাক্সিওয়ালা ছুটে এসে ছেলে দুটোকে একসঙ্গে মারতে শুরু করল। অন্য লোকজন জড় হওয়ার আগেই কোনওরকমে উঠে একহাতে রিমিকে আর অন্য হাতে ব্যাগটা নিয়ে সামনের বাজারটার ভেতর ছুটে ছিল শুভায়ু। শেষ দেখেছিল, একটা ছেলেটা বড় মাপের ছুরি বের করে ড্রাইভারটাকে মারতে যাচ্ছে। বাজারের ধাক্কাধাক্কি, ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। কেমন গলাটা শুকিয়ে গেছিল, হাঁফ ধরে যাচ্ছিল উৎকণ্ঠায়। ভিড়ের মধ্যে এভাবে বেশি দূর এগনোও যায় না। চটপট অন্য একটা দিক দিয়ে বেরিয়ে একটা অটোতে উঠে দু’জনে পালিয়ে গেল। পালিয়ে বাঁচল দু’জনে… তখনকার মত।

 

— — —  —

 

– জ্ঞান মাঝে মাঝে ফিরছে, তবে স্টেটমেণ্ট নেওয়া বোধহয় যাবে না বুঝলেন?

– তাই? একবার দেখতে পারি?

– হ্যাঁ হ্যাঁ… চলুন না।

– তিন দিন হ’তে চলল… খরচ কে টানছে?

– ওই গাড়ির মালিক শুরুর দিকে দিয়েছিল… তারপর ওই ট্যাক্সি ইউনিয়ন থেকে কিছু ব্যবস্থা করছে বলল… ব্লাডের দরকার হয়েছিল, সেও ওরাই…

– ওই তো… কিছু বলছে… জ্ঞান ফিরছে নাকি?

– নাহ্‌… ডিলিরিয়াম। জ্বর আছে গায়ে। নার্স!…

 

নার্সের অপেক্ষায় ডাক্তার আর অফিসার ইন চার্জ দাঁড়িয়ে রইলেন। অফিসিয়াল কিছু কাজ মিটিয়ে নিতে হবে রুটিন মত। ছেলেটা বেঁচে গেলেও যেতে পারে। তবে এখনও নিশ্চিৎ কিছু বলা যায়  না। আজ থেকে একটা কনস্টেবলকে এখানে ডিউটিতে রাখতে হবে, বলা যায় না… খারাপ কিছু ঘটতে দু’মিনিটও লাগে না। হলুদ ট্যাক্সিটাকে আর বেশিদিন থানায় আটকে রাখা যাবে না। ট্যাক্সি বা মালিককে আটকে রাখার মত এই কেস-এ কোনও গ্রাউণ্ড নেই। আরও কিছু টাকা আদায় করে নিতে হবে মালিকের থেকেএই ট্রীটমেণ্টের জন্য। আপাতত এইটুকুই করা যায়। ছেলে দুটোকে ধরা যেতো… যদি ওই পালিয়ে যাওয়া ছেলে-মেয়ে দুটোর কারও কোঅপরেশন পাওয়া যেত। এখন এর স্টেটমেণ্টের অপেক্ষা ছাড়া কিছু করার নেই। এইসব ভাবতে ভাবতেই অপলক দৃষ্টিতে অফিসার ইন চার্জ তাকিয়ে রইলেন শুয়ে থাকা ছেলেটির দিকে। বোঝার চেষ্টা করলেন ছেলেটা জ্বরের ঘোরে কী বলছে… জ্বড়ানো আওয়াজ হলেও কিছু কথা বোঝা যাচ্ছে –

 

 

দেখ লেঙ্গে কৌন হ্যায় সিকন্দর। তোর দে… সারে শিশে তোর দে। শিশে মে শকল দেখ আপনা… পান কা দুকান…

 

সামাজিক কর্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *