গদ্য কবিতা : পাঙ্খাবাড়ি

 

পাঙ্খাবাড়ি : সায়ন্তন গোস্বামী

ঠিক-ঠিক টাইম ধরে পাঙ্খাবাড়িতে ভালোবাসাবাসি হলে আজ আমরাও ফুলবাজারে মার্ডারের সাক্ষী হতাম। স্বপ্নে ঝলসে উঠত দু-একটা মুখ। ফাঁকা ঘরে তাড়া করত কেউ। দেখি তোমার হাত, এত ঠাণ্ডা কেন আঙুলগুলো? তোমার ব্লাউজের ধানে ক’রকম চালের ফসল ওঠে, জানব, তার আগে একটা, শুধু একটা ছবি তুলি রোদে জলজ ওই থুতনির ।

দূরে যে জঙ্গল, জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে, কী গাছ ওগুলো আমি তো জানিনা । পর্দা আরো ভালো করে সরিয়ে পরে আবার টেনে দেব, মান্ধাতার মোবাইলে কেঠো মেসেজ এলো একটা জিনিস মিস্‌ করিসনা, শুরু হয়ে গেছে যা দ্যাখ, মার্কেটের দিকে চলে যা । এই ঘরে দেওয়াল ঘড়ি নেই কেন ? কটাই বা ছুটির দিন, অথচ আমাদের যন্ত্রসুলভ জানতে হবে মাছের বড়সড় কাঁটায় কিরকম প্রাণ লেগে থাকে তুলোর, ঝরে পড়ে টুপটাপ ।

কাল সারা দুপুর কমলালেবুতে মাখামাখি হয়ে ফিরে এসে দেখলাম স্নানের জল ফের গরম করার প্রয়োজন আছে । আমার বুকে কি এখনো কমলার ঘ্রাণ, ঠোঁটে পাতার স্নায়ুগুলো ? কাছে এসে কোনো শব্দ উচ্চারণ না করে বলো । দরজায় দুটো টোকা পড়ে । আস্তে । সাবজী, দেখে যান কিরকম বেঁধেছে জীপের পেছনে । অফ সিজনে দেখে যান এসব । আসছি, নিচু স্বরে বলেও দেখি প্রাচীরের মতন তোমার মুখ আমারই দিকে চেয়ে আছে আরও বেশি, আরও ঘন ।

পাহাড়ে মানুষের স্পর্শ সমতলের থেকে ভিন্ন হয় । আমি জেনেছি । তুমিও । এখন এই ঘরটা কেবলমাত্র ঘর নয়, মেঘ হয়ে গেছে । ক্ষুদ্র জীবনযাপন হয়েছে কতক অরুণাচল । ছোট-ছোট হাসির পকেটে শীত, কুয়াশা ছড়িয়ে দিয়ে জড়াজড়ি ডুবে থাকার সুর । চোখদুটোয় ঘুম থাকবেনা অনেকক্ষণ, দেখে নিয়ো । দরজায় ফের একটা টোকা; তলা দিয়ে হলুদ রঙের খাম ঢুকিয়ে একটা ছায়া সরে যায় । স্টেপ অ্যাগ্রিকালচার বোঝো ? কোনো দুখী মেয়ে আর্জি পাঠিয়েছে কিছু লিখে (হয়ত) ।

আমরা এক অপরের কাছে এতই সরে এসেছি যে হাওয়া আর বাঁক নেয়না । গরীবগুর্বো এক মেয়ের লেখায় আমরা নতুন কী খুঁজে পাব ? নাহ্‌ , এ অন্য কেউ । পুরুষ ? কীহে, স্বপ্নে দেখা বিট অফিসার নয়তো ? টানা হাতের লেখায় দুটিমাত্র লাইন । এক, লোকটির হাতের চামড়া স্কুপ করে ছাড়ানো হয়ে গেছে । দুই, পাদুটো বড় স্টিলের গামলায় ফোটানো হচ্ছে, জল বিসলেরির ।

ক’ধরণের নাম হতে পারে ঠোঁটে ঠোঁট লেগে থাকার ? নামের কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে ? ফুল আর পাখির নাম ছাড়া অন্যকিছু ভাবতে পেরেছিলাম, ভাসা-ভাসা যা মনে পড়ছে । গতানুগতিক শব্দগুলো ছেড়ে দিলে ভালোবাসা স্পেস ট্র্যাভেল করতে সক্ষম । যেমন ক্রিস্টাল, দেড়মিনিটব্যাপী চুম্বন; আইফেল, অবশ্যই ফরাসী চুমু; অমনিবাস যেন কিরকম ছিল ?

এক-একটা ভাবনার ব্যারিকেড ভাঙে, আর তোমার ভেতরের সরলতাগুলো আমার হয়ে যায় । সুখ, সুখ, সুখ, আমরা শুধু চেয়েছি অন্য মানুষের হিংসে ব্যক্তিগত পিকনিকে । আমি চেয়েছি তোমার মুখের চুল যেন না সরাও তুমি, ওরই মধ্যে দিয়ে তোমার তাকিয়ে থাকা যেন আরও সুন্দর । দুড়দাড় আওয়াজ শুনি বাইরে, চেঁচিয়ে বলে, এবারে দু’জন, ফটো তুলুন, ও বাবু, সাবজী, লোকটাকে মাঝখান থেকে চিরে দুটো ভাগ করে ল্যাম্প পোস্ট টাঙানো হয়েছে । ড্রাম আর বাঁশী বাজছে কত, কী এত ঘুম আপনার ? আসুন, দেখে যান, কত অদ্ভুত সবকিছু ।

আজ কি পাহাড় ঝুঁকে পড়েছে আতসকাঁচ নিয়ে ? এত নিবিড় তো আগে কখনো হইনি। এত জলভার বাতাসের মতন, এত ফুলেল ছায়ার জালি, শব্দের কোরকে চুপ থাকা, চোখের কারিগরিতে এত স্পর্শ, হইনি। প্রত্যেকটা, আমি তোমায় বলছি শোনো, প্রত্যেকটা, প্রত্যেকটা দিন আদপে পাথর ভাঙার কাজ, রক্ত ধোয়ার কাজ, যাতে আমাদের হাঁটাপথ আরও চওড়া হয়। দরজায় মৃদু টোকা পড়ে ফের। নগদ চারশো টাকায় সিডি। দুপুরে কী খাবেন বলুন।

Facebook Comments
শেয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *