অণু গল্প : রুমেলা দাস

 

## গতি

টেবিলের উপর রাখা একটা রুপালি মোড়ক।কুঁকড়ে যাওয়া অংশটায় বাকি,কিছুটা সমান অংশ।বছর সত্তরের সুধাংশুবাবু হাত বোলাচ্ছেন তাতেই।পাশে জলখাবার আলুর চোখা আর রুটির কিয়দংশ।ভালোলাগেনা এই একই খাবার গিলতে।মুখে যে স্বাদ একেবারেই নেই।

“ডোডোকে বলেছো আমার ওষুধ আনতে! কালকের দিনটা হবে শুধু। সন্ধ্যের পর থেকে বাঁ- দিকের বুকটা আজকাল চিনচিন করে।”

“বলেছিলাম।এ বছর জুবিলী-র ক্লাস থ্রি-র ভর্তির খরচ লাখের কাছাকাছি।এসির ইনস্ট্রোলমেন্ট আর গতমাসেই ল্যাব্রাডর কিনেছে।তাই……”

সুধাংশু মন্ডল আস্তে আস্তে উঠে গেলেন জানলার কাছে।সামনের লনটায় বাহারি গাছ,শহুরে পদবীর মাত্রা বাড়াচ্ছে।চোখ চলে গেল খোলা অংশে সবুজ ঘাসের উপর।

ডোডো স্নান করাচ্ছে সাত মাসের ল্যাব্রাডরকে।বছর ত্রিশ পিছনের একটা দিন।ছুটির দিন মা নয়,বাবার কাছেই ডোডো স্নান করতো।এমন করেই যত্ন করে ধুয়ে দিতেন ছোট্ট শরীরটা।আজ শুধু বদলে গেছে সময়টা।দাপুটে ছেলের জলের ঝাপটায় যে মুখ,শরীর ভিজে যেত।সহসা সেই চোখদুটোই চিক চিক করে উঠলো তাঁর।

 

 

************

 

## সমাবর্তন

ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের সমাবর্তন অনুষ্ঠান।দুপুর দুটো বাজতে এখনো মিনিট পনেরো।সবাই খুব ব্যস্ত।প্লেসমেন্টের খবরটা ওদের কাছে অনেক আগেই আসে।তাই বেশ প্রশান্তি ছাত্র-ছাত্রীদের মুখে।

“কিরে সায়নী,ঈশানী আসেনি এখনো ?”-প্রশ্ন শুনে ঘাড় ঘোরালো সায়নী।

*****

অনেক দেরি হয়ে গেল।আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি।এতটা রাস্তা যাবে কি করে ও।ওকে যে,যেতেই হবে।যে করে হোক।পায়ের গতি বাড়ালো ঈশানী।আরো,আরো জোরে…দুটো বাজতে পাঁচমিনিট…..চারমিনিট….. তিনমিনিট!

******

খবরটা এসেছে এইমাত্র।মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে সকলে।সায়নীর ভেজা গালে জমছে এক এক করে বিন্দুরা।ঈশানী আর নেই।ফাইনালে পার্সেন্টেজ কম।তাই প্লেসেমেন্টের খবরটা বাকি সবার সাথে নয়।ডিন স্যার জানেন আজই সকালে।কিন্তু ততোক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে।আর্থিক সংশয় আর না পারার যন্ত্রনায় ঈশানী বেছে নিয়েছিল ছাদের কোণ।ধরাছোঁয়ার বাইরে যেতে যেতেই শুনতে পেয়েছিল মা চিৎকার করছে- “ঈশানী,ডিন স্যার ফোন করেছেন, তোর প্লেসমেন্ট হয়ে গেছে।”

চোখ মুছে পায়ে পায়ে স্টেজের সামনে এসে দাঁড়ালো ও।

 

 

## ইতিহাস দিদিমণি

 

“এবারের পরীক্ষায় হায়েস্ট মার্কস পেয়েছে রিনি!”(জোর গলায় কথাগুলো বলে গোটা বিশ খাতার মধ্যে থেকে একটা খাতা বের করলেন ইতিহাস দিদিমণি সুতপা ব্যানার্জী)

ক্লাসরুম থমথমে।বেজায় রাগী দিদিমণি,তারউপর ক্লাস টেস্টের খাতা বেরোচ্ছে।

“কি হলো বসে আছো কেন!এদিকে এসো?”(রিনির দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলেন সুতপাদেবী)

“দিদি…..আ.. আ মি!”

“তুমি নয়তো কে?এতো সুন্দর উত্তর লিখেছো দেখাবে না সবাইকে?”

রিনি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল টিচার্স টেবিলের দিকে।মাথা নিচু করা কতগুলো হার মানা ভয়,তিরতির করে রিনির শিরদাঁড়া বেয়ে নামতে শুরু করলো।

“একফোঁটাও পড়াশুনা কোরোনা বাড়িতে!কি লিখেছো এসব?”

রিনির চোখদুটো ভারী হয়ে আসে।ঝাপসা চোখের আবছা দৃষ্টিতে দেখে লাল কালির একটা নম্বর ২/১০(অর্থাৎ ও ১০ এর মধ্যে পেয়েছে ২)

*************

(১০বছর পর)

“মা,তাড়াতাড়ি খেতে দাও!বড্ড লেট হয়ে গেল।”(কোয়েলি ব্যস্ত হয়ে চেয়ার টেনে বসে খাবার টেবিলে)

“আসছি রে বাবা আসছি।বয়স হচ্ছে তো নাকি!এত ব্যস্ততা কিসের তোর? সারাদিন তো মোবাইল হাতে বসে থাকিস।খেতে বসলেই যত তাড়া! তাও তো আজ রবিবার!”

“আরে,আজ আমাদের ম্যাডামের বার্থডে।ডিপার্টমেন্টের সবাই ঠিক করেছি,ওনাকে বাড়ি গিয়ে চমকে দেবো।”

“কি যে করিস?ম্যাডাম কি তোদের হাঁটুর বয়সী?”

“অফ মা,তুমি না এত ব্যাকডেটেড।ম্যাম আমাদের মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড।উনি সবসময় বলেন,বন্ধুত্বে শিক্ষা আর শিক্ষার আগ্রহ দ্বিগুণ হয়।তোমাকে যদি একদিন মিট করাতে পারি ওনার সাথে!….দাঁড়াও এক মিনিট(কোয়েলি ওর ফোন গ্যালারিতে সেভ করা একটা ছবি এগিয়ে দিলো ওর মায়ের দিকে)

ছোট্ট,ভীতু চোখের একটা গোলগাল মুখ।আদুরে পরম ভালোবাসায় মাখা।খুব চেনা লাগলো।মনের আবছা স্মৃতিতে ছেঁড়া কিছুদিনের টুকরো ঘটনা ভেসে উঠলো-ক্লাস সেভেন বি, সবুজ দল, রোল নাম্বারটা ঠিক মনে পড়ছে না..হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা কাছে টেনে এনে দেখলেন আরো ভালো করে।হ্যাঁ তাইতো!কৌতুহল আর উৎকণ্ঠা মাখা গলায় কোয়েলিকে জিজ্ঞেস করলেন-“তোদের ম্যাডামের নাম কি?”

“রিনি দাস,আমাদের হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে নতুন এসেছেন।জানো মা, উনি সবার সাথে খুব মিশে যেতে পারেন।কেউ কোনো প্রব্লেমে পড়লেই ওনার কাছে যায়।আর বারবার একটা কথাই বলেন-ওনার সমস্ত স্ট্রাগল-এর পিছনে নাকি স্কুলের কোন রাগী দিদিমণির ভূমিকা আছে।ওনার বকাগুলোই ম্যামকে জীবনে বড় হতে শিখিয়েছে।”

সুতপাদেবীর চোখ জুড়ে ফোঁটাদের মিছিল।স্নেহ আর প্রেমের এক অদ্ভুত বুদ্বুদ মন জুড়ে।মেয়েকে বললেন-

“আমায় একবার দেখা করাতে পারিস ওনার সাথে?”

 

 

## ব্র্যান্ডেড

 

‘ও মা কি সুন্দর কালার তোর জিন্সটার! কোন ব্র্যান্ডের রে?’ (কৌতূহলে ঝুঁকে পরে বলে রিদিমা)

‘ব্র্যান্ড? কি যে বলিস! আমার ব্র্যান্ড তো গড়িয়াহাটের ফুটপাথ।হে…..হে…!'(বিটকেল হাসি দিলো শ্রমণা)

‘এ…হে..! তুই ওখান থেকে? ওখানে তো রোদ্দির মেলা!’

‘তাই? হতে পারে!কি করবো বল,আমরা যে একেবারেই ব্র্যান্ডেড নই।তাছাড়া আমি যদি না বলতাম,তাহলে তো তুই এটাকে ব্র্যান্ডেড বলেই ভাবতিস! কি তাই তো?’ (ভুরু নাচালো শ্রমণা)

‘কিন্তু কি জানিস,খুব বেশিদিন হয়তো লাস্টিং….

‘বাদ দে তো।সবজিনিস অতো ব্র্যান্ড দেখতে গেলে চলে না।বরং তুই তোর বরটাকে ব্র্যান্ড দেখে চয়েস করিস।’

এলোমেলো হাসিতে ফাস্ট ইয়ারের  গোটাকতক যুবতীর আলাপচারিতা।শ্রমণা,রিক্তা,মৌসুমী আর রিদিমা।রিদিমা একটু ব্র্যান্ডঘেঁষা।মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত নামকরা ব্র্যান্ডে মাখামাখি হতেই বড্ড ভালোবাসে।বাবা সরকারি অফিসার,তাই একমাত্র মেয়ে হওয়ায় এসবে খুল্লাম খুল্লা আজাদী মিলেছে।নাক সিটকোনো মেন্টালিটি থাকায় আপাততঃ ব্র্যান্ডেড প্রেমিকের সন্ধান চলছে।

*************

(পাঁচ বছর পর)

‘কি গো, শার্টগুলো তো আয়রন করতে দিতে পারো তো! কি পড়বে আজ?’

‘ওই সি-গ্রীন কালারের চেক টি-শার্টটা একটু প্রেস করে দাও না লক্ষীটি!'(রৌনক বাথরুম থেকে মুখ বাড়িয়ে বললো)

‘সে তো বুঝলাম।কিন্তু ওয়ার্ডড্রপটার এমন অবস্থা করে রেখেছো।হুড়োর গাদা।ইশশ.. এই তো পেয়েছি।দাঁড়াও করে দিচ্ছি এক মিনিট!’

সি-গ্রীন কালারের শার্টটা হাঙ্গার থেকে পেরে বিছানায় রাখতেই হটাৎ রিদিমার চোখ চলে গেল একটা গাঢ় রঙের দিকে।এটা কি? শার্টের ডানদিকের কাঁধের কাছে একটা লালচে রং।ভালো করে চোখের সামনে আনতেই রিদিমা-র গোটা পৃথিবীটা দুলে উঠলো।বিশ্বাসের বুনিয়াদগুলো টুকরো টুকরো হয়ে ছেঁড়া মেঘের মতো ভেসে বেড়াতে থাকলো গোটা ঘরটায়।নারী চুম্বনের স্পষ্ট দাবি,দাগ কেটে রেখেছে ওয়ান ক্লাস বিজনেসম্যান রৌনক চ্যাটার্জী-র কাঁধে।হয়তো কোনো ব্র্যান্ডেড লিপস্টিক…..

 

 

 

 

সামাজিক কর্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *