আইন রয়েছে, তবু অধিকারহীন বনবাসীরা : দেবাশিস আইচ

 

আইন রয়েছে, তবু অধিকারহীন বনবাসীরা : দেবাশিস আইচ

 

লেখক ও সাংবাদিক। প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ (পিইউসিএল), পশ্চিমবঙ্গ। 

 

 

 

বন কার? অর্থাৎ, বনের অধিকারী কে বা কারা? প্রকৃতি প্রেমী মানুষ বলবেন, কেন বন বাঘ-হাতি-সিংহের। বন যাঁদের আরো প্রিয় তাঁরা পাখির কথা বলবেন, বলবেন সাপ-ব্যাঙ আর অসংখ্য কীট-পতঙ্গের কথা। লতা-বুনো ঝোপ থেকে মহাদ্রুম বাদ যাবে না তাদের তালিকা থেকে। সাধারণ ভাবে এঁরা সকলেই বলবেন, বনের অধিকারী রাষ্ট্র। কখনোই বলবেন না, বনবাসীদের কথা। কেন না, আমরা তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে ঠিক ততটা ওয়াকিবহাল নই। এখন যদি বলি, রাষ্ট্র নয়, বনের আইনি মালিক বনবাসী আদিবাসী ও চিরাচরিত অরণ্য নির্ভর জনগোষ্ঠী। জানি অনেকানেক চোখ কপালে উঠবে। অথচ, এঁদের অনেকেই ‘অরণ্যের অধিকার’ পড়ে ফেলেছেন। জল-জঙ্গল-জমির জন্য, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য আদিবাসী লড়াইয়ের ইতিহাস জানেন এবং ওড়িশার আদিম অধিবাসী ডোঙরিয়া কন্ধদের নিয়মগিরির বন-পাহাড় রক্ষার সাম্প্রতিক অতুলনীয় সংগ্রামের কাহিনি তাঁদের বিস্মৃত হওয়ারও কথা নয়। অথচ, তাঁদের মধ্যে হাতে গোনা মানুষকে আমরা দেখেছি বনাধিকার বিষয়ে সোচ্চার হতে। কেন না আমাদের মননে বনবাসী বলতে যে ছবি ফুটে ওঠে তা — কালোকুলো অসুর, নিষাদ অসভ্য জনগোষ্ঠীর। যাদের চেতনে-অবচেতনে মানুষ বলে মনে করিনি, তাদের আবার অধিকার!

অথচ, বহু লড়াইয়ের পর ২০০৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভারতের সংসদ বনাধিকার আইন পাশ করে। তার পোশাকি নাম, “বনবাসী তফশিলি জনজাতি এবং অন্য পারম্পরিক বনবাসীদের বনাধিকার স্বীকার আইন, ২০০৬।” এই বনাধিকার আইন, ২০০৬ নিয়মমাফিক বিজ্ঞাপিত হয় ৩১ ডিসেম্বর, ২০০৭-এ। ‘বনাধিকার স্বীকার,’ এই শব্দ বন্ধের মধ্যেই রয়েছে রাষ্ট্রের স্বীকারোক্তি। কেন এই আইনের  প্রস্তাবনায় ব্যাখ্যা করে বলা হচ্ছে, “বনবাসী তফশিলি জনজাতি এবং অন্যান্য যে সমস্ত পারম্পরিক বনবাসীরা বংশানুক্রমে অরণ্যে বাস করছেন, তাঁদের বন-সম্পদের ও বনভূমির উপর দখলিস্বত্বের অধিকার এতকাল নথিবদ্ধ করা যায়নি। তাদের এই অধিকার স্বীকার ও প্রদানের জন্য; বিভিন্ন স্বীকৃত ও অর্জিত অধিকারগুলিকে নথিবদ্ধকরণের এক প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য এবং বনভূমিতে এই স্বীকার ও অর্জনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণাদি কী হতে পারে, তা স্থির করার জন্য।” অর্থাৎ, রাষ্ট্র স্বীকার করছে বনবাসীদের অধিকার ছিল যা দীর্ঘকাল যাবত অস্বীকার করে আসা হয়েছে। কী সেই অধিকার? তাদের ‘স্বাভাবিক আবাস’-এর অধিকার। এ কথা বলতে বোঝায় যে, চিরাচরিত বাসভূমি এবং সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত বনাঞ্চলে আদিম আদিবাসী গোষ্ঠীর এবং অন্যান্য অরণ্যবাসী জনজাতিদের বসবাস করার এবং উচ্ছেদ না হওয়ার অধিকার।

গৌণ বনজ সম্পদ সংগ্রহের অধিকার এই আইন তাদের ফিরিয়ে দিয়েছে। গৌণ বনজ সম্পদ বলতে বোঝায়, কাঠ ছাড়া অন্যান্য সব উদ্ভিদজাত জিনিস যেমন, বাঁশ, মরা গাছের গুঁড়ি, বেত, গুটি পোকা, মধু, মোম, লাক্ষা, কেন্দু পাতা, ভেষজ গাছ-গাছরা, মূল, কন্দমূল, জ্বালানি কাঠ। এই সকল বস্তুই ব্যাপক বাণিজ্যিককরণের মাধ্যমে বনবাসীদের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের স্বত্বাধিকার একরকম লুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। অথচ যুগযুগ ধরে এই বনজ সম্পদ সংগ্রহের সঙ্গে তাদের আর্থিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক যোগ রয়েছে। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই এ অধিকার লুপ্তির শুরু। বনের জলাশয়-নদী-ঝোরা থেকে মাছধরা কিংবা পশুচারণের অধিকার এখন এই আইন দ্বারা সিদ্ধ। এ কথা বলা যায়, ঔপনিবেশিক ভারতীয় বন আইন, ১৯২৭, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন, ১৯৭২, ২০০২, ২০০৬ এবং অংশত বন সংরক্ষণ আইন ১৯৮০ অনুযায়ী বনের যে সর্বময় কর্তৃত্ব বন দফতরের ছিল, বনাধিকার আইন ২০১৭ পরবর্তী সময়ে তা অনেকটাই খণ্ডিত হয়ে পড়েছে।

যে আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, আদিবাসী এবং অন্যান্য বন-নির্ভর জনগোষ্ঠীভুক্ত মানুষেরা ‘ঐতিহাসিক অন্যায়’-এর শিকার, সেই আইন কি আদৌ মর্যাদা পেল? এখন সে আলোচনায় আসা যাক। আইন অনুযায়ী, অরণ্যচারী মানুষের বসবাস ও চাষের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে বলা হয়, ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত ভাবে জমির পাট্টা দেওয়া হবে। জঙ্গলমহল গোপীবল্লভপুরে প্রায় ৫০টি গ্রামের ৬০০০ জন ২০০৮ সালে পাট্টার আবেদন জমা দিয়েছিল। ২০১১ সাল পর্যন্ত মাত্র ৬০০ জন সামান্য পরিমাণ জমি পাট্টা পায়। ২০১৫ সালেও আবেদন নেওয়া হয়। কিন্তু কেউ পাট্টা পায়নি। এখানে পাট্টা বলতে বোঝানো হচ্ছে বনভূমি ব্যবহার করছেন এমন মানুষদের বাস্তুজমি বা কৃষিজমির বিবরণ সহ শংসাপত্র, মালিকানার দলিল নয়। এখনো পর্যন্ত, রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের হিসেব মোতাবেক, তিরিশ হাজারের কিছু বেশি পাট্টা দেওয়া হয়েছে।

এমনটা হয়েছে, হচ্ছে তার এক বড় কারণ হল, সরকার, বন দফতর, উন্নয়ন লোভী পুঁজি, রাজনৈতিক দল মুখে না বললেও এই আইনকে কার্যত অস্বীকার করে চলেছে। অস্বীকার করার কারণ বনজ সম্পদ লুঠের মৌরসিপাট্টা হাতছাড়া হয়ে যাবে। আইন বলছে, এই অধিকার নিশ্চিত করবে বনগ্রামের বাসিন্দারা। গ্রামের প্রাপ্তবয়স্করা মিলিতভাবে গ্রামসভার মাধ্যমে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেবে। বনবাসী, বনজীবী কিংবা বনগ্রামবাসী নয় এমন কোনো ব্যক্তি গ্রামসভার সদস্য হওয়ার উপযুক্ত নন। পঞ্চায়েতি গ্রামসভা বা গ্রামসংসদ নিরপেক্ষ এই বন-গ্রামসভা। এ ছাড়া গঠন করতে হবে ‘বন অধিকার কমিটি’। গ্রামসভা তার সদস্যদের মধ্য থেকে ১৫ জনকে বেছে নিয়ে এই কমিটি নির্বাচন করবে। কমিটি অধিকার প্রস্তাব তৈরি করবে।

না, তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার এ আইন ভালো চোখে দেখেনি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বনগ্রামবাসীরা বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই রাজ্য সরকার ২০০৮-এর মার্চ মাসে সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে দুটি আদেশনামা জারি করে। এই আদেশনামা অনুসারে পুরোনো গ্রামসংসদের কাঠামো অনুযায়ী বনঅধিকার কমিটি তৈরি করতে থাকে। যাতে দল ও সরকারের ক্ষমতা বজায় থাকে। আইন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার কোনো চেষ্টাই তারা করেনি। দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গলমহলে এই যথেচ্ছাচার হয় সবচেয়ে বেশি। কেন না এখানে বনাধিকার বিষয়ে কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। সুন্দরবনে বনজীবীদের অধিকারকেই সরাসরি অস্বীকার করা হয়। একমাত্র জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলায় কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। আইন অনুযায়ী গ্রামসভা গড়ে সরকারি কর্তাদের বানানো গ্রামসভা ভেঙে দেওয়া হয়। সে কাজ খুব সহজ হয়নি। কোচবিহার বন এলাকার চিলাপাতা বনাঞ্চলের কোদাল বস্তি বনগ্রামের রাভা বাসিন্দারা গ্রাম সংলগ্ন বনে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বনের উপর তাদের অধিকার ঘোষণা করে। বনাধিকার আইন অনুযায়ী এ অধিকার তাদের প্রাপ্য। সাইনবোর্ডে এ টুকুই লেখা ছিল। অথচ, প্রচারিত হল গ্রামবাসীরা সংরক্ষিত সরকারি জঙ্গল দখল করছে। বনবিভাগ এই কাজকে বেআইনি আখ্যা দিয়ে হাসিমারা থানায় অভিযোগ দায়ের করে এবং দুটি সাইনবোর্ড বাজেয়াপ্ত করে। পরদিন গ্রামসভা থেকে পালটা অভিযোগ দায়ের হয়। এর আগেই অবশ্য চিলাপাতা অরণ্যে ১২টি গ্রামের বাসিন্দা পৃথক পৃথক গ্রামসভা বানায় এবং লিখিত প্রস্তাবে অরণ্য সম্পদের উপর তাদের কর্তৃত্ব ঘোষণা করে। ২০০৮-এর সেপ্টেম্বরে তারা সংশ্লিষ্ট সব সরকারি দফতরকে জানিয়ে দেয় গ্রামসভার অনুমতি ছাড়া বনবিভাগ বন সাফাই বা ক্লিয়ার ফেলিং করতে পারবে না। তার আগে ২০০৮-এর এপ্রিলে কার্শিয়াং বন এলাকার তাইপুতে প্রায় তিনমাস বন্ধ করে দেয় বনবাসীরা। বাণিজ্যিক কারণে বন সাফাই বন্ধ হয়ে যাওয়া, কাঠমাফিয়া এবং বনদফতর ও রাজনৈতিক দলগুলির কাছে বিপদ সংকেত বয়ে আনে। শুরু হয় ভয় দেখানো, মারধর, মিথ্যা মামলা। বাম সরকারের নেতা-মন্ত্রী, বনবিভাগের আমলাদের প্ররোচনায় আন্দোলনের নেতা সুন্দর সিং রাভা, শ্যামল রাভাদের জেলবন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে পুলিশ-প্রশাসন। শেষ পর্যন্ত সম্মিলিত প্রতিবাদের মুখে তারা পিছু হঠে। বনের উপর কায়েমি স্বার্থের ভোগদখল নিশ্চিত করতেই যে এই আক্রমণ তা বুঝতে সমাজতাত্ত্বিক হতে হয় না। বর্তমান সময়ে সেই ট্র‍্যাডিশনের বদল ঘটেনি। বনাধিকার আইনকে মর্যাদা দেয়নি বর্তমান সরকারও।

আসলে ঔপনিবেশিক আমল থেকেই বন মুনাফার খনি। প্রাকৃতিক জঙ্গল নাশ করে ধুপি,টিক,ইউক্যালিপটাস জাতীয় একবৃক্ষ বাগিচা বা মনোকালচার প্ল্যান্টেশনে জোর দেওয়া হয়েছে স্রেফ বাণিজ্যিক কারণে। বিপুল ভাবে ধ্বংস করা হয়েছে জীববৈচিত্র্য। বন্যপ্রাণীদের খাদ্যাভাব যেমন দেখা দিয়েছে, তেমনই বেড়েছে মাটির নীচের জলসংকট, ভূমিক্ষয় ধসের বিপদ। ভারতের অধিকাংশ প্রাকৃতিক জঙ্গল ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সরকারি ‘বৈজ্ঞানিক বন পরিচালনা’র মুখ্য লক্ষ্য ছিল প্রাকৃতিক অরণ্য নি:শেষ করে বাণিজ্যিক বাগিচা তৈরি করা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী এই সময়ে ১৭০ লক্ষ হেক্টার জমিতে নতুন বাগিচা-জঙ্গল গড়ে ওঠে। ভারতীয় বন সর্বেক্ষণের রিপোর্ট বলছে, ২০০০ সালে মোট বাগিচা এলাকা ছিল ৩৪০ লক্ষ হেক্টার। আর ২০২০ সালের লক্ষ্য ৬৫০ থেকে ৭০০ হেক্টার বাণিজ্যিক বাগিচা তৈরি করা। এ ছাড়াও রয়েছে বড় বাঁধ, খনি, শিল্প, হাইওয়ে, সেনাছাউনি জাতীয় ‘মহতী উন্নয়ন’-এর প্রয়োজন। অতএব বনবাসীদের উচ্ছেদ সেখানে মূল লক্ষ্য। ১৯৫১ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে এই উন্নয়নের ধাক্কায় দুকোটিও বেশি মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। আর এই ভয়াবহ নীতির বিরোধিতা করেই ২০০২ সালের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনের লাগাতার চাপ শেষ পর্যন্ত বনাধিকার আইনের জন্ম দেয়।

এর পরও অবশ্য উচ্ছেদ বন্ধ হয়নি। লক্ষ লক্ষ হেক্টার বনভূমি শিল্পপতিদের হাতে তুলে দিতে চায় বর্তমান কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক। শিল্পপতিদের বাণিজ্যিক প্রয়োজনে ব্যক্তিগত বাগিচার পরিকল্পনাও সরকারের মাথায় গিজগিজ করছে। কী রাজ্য সরকার কী কেন্দ্র নিজের তৈরি আইন মানতে চাইছে না।অর্থাৎ, আদিবাসী ও অন্যান বনবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা প্রশ্নের মুখে। প্রশ্নের মুখে জীবনের অধিকার। দেশের সংবিধান যাকে মহত্তম মৌলিক অধিকার হিসেবে মান্যতা দিয়েছে।

 

কৃতজ্ঞতা : বনাধিকার আইন – ২০০৬, লড়াইয়ের হাতিয়ার, ২০০৯।

বনবাসী অধিকার কথা, ২০১৩। 

ছবি ঋণ : প্রমোদ গুপ্তা

 

Facebook Comments
শেয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *