প্রসঙ্গ মানবাধিকার :  দেবাশিস দাশগুপ্ত

 

প্রসঙ্গ মানবাধিকার :  দেবাশিস দাশগুপ্ত

 

দেবাশিস দাশগুপ্ত এই মুহূর্তে কোলকাতার প্রথিতযশা সাংবাদিকদের মধ্যে অন্যতম। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে কর্মজীবন শুরু করেন বর্তমান পত্রিকায়। দীর্ঘদিন বর্তমান পত্রিকার চিফ রিপোর্টার এর দায়িত্ব সামলেছেন, পরবর্তীকালে প্রতিদিন পত্রিকা হয়ে বর্তমানে এই সময় পত্রিকার সহকারী সম্পাদক পদে আসীন। রাজ্য রাজনীতির অসমান্তরাল সমীকরণগুলি তাঁর তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণবোধে সরল হয়ে ওঠে, এটাই তাঁর অন্যতম ইউ এস পি।

 

বিশ্ব মানবাধিকার দিবস সম্পর্কে যখন এই লেখা লিখতে বসেছি, ঠিক তখনই হাতে এল ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) ২০১৬ সালের রিপোর্ট৷ সেই রিপোর্ট বলছে, হিংসাত্মক অপরাধের ( ভায়োলেন্ট ক্রাইম) নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের স্থান সারা দেশের মধ্যে দ্বিতীয়৷ মানুষ পাচারে প্রথম৷ নারী নির্যাতনে দ্বিতীয়৷ দেশে অপরাধের সংখ্যা বিচারে বহু ক্ষেত্রেই প্রথম দশে স্থান এই রাজ্যের৷ এনসিআরবি-র ওই রিপোর্ট আরও বলছে, এই দেশে খুনের ঘটনায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ৷ উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও মহারাষ্ট্রের পরই এই রাজ্যের স্থান৷ তারা আরও জানাচ্ছে, শিশু নির্যাতনের ঘটনাও আমাদের রাজ্যে বাড়ছে৷

আরও বিস্তারিত তথ্যে যাচ্ছি না৷ সেই সব তথ্য পরিসংখ্যান এনসিবিআর-এর ওয়েবসাইট ঘাঁটলেই যে কেউ দেখে নিতে পারবেন৷ তবু কিছু সংখ্যা না দিলেই নয়৷ নীচের এই সারণী থেকে বোঝা যাবে, আমরা (পশ্চিমবঙ্গ) কোথায় আছি৷ এগুলিও মানবাধিকারের মধ্যেই পড়ে৷ কারণ, সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটা আমাদের জন্মগত অধিকার৷ এক নজরে এই সারণীটি দেখে (২০১৬ সালের হিসেব) নেওয়া যাক৷

 

 

ঘটনা সংখ্যা দেশের মধ্যে স্থান
হিংসাত্মক অপরাধ ৪৬,৭২৩ দ্বিতীয়
খুন ২০৪৪ চতুর্থ
খুনের চেষ্টা ১১,৯৭৩ প্রথম
গুরুতর জখম ১৮,১১৯ প্রথম
মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ ৩২,৫১৩ দ্বিতীয়

 

প্রাসঙ্গিক মন্তব্য: আমাদের রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সভা-সমিতি-সরকারি অনুষ্ঠানে সর্বদাই দাবি করেন, শান্তি শৃঙ্খলার প্রশ্নে নাকি এই রাজ্য সবচেয়ে সেরা৷ তিনি পুলিশকেও সার্টিফিকেট দেন সব সময়৷

আবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও দাবি করতেন, বাম জমানায় পশ্চিমবঙ্গ নাকি ছিল শান্তির মরূদ্যান৷ বলা দরকার, বাম জমানাতেও এনসিআরবি-র রিপোর্ট তত্কালীন শাসকের পক্ষে খুব একটা আশাপ্রদ কিছু ছিল না৷

এই নিবন্ধ লেখার দিনই সংবাদপত্রের কিছু খবরে চোখ আটকে গেল৷ সেই খবরগুলিও কিন্ত্ত মানবাধিকারের সঙ্গেই সম্পর্কিত৷

খবর ১: কানপুর থেকে ৬০ কিমি দূরে অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীরা গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে ৩০ বছর বয়সের এক সাংবাদিক নবীন গুন্তকে৷

মাস কয়েক আগেই বেঙ্গালুরুতে নিজের বাড়িতে দুষ্কৃতীদের গুলিতে নৃশংসভাবে খুন হন বিশিষ্ট সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ৷ তিনি একটি প্রতিবাদী চরিত্র ছিলেন৷ জড়িত ছিলেন নানা মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে৷

ত্রিপুরার আগরতলায় সম্প্রতি খুব অল্পদিনের ব্যবধানে পুলিশের হাতে নিহত হন দুই তরুণ সাংবাদিক শান্তনু ভৌমিক এবং সুদীপ দত্ত ভৌমিক৷

খবর ২: এক ব্রিটিশ মানবাধিকার সংস্থার সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, গত এক দশকে সব থেকে তলানিতে এসে ঠেকেছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা৷ ১৭২টি দেশের উপর করা এই সমীক্ষায় ভারতের স্থান ১৩৬ নম্বরে৷ খুব খারপের থেকে এক ধাপ উপরে৷ সব থেকে খারাপ হাল উত্তর কোরিয়ার৷

প্রাসঙ্গিক কিছু কথা: সারা পৃথিবীতে যে সংবাদমাধ্যম আজ চরম সঙ্কটে, তা সকলেরই জানা৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ভারতবর্ষ, আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এখন সাংবাদিকদের নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে৷ খোদ মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প সাহেব প্রায় রোজই সংবাদমাধ্যমকে গালি পাড়ছেন৷ সাংবাদিকদের ব্যক্তিগতভাবে কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম করে বাপবাপান্ত করছেন৷ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গেও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক মোটেই ভালো নয়৷ ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি খুব কম দিনই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন বা সাংবাদিক বৈঠক করেছেন৷ কালেভদ্রে সাংবাদিক বৈঠক করলেও তিনি কোনও প্রশ্ন নেন না৷ একই হাল এই রাজ্যেরও৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিক বৈঠক করলেও কখনও সাংবাদিকদের কোনও প্রশ্ন শোনেন না৷ কখনও কখনও বেয়াড়া প্রশ্ন শুনলে তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বসেন৷ একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের ইন্টারভিউয়ের সময় স্টুডিয়োতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদেরও প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল৷ এক পড়ুয়ার প্রশ্ন শুনেই তিনি রেগেমেগে স্টুডিও ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন৷ সেই দৃশ্য তামাম ভারতবাসী দেখেছেন৷

খবর ৩: পশ্চিমবঙ্গ শিশু সুরক্ষা কমিশন এবং ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস কমিশন একটি সমীক্ষায় বলেছে, কলকাতা শহর জুড়ে নাবালিকাদের অবাধে যৌন ব্যবসায় ব্যবহার করা হচ্ছে৷ ম্যাসাজ পার্লার, হোটেল, লজ, যৌনপল্লিতে এই সব নাবালিকা যৌনকর্মীর ৫৭.১ শতাংশই হিংস্র নির্যাতনের শিকার হয়৷

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এই তিনটি খবরের সারাংশই বুঝিয়ে দিচ্ছে, দেশে দেশে মানবাধিকার কতটা সুরক্ষিত৷ মানুষের সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা অধিকার, মুক্ত চিন্তার অধিকার, হিংসা, ভয়, দারিদ্র থেকে মুক্তির অধিকার ইত্যাদি সব কিছুই বৃহত্তর অর্থে মানবাধিকারের সামিল৷ এ কথা বলা বোধ হয় অন্যায় হবে না যে, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই আজ মানবাধিকার বিপন্ন৷ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দেশে দেশে এই বিপন্নতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে চলেছে৷ তাতে কাজ কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে৷ তবে মানবাধিকার সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই সংগঠনগুলির পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এগিয়ে আসছেন৷ এটা আশার কথা৷

মানবাধিকারের গোড়ার কথা: ছোটবেলায় বামপন্থীদের সভা-সমাবেশে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের শিল্পীদের কণ্ঠে একটা গান প্রায়ই শোনা যেত৷ গানটির প্রথম লাইন ছিল, ‘অধিকার কে কাকে দেয়৷ অধিকার কেড়ে নিতে হয়৷’ বড় হয়ে এই লাইনের তাত্পর্য বুঝলাম৷ সত্যিই লাইনটি অর্থবহ৷ অধিকার কেউ কাউকে এমনিতে দেয় না৷ সেই অধিকার কষ্ট করে, অনেক সংগ্রাম-লড়াই করে অর্জন করতে হয়৷

১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের সময় ঘোষিত হয়েছিল সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার কথা৷ সেই ঘোষণাকেই আধুনিক সময়ের প্রথম অধিকারপত্র (চার্টার অফ রাইটস) বলে ধরে নেওয়া হয়৷ তার পর বিশ্ব রাজনীতিতে নানা পট পরিবর্তন হয়েছে৷ সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার সংজ্ঞার ক্রম পরিবর্তন ঘটেছে৷ সেই প্রেক্ষিতেই মানবাধিকারের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সংঘাতের কথা উঠে এসেছে বারেবারে৷

সেই সংঘাত কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়৷ ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (ইউনিভার্সাল ডিক্লেয়ারেশন অফ হিউম্যান রাইটস, সংক্ষেপে ইউডিএইচআর)৷ ওই ঘোষণাপত্রের মূল অঙ্গীকার ছিল ভয় ও দারিদ্রমুক্ত পৃথিবী গড়া৷ দু’একটি বাদে সব দেশই ওই ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছিল৷ পরবর্তীকালে রাষ্ট্রসঙ্ঘে মানবাধিকার সংক্রান্ত আরও কয়েকটি সনদ গৃহীত হয়৷

নাগরিকদের উপর রাষ্ট্রের নানা রকম নিপীড়নও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল৷ সব সময় রাষ্ট্রের উপর সব কিছু চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না৷ তবু এই ধরনের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির সনদ বা ঘোষণাপত্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ অনেক সময় তারা প্রেসার গ্রুপের ভূমিকা নিয়ে থাকে৷ কোনও রাষ্ট্র যদি দিনের পর দিন দেশের নাগরিকদের উপর দমনপীড়ন চালায়, তাহলে নাগরিক সমাজ বা আন্তর্জাতিক মহল হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না৷ আবার কোনও দেশে ভয়ঙ্কর জাতি বা বর্ণবিদ্বেষের পরিস্থিতি তৈরি হলে, গণহত্যা হলে, উন্নয়নের নামে সাধারণ মানুষকে জীবন-জীবিকা থেকে উচ্ছেদ করলে সেটাও মানবাধিকার লঙ্ঘন৷ একই ভাবে গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় যদি শাসক গোষ্ঠী বিরোধীদের যথাযোগ্য মর্যাদা না দেয়, তাদের কণ্ঠস্বরকে দাবিয়ে রাখে, সেটাও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে৷ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাধা দেওয়া, স্বাধীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে না দেওয়া ইত্যাদিতেও মানবাধিকারকে অমান্য করা হয়৷

এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের দেশের কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যেতে পারে৷ ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব চেয়ে বড় নজির হল ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা৷ ওই সময় ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকারের উপর মানুষের আস্থা একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল৷ বিরোধীরা নানা ইস্যুতে তাঁকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছেন৷ নিজের দলের মধ্যেও তখন তুমুল বিদ্রোহ৷ ঘরে বাইরে তাঁর অবস্থা নাজেহাল হয়ে গিয়েছিল৷ তাই পশ্চিমবঙ্গের তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের পরামর্শে ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করলেন৷ সারা দেশে অবশ্য তার আগেই একটা অঘোষিত জরুরি অবস্থার মতো আবহ তৈরিই ছিল৷ ইন্দিরা সেটাকেই আনুষ্ঠানিক রূপ দিলেন৷ বেছে বেছে বিরোধী নেতাদের জেলে পুরে দেওয়া হল৷ সরকারি কর্মচারীদের উপর নেমে এল অত্যাচার৷ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হল৷ কেড়ে নেওয়া হল মত প্রকাশের স্বাধীনতা৷ চালু হল প্রেস সেন্সরশিপ৷ রাজ্যে রাজ্যে কংগ্রেসের নেতা-মন্ত্রীদের দায়িত্ব ছিল, কোন খবর যাবে, কোন খবর যাবে না, তা ঠিক করা৷ এই রাজ্যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরত্চন্দ্রর বিভিন্ন লেখা থেকে তোলা অংশ পর্যন্ত ছাপতে দেওয়া হয়নি পশ্চিমবঙ্গের সংবাদপত্রগুলিকে৷ মণীষিদের ‘কোট’ পর্যন্ত মন্ত্রীদের দেখিয়ে নিতে হত৷ সাংবাদিকদেরও নানা ভাবে হেনস্থা করা হয়৷ এই রাজ্যের প্রথিতযশা সাংবাদিক বরুণ সেনগুন্ত, গৌরকিশোর ঘোষকে পর্যন্ত জেলে বন্দি করা হয়৷ বহু মানুষকে বিনা বিচারে জেল খাটতে হয়৷ বলা যেতে পারে, সব দিক দিয়েই তখন মানবাধিকারকে পদে পদে লঙ্ঘিত করা হয়৷ তারও আগে ১৯৬৯ সাল থেকে এই রাজ্যের রাজনীতিতে একটা টালমাটাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়৷ তখন নকশাল আন্দোলন রাজ্যে দানা বাঁধতে থাকে৷ অনেক ভালো মেধাবী ছাত্র নকশাল আন্দোলেন জড়িয়ে পড়েন৷ শুরু হয় ব্যক্তি হত্যা, পুলিশ খুনের রাজনীতি৷ দুই বারের অকংগ্রেসি সরকার ভেঙে যায়৷ নকশালরা সিপিএম-সহ বামপন্থীদের এবং কংগ্রেসিদের উপর আক্রমণ করতে শুরু করে৷ কংগ্রেসও বেপরোয়া হয়ে নকশাল দমনে নেমে পড়ে রাষ্ট্রশক্তিকে কাজে লাগিয়ে৷ রাজ্যের পাড়ায় পাড়ায় শুরু হয় নকশাল নিধনের নামে সাধারণ মানুষের উপর দমন পীড়ন৷ তখনও বহু যুবককে বছরের পর বছর বিনা বিচারে জেলে আটকে রাখা হয়েছিল৷ জেলে কিংবা পুলিশ লকআপে যে কত যুবককে মেরে ফেলা হয়েছে, তার কোনও হিসেব নেই৷ বরাহনগর, কাশীপুরের গণহত্যা তো আজও চর্চার বিষয়৷ পুলিশ ভ্যান থেকে যুবকদের নামিয়ে মাঠে ছেড়ে দিয়ে বলত, যা পালা৷ যেই তারা দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তখনই পিছন থেকে পুলিশ তাদের গুলি করে মেরেছে৷ এরকম অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে৷ কখনও বাড়ি থেকে ডেকে এনে শিক্ষিত যুবকদের পুলিশ কিংবা সিআরপি রাস্তায় খুন করেছে৷ বলা যেতে পারে, সেই সময় কংগ্রেস মানবাধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে৷ তখন বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অত্যাচারিতদের পাশে দাঁড়িয়েছিল৷ ১৯৭৭ সালে অবশ্য শ্রীমতী গান্ধী তাঁর কৃতকর্মের জন্য শাস্তিও পেয়েছিলেন৷ সেবছর লোকসভা ভোটে কংগ্রেস হেরে যায়৷ তার পিছনে একটা বড় ভূমিকা ছিল সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের৷ তিনিই ইন্দিরাকে শায়েস্তা করার জন্য সব রাজনৈতিক দলকে ঝান্ডা ছাড়া পথে নামার ডাক দিয়েছিলেন৷ সেই ডাকে সকলে সামিলও হয়েছিলেন৷

১৯৭৭ সালে এই রাজ্যেও পালাবদল ঘটল৷ নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় এল সিপিআই (এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট৷ প্রথম কয়েক বছর বামেদের সরকার ভালোমতো চললেও ধীরে ধীরে তাদের মধ্যেও ক্ষমতা মদমত্তা দেখা দিতে লাগল৷ বিধানসভায় বা অন্যত্র বামেরা বিরোধীদের মানুষ বলেই গণ্য করতে চাইত না৷ শুধু বিরোধীদেরই নয়, বামফ্রন্ট শরিকদেরও পাত্তা দিত না বড় শরিক সিপিআই (এম)৷ কলেজে কলেজে ছাত্র সংসদের নির্বাচনে সিপিআই (এম)-এর ছাত্র সংগঠন এসএফআই ছাড়া আর কেউ মনোনয়ন পর্যন্ত জমা দিতে পারত না৷ বলা ভালো, আর কাউকে মনোনয়ন জমা দিতে দেওয়া হত না৷ এক কথায় বাম নেতা-মন্ত্রীরাও মানবাধিকার লঙ্ঘনের খেলায় মেতে উঠলেন৷ তারই চরম প্রকাশ দেখা গেল ২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটে জেতার পর৷ টাটাদের কারখানা করে দেওয়ার নামে সিঙ্গুরের চাষিদের কাছ থেকে জোর করে জমি কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বাম সরকারের বিরুদ্ধে৷ আজকের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন ছিলেন বিরোধী নেত্রী৷ তিনি প্রতিবাদ করলেন৷ একই ভাবে নন্দীগ্রামেও জোর করে জমি কাড়ার চেষ্টা চলে৷ তার প্রতিবাদ করতে গেলে বাম সরকারের পুলিশ সাধারণ মানুষের উপর গুলি চালায়৷ তাতে মারা যান অন্তত ১৩ জন৷ বলা চলে, সেটাই বাম সরকারের কফিনে শেষ পেরেক৷ অবশেষে ২০১১ সালে পট পরিবর্তন৷ ক্ষমতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷

আজকে মমতার তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধেও সেই অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে৷ কলেজে কলেজে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ ছাড়া আর কোনও সংগঠনের অস্তিত্বই নেই৷ ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে, এটাই মানসিকতা৷ আজ তৃণমূল জমানাতেও মত প্রকাশের স্বাধীনতা চরম সঙ্কটের মুখে৷ সাংবাদিকরা মুখ্যমন্ত্রীকে কোনও অপ্রিয় প্রশ্ন করতে পারবেন না৷ করলেই তাঁকে প্রতিক্রিয়াশীল তকমা লাগিয়ে দেওয়া হবে৷ কিংবা বলা হবে, বামেদের দালাল৷ আগের কংগ্রেস ও বাম সরকারের মতোই তৃণমূল সরকারও মানবাধিকারকে ন্যূনতম গুরুত্ব দিতে নারাজ৷ তৃণমূলের অন্দরেও স্বাধীনতার নামগন্ধ নেই৷ বুদ্ধবাবুর জুতোয় পা গলিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিধানসভার ভিতরে এবং বাইরে বিরোধীদের মুখ বন্ধ করে রাখতে তত্পর৷ বিরোধীদের গণতান্ত্রিক অধিকারটুকুও তারা মানতে নারাজ৷ একই অভিযোগ কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধেও উঠেছে৷

আসল কথা হল, যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ৷ সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে৷ বর্তমানে শুধু আমাদের রাজ্যেই নয়, গোটা দেশেই মানবাধিকার প্রশ্নের মুখে৷ এই অবস্থায় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে৷ তাদের সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে৷ গড়ে তুলতে হবে মানবাধিকার রক্ষার আন্দোলন৷ তাতে সাধারণ নাগরিকদেরও সামিল করতে হবে৷ অধিকার রক্ষার কাজটাও গুরুত্বের সঙ্গে করতে হবে৷ নাগরিকের উদাসীনতা অধিকার হরণের আশঙ্কাকেই বাড়িয়ে দেয়৷ স্মরণ রাখতে হবে, ইটারন্যাল ভিজিল্যান্স ইজ দ্য প্রাইস অফ লিবার্টি৷ স্বাধীনতা, সাম্য, ন্যায়বিচারের রক্ষাকবচ নাগরিকের হাতেই৷ তার জন্য দরকার নাগরিক সচেতনতা৷ মানবাধিকার আন্দোলন সেই সচেতনতার কাজটাই করে৷ বহু সময়ে দেখা গিয়েছে, মানবাধিকার আন্দোলনের কাছে রাষ্ট্রশক্তি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে৷

বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে সেই সচেতনা গড়ে উঠুক, এটাই কাম্য৷

Facebook Comments
শেয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *