মানবাধিকার ও ভারতীয় মুসলিম : দেবব্রত শ্যাম রায়

মানবাধিকার ও ভারতীয় মুসলিম : দেবব্রত শ্যাম রায়

 

 

পেশায় লোহালক্কড়ের কারবারি, নেশায় পাঠক। পাঠকেরও তো মাঝে মাঝে পাশ ফিরে শুতে ইচ্ছে করে, তাই লেখেন। আসলে ঘুমোতে খুব ভালোবাসেন বলে এ জীবনে লেখক হওয়া হল না। ঘুম ভাঙলে বিজ্ঞানমনস্ক সুষম সমাজের স্বপ্ন দেখেন। সিগারেট ছেড়ে দেবার চেষ্টা করছেন।

 

 

 

দায়িত্ব নিয়ে বলে ফেলা যাক, সংখ্যালঘু পীড়নে ভারত ইদানিং নিজের কুখ্যাত প্রতিবেশীদ্বয়, পাকিস্থান ও বাংলাদেশের সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছে। এবার শুধু তাদের পেছনে ফেলে দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাবার অপেক্ষা!

 

একটা সমাজ কতটা সভ্য, মুক্ত, ও ন্যায়শীল তার কতকগুলি অপরিহার্য নির্ণায়ক আছে; যেমন সেই সমাজ তার নারীদের সঙ্গে কীরকম ব্যবহার করে, অথবা সেই সমাজে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানবাধিকার কতখানি রক্ষিত হয়!

 

সংখ্যালঘুর মানবাধিকার? আমাদের দেশের প্রধান সংখ্যালঘুরা মুসলিম। প্রায় শেষ হয়ে আসা দু’হাজার সতেরো সালের দিকেই একবার চোখ ফেরানো যাক।

 

সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ উঠলে এই মুহূর্তে যার নাম প্রথমেই মনে পড়ছে, তিনি আফরাজুল খান। মালদা জেলার কালিয়াচকের বাসিন্দা পঞ্চাশ বছর বয়সি এক পরিযায়ী শ্রমিক। আফরাজুল বিগত বিশ বছর ধরে রাজস্থানে রাস্তা ও ইমারত নির্মাণকাজের শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছিলেন, উপার্জন করা টাকা নিয়মিত বাড়িতে পাঠাতেন। জনৈক শম্ভুলাল রেগারের চাপাতির কোপে ও পেট্রোলের আগুনে জীবন্ত পুড়ে মরার কয়েক ঘণ্টা আগেও ফোনে নিজের স্ত্রীকে জমানো পঞ্চাশ হাজার টাকা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আফরাজুলের ‘অপরাধ’ – হিন্দুত্ববাদের পরিভাষা অনুযায়ী তিনি একজন ‘লাভ জিহাদি’ অর্থাৎ এলাকার কোনও এক হিন্দু মেয়ের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। যদিও এই অভিযোগ প্রমাণিত নয়, এবং আফরাজুলের ভাই ও জামাতা যারা রাজস্থানে একইসাথে কাজ করেন, তারা এই তথ্যের সত্যতা অস্বীকার করেছেন।

 

না, রাজস্থান সীমান্তের বাইরে এখনই পা বাড়ানোর দরকার নেই। এ বছরের এপ্রিল মাসে আলোয়ারের পেহলু খান ও তার পাঁচ সঙ্গী ‘গরু পাচার’ করার অপরাধে গো-রক্ষকদের হাতে প্রহৃত হন, যদিও ব্যবসার প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র তাদের সঙ্গেই ছিল। উদ্বেগজনক অবস্থায় জেলা হাসপাতালে ভর্তি করার পর পেহলুর মৃত্যু হয়। পেহলুর মৃত্যুর পর দেশজোড়া নানা সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীদের প্রবল আন্দোলন স্বত্তেও এই প্রসঙ্গে নীরবতা ভাঙতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজের সময় লেগেছিল তিন মাস। মত্যুর আগে পেহলু যে পাঁচজনের নাম বলে গিয়েছিলেন, গত সেপ্টেম্বরে রাজস্থান পুলিশ তাদের সবাইকেই ক্লিন চিট দিয়েছে।

 

জুনে মাসের এক সকালে, উদয়পুরের বাগওয়াসা বস্তির মেয়েদের খোলা জায়গায় মলত্যাগের (তিনহাজারেরও বেশি পরিবারের বাসস্থান এই বস্তিতে সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য টয়লেটের সংখ্যা মাত্র একটি, স্বচ্ছ ভারত অভিযান প্রকল্প শুরু হবার তিন বছর পরেও) ছবি তোলার প্রতিবাদ করতে গিয়ে চারজন সরকারি কর্মীর হাতে মার খেয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান সিপি আই (এম এল)-এর সদস্য, বর্ষীয়ান জাফর হুসেইন। অভিযুক্তরা হাতাহাতির ঘটনা অস্বীকার করে। হাসপাতালে যেহেতু মৃত্যুর কারণ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছিল কার্ডিও-রেস্পিরেটরি ফেলিওর অর্থাৎ যা স্বাভাবিকভাবেও হতে পারে, অভিযুক্তদের কাউকেই গ্রেফতার করা হয়নি।

 

নভেম্বর মাসে আবার মুসলিম নিধনের ঘটনা ঘটেছে রাজস্থানে। এবারও গোরু পাচারের অজুহাত। মৃতের নাম ওমর মহম্মদ। বসুন্ধরা রাজে ইনিয়েবিনিয়ে অশ্বত্থামা হত, ইতি গজঃ বলে দায়িত্ব সারেন, ‘যদিও আইন নিজের হাতে নেওয়া গো-রক্ষকদের উচিত হয়নি, তবুও গরু পাচারকারীকে ধরে তারা ঠিক কাজই করেছে।’

 

বিজেপি-শাসিত রাজস্থানের বাইরে বেরোলেই আমাদের সমষ্টিগত স্মৃতিতে ভেসে উঠবে জুনেইদ- মহম্মদ আখলাখের নাম। হরিয়ানায়, মথুরা-গামী ট্রেনে, ধর্ম নিয়ে বচসার ভিত্তিতে ছুরি মেরে খুন করা হয়েছিল ষোল বছরের কিশোর জুনেইদকে। ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরছিল সে। বাড়ির ফ্রিজে গোমাংস রাখার অপরাধে জনগণ পিটিয়ে মেরে ফেলে উত্তরপ্রদেশের মহম্মদ আখলাখকে।

 

অন্য সব কিছু বাদ দিয়ে শুধুমাত্র গোরুর মাংস সংক্রান্ত ঘটনায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার উল্লঙ্ঘন যদি বিচার করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে গত আট বছরে (২০১০-২০১৭) ঘটেছে এই ধরণের নথিবদ্ধ ঘটনা গোটা দেশে ৬০ টি, যার ফলে মৃত ২৫ জনের মধ্যে ৮৪% শতাংশ আক্রান্তই মুসলিম ধর্মাবলম্বী। যা উল্লেখযোগ্য ও ভয়াবহ তা হল, মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া হিংসাত্মক ঘটনার ৯৭%-ই ঘটেছে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদিজির হাত ধরে ভারতীয় জনতা পার্টি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর। উপরোক্ত ৬০ টি মুসলিম-বিরোধী হিংসাত্মক ঘটনার মধ্যে ৩০ টিই ঘটেছে দেশের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে। গোটা ২০১৬ সালে যতগুলি সংখ্যালঘু-বিরোধী হিংসার ঘটনা ঘটেছিল, তার দুই-তৃতীয়াংশ ২০১৭ সালের ছয় মাসের মধ্যে ঘটে গেছে। অর্থাৎ সংখ্যাটা ক্রমশ বাড়ছে।

 

পাকিস্তানে বা বাংলাদেশে ধর্মীয়  সংখ্যালঘুরা দীর্ঘদিন ধরেই যেভাবে থাকেন, ভারত সেই পরিস্থিতিতে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে। ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যেও ভয় বাড়ছে। হিন্দু মৌলবাদের আক্রমণ পুষ্ট করছে মুসলিম মৌলবাদকে। আফরাজুল হত্যার মতো হিংসাত্মক ঘটনা ব্যথিত সাধারণ মুসলিম নাগরিককে র‍্যাডিকালাইজ করার সুযোগ এনে দিচ্ছে। নিরাপত্তার অভাবে এক সাধারণ নামাজী মুসলিম এবার আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরবেন তার ধর্মপরিচয়, তাকে আরেকটু বেশি বেশি দেখা যাবে মসজিদে, ওয়াহাবি জলসায়, সামাজিক যাপনে বাড়বে পারস্পরিক ঘৃণা, ভয়। উপযুক্ত পরিস্থিতি ও প্ররোচনায় অসহিষ্ণুতার ঘটনা ঘটবে, যেটাকে ফের ফিডব্যাক হিসেবে নিয়ে মুসলিম-বিরোধী হিংসাত্মক ঘটনার অনুমোদন হিসেবে দেখাবার চেষ্টা করবে হিন্দুত্ববাদীরা। ফলস্বরূপ পালটা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠবে হিন্দুমন। বৃত্ত সম্পূর্ণ হবে। হিংসার চাকাটা ঘুরতেই থাকবে। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্রমবর্ধমান ঘটনায় ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রসঙ্ঘে ভৎসিত হয়েছে ভারত, কিন্তু অবস্থার উন্নতির কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

 

কিন্তু দেশে এই ধরণের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটা আসলে কি কোনও রোগ? নাকি রোগের উপসর্গমাত্র? কর্নী সেনা, বজরঙ দল, আর এস এসের মতো শাসক-অনুমোদিত দক্ষিণপন্থী মিলিশিয়ার দাপট তখনই বেড়ে যায়, যখন রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যর্থ হতে শুরু করে। ধর্ম-সংক্রান্ত সমস্যা দেশের মূল ইস্যু নয়, লাভ জিহাদও নয়, গোমাংসভক্ষণ তো নয়ই, দেশের মূল সমস্যা গণতন্ত্রের নামে শোষক আর শোষিতের মধ্যেকার দূরত্ব, যা প্রতিনিয়ত ক্রমবর্ধমান। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের তকমাটা খসে যাচ্ছে। সাংবিধানিক সংস্থাগুলি নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ক্ষুধা সূচকে আমাদের দেশ একশো ছুঁয়েছে। এশিয়ার মধ্যে সবেচেয়ে বেশি বেকারত্ব ভারতে।ভীষণভাবে আক্রান্ত হচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিশেষ করে তা যদি শাসকের বিরুদ্ধে হয়।

 

তাই সংখ্যালঘুর মানবাধিকার- এই শব্দটায় এসে আমাদের জোর হোঁচট খেতে হচ্ছে। একটি চূড়ান্ত অসম সমাজে যেখানে একটি বা দু’টি শ্রেণি সমাজের অন্য শ্রেণিগুলিকে শোষণ করে বেঁচে থাকে, যেখানে রাষ্ট্র বকলমে শাসক শ্রেণির স্বার্থরক্ষার কেয়ারটেকার, সেখানে এই শোষক ও শোষিত শ্রেণির ‘মানবাধিকার’ একইসঙ্গে রক্ষা করা কীভাবে সম্ভব? বাঘ ও ছাগলকে সত্যিই কোনওদিন একই ঘাটে জল খাওয়ানো যায় কি?

 

প্রশ্নটা সহজ। উত্তরও সবার কমবেশি জানা। দেশের আইনবেত্তারাও তা জানেন, কিন্তু মানেন না, বা মানলেও মুখে বলেন না। কারণ এই সত্য চাউর হলে গণতন্ত্র নামক স্থিতাবস্থাটি নষ্ট হয়ে যাবে, সুবিধেজনক জায়গায় থাকা মানুষেরা আর যাই হোক নিজের পায়ে কুড়ুল মারবেন না। তাই যতদিন না সেই স্থিতাবস্থা ভাঙা যাচ্ছে, সত্যিকারের সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, সম্প্রদায়গতভাবে সংখ্যালঘু ও শ্রেণিগতভাবে সংখ্যাগুরু মানুষের মানবাধিকার একদিনের জন্যও সুনিশ্চিত নয়।

 

ততদিন আফরাজুল-জুনেইদ বা কালবুর্গী-গৌরী লঙ্কেশসহ সম্প্রদায়নির্বিশেষে সমস্ত সাধারণ মানুষের মানবাধিকার রক্ষার লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে আমাদের। একদম রাস্তায় নেমে। রাস্তাটা বড্ড লম্বা, রাস্তাটা খুব কঠিন, তবু এই লড়াইয়ে রাস্তাই একমাত্র রাস্তা।

 

Facebook Comments
শেয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *