জীবন বাজি (শতাব্দী দাশ)

ক্যাপ বন্দুকটা পাওয়া গেছে হপ্তাখানেক আগেই। আর কোনো  বাজি এলোনা এখনও। এদিকে, কালিপুজো তো কালই। বাবা বলেছে, যত সময় যাবে, দাম পড়বে। দিনের দিন সকালে বা দুপুরে কিনতে পারলে আরও ভালো। বাকি যা কিছু মাল, সস্তায় দিয়ে দিতে পারে।

বিট্টুদের বাড়িতে এদিকে আজ রাতেই তুবড়ি ছুটছে। সাঁই সাঁই রকেট। দুমদাম চকলেট বোম। ছেলেটা ভীষণ উচাটন । থাকবে তো দোকানে বাজি? কাল পর্যন্ত? শেষ হয়ে যাবে না সব? পাড়ার মোড়ে বাবার সাইকেল দেখা যায়। বাবা বাড়ি ফিরছে। হাতলে ঝোলানো টিফিন ক্যারিয়ার।  চোয়াল শক্ত করে ছেলেটা ট্রিগারে চাপ দেয়।  বারুদে ধাতব আঘাত লাগতেই একটা অনুচ্চ ফট্! এবং  আরেকটা। তারপর আরেকটা। তারপর, কী ভেবে সে থেমে যায়। কালকের জন্য ক্যাপ বাঁচিয়ে রাখে । শেষ হয়ে গেলে  আর যদি না পাওয়া যায়? বারুদ বাঁচিয়ে রাখে ছেলে। আগুন জিইয়ে রাখে ।  দ্রুমদ্রুম শব্দের মধ্যে সে ঘুমিয়ে পড়ে।  হে আগুন,  তুবড়ি-হাউই হয়ে তার স্বপ্নে আলো দিয়ে যেও  । চোয়াল শিথিল হোক ঘুম-ঘোরে। তারপর কাল আবার বারুদের দিন।

***********

গড়িয়াহাটের মোড়ে ব্রিজের তলায় বাইক পার্ক করে ছেলেদুটো। এখানে বাজির মরসুমি পসরা। চরকি, হাউই, তুবড়ি, রঙমশাল, ফুলঝুরি। প্রদীপ হরেক রকমের। পুলিশগাড়ি অলস ভাবে ঘুমায় । দোদমা, চকলেট বেরিয়ে আসে নিচের প্যাঁটরা থেকে। ছেলেদুটো দরদাম করে। একে একে প্যাকেট-বোঝাই হয় বাজিরা। এরপর অফ শপ থেকে কয়েক বোতল। খাবারটা ফোনে অর্ডার দিয়ে দিলেই হবে। বাইকে বসার মুহূর্তে জামায় টান। বছর ষোলোর মেয়ে। উদ্ভিন্নযৌবনা ।  ব্রা হীন বুক দেখা যায় সালোয়ারের তলায়। কোলে বছর চারেকের শিশু। ‘ভাই আমার। ভাইকে এক প্যাকেট বাজি কিনে দাও না!’ ছেলেদুটো চোখ আটকে গেছে বুকে,মেয়েটা জানে। ওরা বাজি কিনে দেয়। এক প্যাকেট ফুলঝুরি, একটা সোনালী লম্বা রঙমশাল, নীল মুখওয়ালা। প্যাকেট ধরিয়ে দেওয়ার অছিলায় বুকও ছুঁয়ে দেয়।  এরকম তো কতই হয়!মেয়েটি গা করেনা।  কালিপুজোর রাতে ব্রীজের তলায় অন্ধকার থাকবে না।  ফ্যাটফেটে আলোয় জেগে বসে থাকতে হবে। কিন্তু অন্ধকার থাকবে না মানে থাবাগুলোও থাকবে না। এক রাতের জন্য। হয়ত।  ক্ষণস্থায়ী আলোর কথা ভেবে আজকের থাবা মেনে নেয় মেয়েটি।

বাইক ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যাওয়ার সময় পিছনের আরোহী দ্যাখে- বাজি পাশের দোকানে ফেরত দিচ্ছে মেয়ে।  ‘এটা কিনে নাও। টাকাটা দাও। খাব। খিদে পেয়েছে।’

‘শালা মাগী!’, বলে হেলমেট চাপায় মাথায়, পিছনের সিটের আরোহী।

************

গড়িয়াহাট থেকে সিধে হেঁটে গেলে দোকান পাট, ফুটব্রিজ, সবজি বাজার, আবার দোকান পাট, পেচ্ছাপখানা… ফেলে বালিগঞ্জ স্টেশন পড়ে। সেখানে লাস্ট ক্যানিং লোকালটা ধরতেই হবে কৃষ্ণকে। স্টক ফুরিয়ে এসেছে। কাল আবার চম্পাহাটির  কারখানা থেকে মাল তুলতে হবে। কলকাতার বাজারে মাল বেশি দামে বিকোয়। একই মাল বাবুরা  গ্রামে গিয়ে কিনে আনলে ওরা কমে ছেড়ে দেয়। অথচ গতর খাটিয়ে বাজি তুলে শহরে বসতে পারলেই দ্বিগুণ লাভ । পুলিশকে ঘুষ দেওয়া আছে।  ইউনিয়নকে টাকা খাওয়ানো। কিন্তু লাভ থাকে। এই সময়টার মুখ চেয়েই  বসে থাকা। কাল বিকেলের মধ্যে বেচাকেনা শেষ। ছেলের জন্য দুপ্যাকেট তুলে রাখবে তার আগে।  হারামি পুলিশগাড়ি এসে বিক্রি না হওয়া মালপত্তর শেষবেলা নিয়ে যেতে পারে।  সেসব তখন বাপের সম্পত্তি। কাল কেন, আজই বাচ্চাটার বাজিপটকা আলাদা করে বাড়িতে রেখে যাবে সে। এইটুকুই তো পারে!

**************

বলরামপুর গ্রামে ভোর ছটায় উঠে পড়ল পিন্টু। পুকুরপাড় ধরে এগিয়ে প্রথমেই গণেশের বাড়ি। ‘যাবিনি?’ গণেশ নির্বাক অনুসরণ করে। আশেপাশের মেটে বাড়িগুলো থেকে বারো-তেরোরা বেরোতে থাকে। যেন প্রেতমিছিল চলেছে। ওদের হাতের চামড়া উঠে গেছে বারুদ ঠুসে ঠুসে খোলে। ওরা হাপরের মত শ্বাস নেয়। কাশে। সারাদিন একশ দেড়শ বাজির খোলে বারুদ ঠুসে দু থেকে পাঁচ টাকা পায়। তা দিয়ে কতকিছুই না হয়! এক মরসুমে আয় যার একশো ছাড়াল, সে তো বড়লোক! আজই শেষ দিন এই মরসুমে।  চামড়া ওঠা, বারুদ মাখা,  দু-পাঁচ টাকা হাতড়ানো হাত বেয়ে  আলোকবাজির সলতে পুড়তে পুড়তে নামে।

****************

তারপর বিস্ফোরণ হয় একদিন। গড়িয়াহাট ব্রিজের তলায়। বা চম্পাহাটিতে। বা বলরামপুরে। বা নুঙ্গিতে। বা এখানে -ওখানে- সেখানে- সবখানে।

কারণ কে যেন বলে গিয়েছিল : ‘কখন, কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটবে এবং কে তা ঘটাবে তা বুঝতে রাষ্ট্রযন্ত্রের এখনো বাকি আছে।’

——————

Facebook Comments
শেয়ার

4 Replies to “জীবন বাজি (শতাব্দী দাশ)”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *