৩৪৬৯ : দেবজিৎ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়

 

৩৪৬৯ : দেবজিৎ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়

চৌত্রিশ উনসত্তরের অলিখিত বাবা হলো মঙ্গল ঘোষ। মঙ্গল ঘোষ,বয়স-চুয়ান্ন।এই আধ কাঁচাপাকা মঙ্গল ঘোষের কে হয় এই চৌত্রিশ উনসত্তর? আলিপুরের কোন বন্দি কি এই পঞ্চাশ পেরিয়ে আরেকটু দুমড়ে যাওয়া মঙ্গল ঘোষের ছেলে-যার যাবজ্জীবন কারদন্ড হয়েছে? একদিন বাড়ি ফেরার পথে ডাস্টবিনের পাশ থেকে কুড়িয়ে পাওয়া একটা বাচ্চা-যাকে ছেঁকে ঘিরে ধরেছিলো একদল কুকুর। ছেলেটাকে মানুষ করতে করতেই যৌবন চলে গেলো। অনেকে বলেছিলো,একটা বিয়ে করো।ছাপোষা  মঙ্গল ঘোষ ভয় পেয়েছিলো। বউ যদি এই ছেলেকে দূরছাই করে? ফলে এই পঞ্চাশে এসে মাঝে মাঝে অবিবাহিত মঙ্গল ঘোষকে আমরা একলা চুপচাপ বসে কিছু একটা ভাবতে দেখি। ফুরিয়ে যাওয়া জীবনের কথা ভাবে হয়তো। ছেলেটাও মানুষ হলো না। আলিপুর জেলে। খুনের আসামী। একটা বাজিতে হেরে যাওয়া মানুষের সাথে চৌত্রিশ উনসত্তরের সম্পর্কটা ঠিক কি-কিছুতেই জানা যাচ্ছে না।

হয়তো এসব কিছুই না। চৌত্রিশ উনসত্তর আসলে ভাগ্যবিশ্বাসী মঙ্গল ঘোষের প্রিয় লটারীর নাম্বার। একদিন তার বিশ্বাস, এই নাম্বারে বড় প্রাইজ হবে। আর বড় প্রাইজ হলে সে একটা ট্যাক্সি কিনবে। নিজের ট্যাক্সি। অথচ রোজ লোকটা নিজের বিশ্বাসের কাছে ঠকে যায়। কখনও সখনও চৌত্রিশ উনসত্তরে ছোট খাটো প্রাইজ খেলেও দেয়। আমরা আশাবাদী মঙ্গল ঘোষকে আরো আশাবাদী হয়ে যেতে দেখি সেদিন সেদিন।

আসলে ডব্লিউ বি ছাব্বিশ ডি চৌত্রিশ উনসত্তরের ড্রাইভার মঙ্গল দা ওরফে মঙ্গল ঘোষ। চৌত্রিশ উনসত্তর আসলে একটা হলুদ ট্যাক্সির ডাকনাম। সবাই তাকে ওই নামেই ডাকে। আর তার ভালো নাম হলো,ট্যাক্সি। বয়স আট। আট বছর ট্যাক্সির ক্ষেত্রে একটা বেশ সদ্য চল্লিশের মত বয়স। এই হিসাবটা আমাকে মঙ্গল দাই শিখিয়েছে। মানুষের পাঁচ বছর সমান ট্যাক্সির এক বছর। পনেরো বছরের মাথায় কাটাই। মানুষের পঁচাত্তরে মৃত্যু। কি সরল ভাবে মিলিয়ে দিয়েছিলো অঙ্ক টা। সেই হিসাবে এই গাড়ি এখন সদ্য চল্লিশে আর এই পুরো সময়টাই সে বিশ্বস্ত মঙ্গল ঘোষের কাছেই ছিল। প্রথম দিকে সম্পর্কটা বাবা-ছেলের মত থাকলেও,এখন এই অসম বয়স বৃদ্ধির খেলার চোটে তারা এখন অসম বয়সের বন্ধুর মত হয়ে গেছে। সবথেকে মজার ব্যাপার হলো,একসময় ট্যাক্সির বয়স মঙ্গল ঘোষের বয়সকে ছাড়িয়ে যাবে।

এই ট্যাক্সির গায়ে টোল নেই।টোল থেকে না। আমরা আহত গাড়ির গায়ে হাত বোলাতে দেখেছি মনখারাপ করা মঙ্গল ঘোষকে। দু একদিনের মধ্যেই গাড়ির গা থেকে কিরকম ভাবে য্যানো দাগগুলো হারিয়ে যেত।যেন কিছুই হয়নি। গাড়িটা আট বছর মঙ্গল দার কাছে থাকতে থাকতে অনেকেই ভাবতো-গাড়ির আসল মালিক মঙ্গল ঘোষ। কেনই বা ভাব্বে না? গাড়ির প্রশংসা করলে-আম্রা কাঁচা পাকা মঙ্গল ঘোষকে গর্বিত পিতার মত মুখ চোখে ঢুকে যেতে দেখেছি। কয়েকটা মাত্র গল্প,সাত কি আটটা। সেই গল্প গুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মঙ্গল দা বলে যায়। কবে উড়িষ্যায় ডাকাতের হাত থেকে পালিয়েছিল এই গাড়ি,কত তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেছে তারকেশ্বর। এইসবই। সেই একই গল্প ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমরা সবাই কম বেশি শুনে ফেলেছি। তাও মঙ্গল দা বলেই যায়।বলেই যায়।

একবার সারা শহর ঘোরাতে ঘোরাতে মাতাল আমিকে সারা শহরের গল্প শুনিয়েছিলো অলিখিত গল্পকার মঙ্গল ঘোষ ও তার ট্যাক্সি।শহরের প্রত্যেকটা জায়গায় যেন গল্প জমে।আছে। আর আমরা সেখান দিয়ে গেলেই,মঙ্গল দা গল্প গুলো ছুঁয়ে দিচ্ছিলো।ছুঁয়ে দিলেই গল্পরা খুলে যায়। একটা গল্প শেষ হতে না হতে আমরা আরেকটা গল্পে পৌঁছে যাই। রাজবল্লভ পাড়ার মুখে সুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ভুতুড়ে মেয়েটা যেন সত্যি।এক্ষুনি হাত দেখাবে আর দরজা খুলে উঠে আসবে আমারই পাশে। তারপর যাদবপুরের একটা ঠিকানা দেবে। পৌঁছে ভাড়া আনতে বাড়ির ভেতর সেই যে যাবে,আর ফিরবে না। বাড়ির লোক জানাবে,মেয়েটি পাঁচ বছর আগে মারা গেছে।আজ তার জন্মদিন। বৃষ্টি নেমেছে। আকাশ অন্ধকার।উইন্ডস্ক্রিনে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে ফেটে যাচ্ছে। আমরা রাজবল্লভপাড়া পাড় করছি।

গাড়িটার বয়স আট। আর সাত বছর বাদে কাটাই। তখন মঙ্গল ঘোষ ষাট বোধহয়। ষাট বছরের একটা মানুষের থেকে তার এতদিনের একটা সম্পর্ককে কাটাই করে দেওয়া হবে।তারপর? তারপর কি সব খোয়ানো মঙ্গল ঘোষ আবার নতুন কোন ট্যাক্সির স্টিয়ারং ধরবে? হয়তো পেটচালানোর তাগিদে ধরতেও পারে। কিন্তু চৌত্রিশ উনসত্তরের কথা কি ভুলতে পারবে? কোলকাতার এখান সেখানে চৌত্রিশ উনসত্তরের আত্মার সাথে বৃদ্ধ,ক্ষুধার কাছে হেরে গোভূত মঙ্গল ঘোষের দেখা হয়ে যেতেই পারে।

সেদিন ছিল বর্ষার কোন একটা রাত। রাত ঠিক না। ভারী সন্ধে বরং। আলপটকা দূরের ভাড়া সেরে ফেরার পথে বৃষ্টি নামে। রোজ সন্ধেবেলা গাড়ি গ্যারাজ করে এক বোতল বাংলা মদ খাওয়া শ্রান্ত মঙ্গল ঘোষের অভ্যাস। তখনই সাড়ে আটটা। ফলে এই বৃষ্টির আমেজে, কাঁচ তুলে অল্প অল্প মদ খেতে খেতে খালি গাড়ি নিয়েই বাড়ি ফিরে আসছিলো মঙ্গল ঘোষ। যশোহর রোডে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে একটা পাগলি যে শেডের নিচেই যায় না কেন-মানুষ তাড়িয়ে দেয়। আর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে পাগলি অস্বাভাবিক ভাবে চিৎকার করছে-যেন তার গায়ে কেউ সুঁচ ফুটিয়ে দিচ্ছে। রাস্তার উল্টোদিকে একটা ফাঁকা শেডের দিকে দৌড়াতে গিয়ে সেই পাগলি চৌত্রিশ উনসত্তরের চাকার নিচে চলে যায়। সম্পুর্ন ভাবে ড্রাইভার নির্দোষ কারণ ব্যাপারটা এমন ভাবেই ঘটে যে-ড্রাইভারের কিছু করার ছিল না। মুখে মদের গন্ধ ও রান ওভার কেসের জন্য নিদোর্ষ মঙ্গল ঘোষের জেল হয়। চৌত্রিশ উনসত্তরের হাল্কা করে তুবড়ে যাওয়া বাম্পারে সেই পাগলির শুকনো রক্ত লেগেছিলো। পাগলির বৃষ্টির ভয় থেকে মুক্তি হয়। এই ভালো ভালো গল্পে ঠাসা চৌত্রিশ উনসত্তর আদপেই একজন অনিচ্ছাকৃত খুনের আসামী।

 

সামাজিক কর্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *