বলিউডের আয়নায় মাওবাদী আন্দোলন – ‘চক্রবুহ্য’ : শুভম আমিন

 

শুভম আমিন, সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজী বিভাগ, শ্রীরামকৃষ্ণ সারদা বিদ্যামহাপীঠ ।শ্রীরামপুর কলেজ থেকে ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ও এম.ফিল। বিষয়, মার্কসীয় দৃষ্টিতে এলিজাবেথ গ্যাসকেলের উপন্যাস। বর্তমানে ভদোদরার মহারাজা সয়াজীরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে পি.এইচ.ডি গবেষণারত। বিষয়, ভ্যাম্পায়ারের গল্প। আগ্রহের বিষয়, মাওবাদী আন্দোলন ও এলজিবিটি আন্দোলন।

 

 

১৯৭২ সালে চারু মজুমদারের মৃত্যুর সাথে সাথে নকশাল আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায় শেষ হলে মূলধারার  ভারতীয় গণমাধ্যম নকশাল আন্দোলন ও তার কর্মীদের সম্পর্কে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অবতারণা করে| ১৯৬৭ – ৭২ পর্যায়ের গণমাধ্যমগুলোতে নকশাল আন্দোলন সম্পর্কিত লেখা এবং সমসাময়িক ছবিগুলি দেখলে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওদের তা হলো মূলধারার বাণিজ্যিক ছবিতে মধ্যবিত্ত রোমান্টিকতার আধিক্য ও সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সুচারু ও প্রকট অনুপস্থিতি | সমকালীন উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মূলত এসেছে মূলধারার বাইরে সমান্তরাল ছবি যেমন মৃনাল সেনের ‘ কলকাতা ৭১ ‘ বা ঋত্বিকের ‘ যুক্তি তক্কো গপ্পো ‘ তে | কিন্তু উক্ত ছবিতে মতাদর্শগত বিশ্লেষণ (ইডিওলজিক্যাল ডিসকোর্স) যেভাবে চিত্রায়িত ও আলোচিত হয়েছে, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের বিষয়টি কিন্তু সেভাবে বিশ্লেষিত হয়নি | মতাদর্শগত সংকট ও রাজনৈতিক অন্বেষণই ছিল মূলত সত্তর দশকে নকশাল আন্দোলনের উপর নির্মিত ছবিগুলির মূল উপজীব্য|

ছবিটা কিছুটা হলেও বদলাতে শুরু করে নব্বইয়ের শেষ দিকে | এই সময়ে নকশাল আন্দোলনের আদর্শবাহী মাওবাদী আন্দোলনের প্রসার ঘটার সাথে সাথে মূলধারার গণমাধ্যমও ভারতীয় জনমানসে এই আন্দোলন সম্পর্কে এক বিস্ময়মিশ্রিত আগ্রহের সঞ্চার হয় |  স্বাভাবিকভাবেই , মূলধারার ছবিতেও মাওবাদী আন্দোলন তার পরোক্ষ উপস্থিতির প্রমাণ রাখে |
এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে এই পর্যায়ে ভারতীয় গণমাধ্যম বিভিন্নভাবে নকশালবাড়ী আন্দোলন নিয়ে ডিসকোর্স রচনায় মনোনিবেশ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গির অন্তর্গত ধারনাগুলি হল নকশাল আন্দোলনকারী মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের বিপথগামী হিসাবে চিহ্নিতকরণ ও তাদের পরিণতিকে ভ্রান্ত মতাদর্শের অনিবার্য ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখানো এবং নকশাল আন্দোলনকে বিগত ইতিহাস হিসেবে চিহ্নিত করে রোমান্টিক অতীতচারিতায় মনোনিবেশ। এর ফলে একাধারে যেমন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নৃশংসতাকে সুকৌশলে চেপে দেওয়া হয়, তেমনি অন্যদিকে নকশাল আন্দোলনের চলমানতার বিষয়টিকেও জনমানসে চেপে যাওয়া যায়। সংবাদমাধ্যমের এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ছবির জগতেও পড়ে। বেশ কিছু বাণিজ্যিক বাংলা ছবি যেমন ‘শেষ প্রহর’, ‘সোপান’ ইত্যাদিতে গণমাধ্যমের এই ধারণারই প্রকাশ ঘটে। আঞ্চলিক স্তরে বাংলা এবং তেলেগু ছবিতে অতীতের নকশাল আন্দোলন ও সমকালীন মাওবাদী আন্দোলনের বহুমুখী চিত্রায়ণ ঘটলেও মূলধারার বলিউডের ছবিতে মাওবাদী আন্দোলনের প্রভাব সেভাবে অনুভূত হয়নি, বরং সচেতন ভাবেই বলিউড বিষয়টিকে এড়িয়ে চলেছিল, একমাত্র পরিচালক গুলজারের কিছু ব্যতিক্রমী ছবি (যেমন ‘হু তু তু’) ছাড়া।

মূলধারার বলিউড ছবিতে মাওবাদী আন্দোলনকে পূর্ণাঙ্গরূপে তুলে ধরার প্রথম প্রয়াস দেখা গেল পরিচালক প্রকাশ ঝা পরিচালিত ছবি ‘চক্রব্যূহ’তে। মূল ছবির গল্প দুই বন্ধুর সম্পর্কের টানাপোড়েনকে ঘিরে আবর্তিত হলেও তা পূর্ণত রাজনৈতিক মাত্রা পায় তাদের সামাজিক ও মতাদর্শগত বিপরীতমুখী অবস্থানে। ছবির নায়ক কার্যত দুজনঃ ভূপালের পুলিশ সুপার আদিল খান (অর্জুন রামপাল)ও তার বন্ধু মোবাইল ফোনের ব্যর্থ ব্যবসায়ী কবীর (অভয় দেওল)। প্রথমজন তার ‘দেশভক্তির আদর্শ’ –এর কারণে নন্দীঘাট জেলায় স্বেচ্ছায় বদলি হন, মাওবাদী হামলার দৌরাত্ম্যে যখন সেখানে ৮৪ জন পুলিশকর্মীসহ এস.পি. নিহত হয়েছেন এবং কোন অফিসার সেখানে খেতে চাইছেন না। পুলিশ অফিসার স্ত্রী রিয়ার (এষা গুপ্তা) আপত্তি সত্ত্বেও আদিল খান নন্দীঘাট যান এবং বিভিন্ন জনকল্যানমুখী কাজের মধ্য দিয়ে পুলিশের মানবিক মুখ আদিবাসী জনগনের সামে তুলে ধরতে সচেষ্ট হন। কিন্তু উপযুক্ত ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের অভাবে তিনি মাওবাদী নেতা রাজন(মনোজ বাজপেয়ী) এবং জুহি(অঞ্জলি পাতিল) এর নাগাল না পাওয়ায় তিনি পিছু হটতে বাধ্য হন। তখনই তাঁর পরিত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তাঁর ভবঘুরে বন্ধু কবীর। আদিল খানের চর হিসাবে কবীর সুকৌশলে মাওবাদীদের দলে ভিড়ে তার পুলিশ বন্ধুকে গোপন খবর সরবরাহ করতে থাকে, যার পরিণতিতে পুলিশের জালে ধরা পড়েন মাওবাদী নেতা রাজন। পরবর্তীতে মাওবাদী নেত্রী জুহির গ্রেপ্তার ও পুলিশ লক আপে তার ওপর নৃশংস নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে কবীর মাওবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন এবং মাওবাদী সংগঠনের প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সাথে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে নিহত হন যে সংগ্রামের পরিণতি ঘটে পুলিশ বাহিনীর হাতে কবীরের মৃত্যুতে।

‘চক্রব্যূহ’ ছবিটির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ও অভিনবত্ব হল যে গল্পের ঘটনাবলীর ভরকেন্দ্র হল মাওবাদী আন্দোলন। অতীতে নকশালবাড়ী ও মাওবাদী আন্দোলন নিয়ে যে সমস্ত ছবি আমাদের চোখে পড়ে, তার প্রেক্ষাপটে থাকে রাজনৈতিক ঘটনাবলী ও ছবির কেন্দ্রে থাকে ব্যক্তির মনোজাগতিক ও মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব। পরিচালক প্রকাশ ঝা কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যক্তির মনোজাগতিক সঙ্কটের পরিবর্তে প্রাধান্য দিয়েছেন সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও বাস্তবতাকে। মনে রাখতে হবে যে, ২০০৪-১৪ সময়কাল অন্ধ্রে সাংগঠনিক বিপর্যয়ের পর ওড়িশা, ঝাড়খন্ড, গড়চিরৌলী, জঙ্গলমহল ও মূলতঃ ছত্তিশগড়ের বস্তার অর্থাৎ দন্ডকারণ্য অঞ্চলে মাওবাদী আন্দোলনের বিকাশ ও আধা-সামরিক বাহিনীর সাথে রক্তাক্ষয়ী সংগ্রামের উতুঙ্গ পর্যায়ের কাল। এই সময়ে বস্তার তথা দণ্ডকারণ্যে সি.পি.আই(মাওবাদী) একদিকে যেমন উল্লেখযোগ্য সামরিক সাফল্য পেয়েছে, তেমনি বেশ কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর সাংগঠনিক ও সামরিক ক্ষতিও তাকে সহ্য করতে হয়েছ। যে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য তা হল, এই পর্বে মাওবাদীদের সামরিক সাফল্য ভারত সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রমানস্বরূপ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিং এর ‘মাওবাদীরা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার পক্ষে সবচেয়ে বড় বিপদ’ (greater threat to internal security) এর মত মন্তব্য বা শান্তি আলোচনার শর্ত নিয়ে ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি.চিদাম্বরম ও মাওবাদী নেতা কোটেশ্বর রাও ওরফে কিষেণজীর বিতর্কের উল্লেখ করা যেতে পারে। এছাড়াও এই কালপর্বে একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক আন্দোলন ছিল ওড়িশার নিয়মগিরিতে বক্সাইট উত্তোলনের বরাত ‘বেদান্ত’ সংস্থাকে দেবার বিরুদ্ধে। এই আন্দোলনের নেপথ্যে ছিল মাওবাদীরাই। ‘চক্রব্যুহ’ ছবিতে পরিচালক এই সমকালীন ঘটনাগুলিকে কালানুক্রমিকভাবে সাজিয়েই ছবির গল্প বুনেছেন। ছবির শুরুতেই একদিকে গ্রেপ্তার হন মাওবাদী চিন্তাবিদ (ideologue) গোবিন্দ সূর্যাংশী (ওম পুরী)। অক্সফোর্ড ফেরত এই নেতার চরিত্র ও বর্ণনায় মাওবাদী নেতা কোবাড ঘান্দীর ছায়া স্পষ্ট। আবার অন্যদিকে, মাওবাদী নেতা রাজনের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ৮৪ জন সি.আর.পি.এফ জওয়ানের মৃত্যু মনে করিয়ে দেয় দান্তেওয়াড়ায় মাওবাদীদের সাথে সংঘর্ষে ৮৪ জন জওয়ানের মৃত্যুর কথা। তেমনিভাবে ব্যারিষ্টারের চরিত্রে আমরা মাওবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল বুদ্ধিজীবিদের ছায়া লক্ষ্য করি।

ছবিতে মূল যে বক্তব্য পরিচালক উপস্থিত করতে চেয়েছেন তা হল দেশের অরণ্য ও খনিজসম্পদ হস্তগত করতে বৃহৎ আন্তর্জাতিক কর্পোরেট সংস্থাগুলির আগ্রাসী মনোভাব এবং তাদের সমর্থনে দেশের রাজনৈতিক দলগুলির নির্লজ্জ মোসাহেবী। ছবির চরিত্রগুলি এখানে প্রতীকী, যারা এক-একটি মতাদর্শ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিস্বরূপ। বলাবাহুল্য যে এখানে পরিচালক মূলধারার বলিউডি ঘরানার ধাঁচে কতকগুলি ছকে বাঁধা চরিত্র হাজির করেছেন যেমন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতা, সৎ ও অসৎ পুলিশ অফিসার, অসৎ ট্রেড ইউনিয়ন নেতার ধাঁচে অসৎ মাওবাদী নেতা ও প্রতিবাদী যুবক। এছাড়াও অর্জুন রামপাল ও এষা গুপ্তার অতিনাটকীয় অভিনয় ও অনাবশ্যক মেলোড্রামা ছবির বাঁধুনিকে বেশ কিছুটা আলগা করে দিয়েছে। মাওবাদী সন্ত্রাস নিয়ে বেশ কিছু প্রচারধর্মী দৃশ্য আছে (নিরীহ গ্রামবাসীকে প্রথমে কান কেটে নির্যাতন ও পরে হত্যা) যেগুলি ঝা মশাই সেন্সর বোর্ডের চাপে করেছেন বলে মনে করাই স্বাভাবিক যদিও এর কিয়দংশের সত্যতা অনস্বীকার্য। সব মিলিয়ে মাওবাদী হিংসা ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এক নৈর্ব্যক্তিক ইত্র তুলে ধরার যে প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় তা প্রশংসনীয়।

বেশ কিছু অতিনাটকীয়তা সত্ত্বেও এই ছবি যে সমকালী ভারতে আসিবাসী সমাজের প্রান্তিক ও বঞ্চনাক্লিষ্ট অবস্থান ও কর্পোরেট লুটের চিত্রটি মোটের ওপো বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরেছে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সাথে সাথে দেশভক্তির কপট অভিব্যক্তি ও সামরিক বাহিনীকে নিয়ে ভারতীয় মধ্যবিত্তের নিরন্তর আদিখ্যেতা ও অফুরান আদেখলামোর বাইরে বাস্তবতার যে পরিসর এ ছবি সৃষ্টি করেছে, বলিউডি ঘরানায় তা বিরল। ছবিতে উল্লিখিত গোবিন্দ সূর্যাংশীর একটি সংলাপ “ম্যায় উস লোকতন্ত্র মে বিসওয়াস নেহি করতা, যো গরীবকা ইজ্জত করনা নেহি জানতি’’( “আমি সেই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করিনা, যেখানে খেটে খাওয়া মানুষ তার যোগ্য মর্যাদা পায় না”) আসলে কর্পোরেট ইন্ডিয়ার বাইরে বৃহত্তর ভারতের ছবি, গণতন্ত্র আজও যেখানে নিছক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও বিজ্ঞাপনী চটক মাত্র।

 

Facebook Comments
শেয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *