গল্প : হয়ত মাঝখানে আরো কিছু থাকে

 

হয়ত মাঝখানে আরো কিছু থাকে : সর্বজিৎ সরকার

এরকম  একটা গল্প লেখনা কেন যা বাইরে থেকে শুরু হয়ে বাইরেই থেকে যায়।

দ্বিতীয় ‘থেকে’তে কিছু বেশি ঝোঁক দিচ্ছো?

মানে?

মানে, দুটো থেকে’র তো আলাদা মানে হয়, তাই বলছি।

কিরকম?

যেমন, প্রথম ‘থেকে’টা ছেড়ে যাওয়া বোঝায়, আর পরেরটা রয়ে যাওয়া।

শুধু শুধু হেঁয়ালি করছো। আমি বলতে চাইছি তুমি সবসময় এমন সব লেখা লেখ যা হয়ত শুরু হল বাইরে থেকে কিন্তু তারপর ক্রমশ গল্প যত এগোতে থাকে তত তুমি ভেতরদিকে ঢুকতে থাকো। সিচুয়েশন, প্লট, ঘটনা, এসবের তোয়াক্কা না করে ঘেঁটে দাও সবকিছু। চরিত্ররা আসে, তাদের মধ্যে অনেকরকম ঘাত প্রতিঘাতও হয়, কিন্তু তারপর কি ভাবে যেন এক জনের মধ্যে আরেকজন ঢুকে পরে, কিংবা অনেকের ভেতরে অনেকজন। চরিত্রদের মনের ভেতর, তাদের ভাবনায়, এমন কি তোমার নিজের ভাবনার জালেও জড়িয়ে ফেলো পাঠককে। যেন একটা মেইজ তইরি করছ। এমন কেন কর?

তো কী হয়েছে! করতে নেই?

না, তা বলিনি। কিন্তু এমন লিখলে বেশির ভাগ পাঠককেই টানবে না। সেটাই স্বাভাবিক।

আমাকে একটা কথা বলতো? পাঠককে টানার জন্যে গল্প লিখতে হয়, না কি গল্পটা বলার টানেই গল্প লিখতে হয়।

লোকে গল্প চায়। এটা মানতে চাও না?

মানি। কিন্তু যে গল্প সে শুনতে চাইছে, সেই গল্প তো জীবন শোনায় না তাকে। তাহলে আর্ট-এ সেই গল্প চাইছো কেন?

একটা শুরু। একটা মধ্যভাগ। আর একটা শেষ। এভাবে ভাবলে তবেই একটা মানে খুঁজে পাওয়া যায়। সেটা জীবনেই হোক। অথবা আর্ট’এ।

মানে জিনিসটা খুব জরুরী বুঝি? কিন্তু ওটাকে তো বানিয়ে তোলা যায়। তোমাদের রাষ্ট্র হোক, সমাজ হোক, রাজনীতি হোক  বা ইতিহাস, বা ধরো মিডিয়া, এবং সাহিত্যও, তো ওটাকেই বানিয়ে তুলছে সারাক্ষণ। একটা শুরু, মাঝখান, তারপর শেষ। দি এন্ড। সেটা মানুষে মানুষে সম্পর্কই  হোক অথবা মানুষের সাথে তার চারপাশের।

ঠিকই। কিন্তু সব সম্পর্কই তো তাইই। শুরু থাকে। তারপর শেষ। হয়ত মাঝখানে কিছুটা সময় যায়। তারপর এক সময়, কারো বেশি কারো কম, সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, এই সব, ফুরিয়ে আসে। সম্পর্কের নানা রকম ঢেউ থাকে, জানো তো? কিছুদিন দুদিক থেকেই ওঠে, একসঙ্গে ওঠে। তারপর একসময় শেষ হয়ে যায়। এক্সপায়ার্ড।

 

শেষ হয়ে যায়!

না। ঠিক শেষ হয়ে যায় না। ফুরিয়ে যায়। শেষ হওয়া আর ফুরিয়ে যাওয়া তো এক জিনিস নয়।

ফুরিয়ে যায় কেন?

এর উত্তরটা আমি জানিনা। যায় যে, সেটুকুই শুধু বুঝেছি। ধরো জীবন দিয়েই।

আমার কিন্তু তা মনে হয় না। কী মনে হয় জানো? একটা শুরু থাকে, সেটাই প্রথম, সেটা বীজ, তারপর সেটাই নানা ভাবে বাড়তে থাকে। ডালপালা মেলে। শেকড় ছড়ায়। ছড়িয়ে যেতে থাকে অনেক রকম ভাবে। বাধা পায়। ধাক্কা খায়। পড়েও যায় কখনো। কিন্তু থামে না। থামতে পারেনা। শেষ নেই তার।

অতীন এরপর আর কিছু বলেনা। মৃদু হাসে।

বাঁচার মানে এক একজনের কাছে এক এক রকম। ও নিয়ে তর্ক করার কোন মানে হয়না। এটা সে ভালোই বোঝে। তার শুধু মনে হয়, এই যে লীনার কথা শুনতে শুনতে এতক্ষণ সে আরো একটা আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল, ঠক ঠক ঠক ঠক, সেটা কোথা থেকে আসছিল লীনা তো জানেনা। লীনা শুনতেও পায়নি। অতীন দেখেছে। তারা যখন কথা বলছিল ঠিক তখনি একটা পাখি পাশেই যে নতুন বাড়িটা উঠছে তার সিমেন্টের গায়ে লাগানো বাঁশের কাঠামো্র ওপর বসে ঠোকরাচ্ছিল। একেই কী কাঠঠোকরা পাখি বলে? কে জা্নে? সে আগে কখনো দেখেনি। পাখিটা দেখতে খুব সুন্দর। লাল, সবুজ, হলুদ, কত রকম রঙ তার গায়ে। লীনা দেখেনি। সে দেখেছে।

অতীনের মনে হয়, লীনা এই কথাটা ঠিকই বলছে। নিজেদের দেখা অনুযায়ী আমরা শুধু সময়ে সময়ে ঘটনাক্রমকে পালটে দিই। নিজেদের স্বার্থ মত একটা মানে খুঁজে বার করি সেসবের।

অতীন বলে, তর্ক থাক। চল একটা খেলা খেলি বরং।

কি খেলা?

ধরো, একটা লোক। সে সারাদিন তো অনেক কিছুর মধ্যে দিয়ে গেছে। এত কিছু যে সবকিছুকে ধারাবাহিকভাবে মনে করে রাখাও সম্ভব নয়। তো লোকটা সারাদিনের সবকিছুকে লিখে রাখছে। মানে একধরণের ডকুমেন্টেশন। স্মৃতির বিকল্প। একটা ডায়রীর পাতা ধরে নাও তোমায় দিচ্ছি। সেখানে সে একদিনের যা কিছু, যেখানে যেখানে সে গেছে, যা কিছু দেখেছে, যাদের সাথে দেখা করেছে, যা যা তার মনে হয়েছে, সবকিছু সে লিখে রেখেছে। এটা পড়ে তোমাকে তার গল্পটা বানাতে হবে। পারবে?

বেশ। চলো স্টার্ট করো।

আচ্ছা। তোমাকে শুধু একটা ক্লু দিতে পারি। মনে রাখবে যে কোনও লেখাই আসলে একধরনের কোডিং ডিকোডিং। বানাও, ভেঙে ফেলো। ভেঙে ফেলো, ফের বানাও।

ও.কে. ।

আর একটা কথা। তুমি যখন কোন মানুষকে দেখো, প্রথমে কি দেখো তার?

তার চোখ।

ঠিক। তারপরে তার চোখের মণিটা দেখ। জানবে, ওখানে মানুষটার পুরো গল্পটা বলা আছে।

বেশ। শুরু করা যাক।

৮.১২.২০১৭

সকাল সাড়ে দশটা

খান্ডেলোয়ালের সাথে মিটিংটা সকাল এগারোটায়। গড়িয়াহাট থেকে হাইকোর্ট এ পৌছতে যা জ্যাম কিছুতেই আধ ঘন্টায় পারবেনা। কি করি? একটা এসএমএস করবো? ফোন করলেই তো খ্যাঁক করে উঠবে।

দুপুর একটা তেত্রিশ

যাক লোকটা ভাগ্যিশ নিজেই দেরি করল! ভয়ঙ্কর খিদে পেয়েছে। ডালহাউসি তে চিনি দিয়ে টোস্ট খেলাম।

চারটে পনেরো

আর মাথা কাজ করছে না। সারাদিনে বোধহয় তেত্রিশটা ফোন এল। হেড অফিসের। এটা চাই ওটা চাই। এই ফিগার পাঠাও। ওই রিপোর্ট এলনা এখনো! বসের মেজাজ। এদিকে ক্লায়েন্টের খিস্তি। কি হোল? মালটা পাঠাবেন বললেন। এখনো পৌছলো না কেন! ধুর বাল! সারাদিন এই ম্যানেজারি করার জন্যে জন্মেছিলাম!

সাড়ে ছটা

আর ভাল লাগছে না। ধর্মতলায় আছি। যে কোন একটা বারে ঢুকে গলা ভেজানো দরকার। কোন বন্ধুকে ডাকবো? না থাক। একা একাই ভাল লাগে আজকাল।

সাতটা দুই

তখন থেকে দেখছি এই লোকটাকে। এমন ভাবে আসছে যাচ্ছে যেন দুনিয়ার সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ওনার ওপরেই বর্তেছে। আচ্ছা, এই লোকটাকে নিয়ে একটা গল্প লেখা যায়না? বুকে টাই, হাতে ট্রে, তার ওপরে কাচের গ্লাস। দুটো চারটে ছটা আটটা। কি অদ্ভুত একটুও টাল খাচ্ছেনা তো। ভরা গ্লাসেও না। ধরা যাক ওর নাম অখিলেশ। কিন্তু আর একটা চরিত্র কে হবে? ধরা যাক আমি নিজেই।

সাতটা ষোল

ওই সবথেকে বেশি পাতা জুড়ে যাতায়াত করবে। ওর সাদাটে ছাই রঙের শার্টের ওপরে ডার্ক ব্রাউন প্রিন্টেড টাইটা, এই যে যতবার ও যাবে আর আসবে, ততবার, হেমন্তের থমকে থমকে আসা হাওয়ার মত, বুকের থেকে দুলে উঠে ছিটকে গিয়ে ফের, ফিরে এসে, বুকে বসে যাবে। তো আমি আর এই দুলে ওঠা টাই পরা, আমি-সব-কিছু-জানি টাইপ অখিলেশ, এরা দুজনেই আসলে আমার এ গল্পের নায়ক। আচ্ছা,তাদের মধ্যে তো কোন বৈরীতা নেই! এমন কিছুই নেই যে দুজনে দুজনের বিরুদ্ধে দাঁত পিষছে, ছক করছে, পেলেই দেখে নেব টাইপের ব্যাবহার করছে, এমন তো নয়! তাহলে দুজনেই নায়ক হবে কী করে। ওকে, তাহলে একজন নায়ক, অন্যজন খলনায়ক। হ্যাঁ, এটা চলতে পারে। যাই হোক ঘটনাটা হচ্ছে এটাই যে,আমার বসে থাকা আর কিংফিশার স্ট্রং এসে আমার টেবিলে বসার ফাঁকে কম করে চারবার, অখিলেশ, যাঁকে এখানের ওয়েটাররা মজুমদারবাবু, ও মজুমদারবাবু, বলে ডাকছে, তিনি অন্তত চারবার আমার ডানদিকের প্যাসেজ দিয়ে, গেলেন আর এলেন।

 

সাতটা সাতান্ন

খুব দেরি করে আজ পৌছেছে ক্রুনার। মানে যে মেয়েটি এখানে গান করে। ম্যানেজার খুব কড়া চোখে তাকালো তার দিকে। এটুকুই তো যথেষ্ট এটা বোঝানোর জন্যে যে, ওহে, শুনে রেখো, এভাবে চললে কিন্তু কাল থেকে আর ভাত জুটবে না তোমার বিধবা মায়ের আর তিনটে ভাই বোনের। আর কেউ না দেখলেও ক্রুনার মেয়েটা ঠিক বুঝেছে এই চোখের ভাষা। এত দ্রুত প্রায় দৌড়ে সিংগিং বারের দিকে চলে গেল যে, টেবিলে গ্লাস হাতে বসে থাকা লোকগুলো না দেখতে পেল ওর পাছা, না দেখতে পেল ওর মুখ।
অবশ্য, আমার মনে হল, মেয়েটাও তো এইটাই চাইছিল। কেউ যেন না দেখতে পায় ওকে। ওর লজ্জাকে। ওর হেরে যাওয়াকে। ওর হারতে হারতেও বেঁচে থাকার জিদকে, কেউ যেন না দেখতে পায় আর! কারা দেখবে? কারা? যারা ওর পাছা, বুক দেখবে, গলার আওয়াজ শুনে বলবে ওয়াহ! ওয়াহ! মাসায়াল্লা! তারা? না তাদের কাউকে ও মুখ দেখাতে চায়না। মেয়েটা দৌড়ে কাঁচের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ে সিংগিং বারের ভেতরে। বন্ধ দরজার ওপার থেকে তার প্রথম গান ভেসে আসে। আও হুজুর তুমকো, সিতারো মেঁ লে চলু।
মিঃ মজুমদার, আমাদের নায়ক, আমাদের অখিলেশ, আমার সামনে এসে জিগ্যেস করেন, স্যার, আপনাকে আর একটা বিয়ার দেব?

আটটা সতেরো

এটা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, গোড়ালি থেকে পায়ের খোলা গোছ অবধি যে আলোটা এসে পড়েছে,সেটা,না কি ওপর থেকে ঝুলতে থাকা শেডেড বাতির যে আলো ছায়ার খেলা,আর শেডটা দুলছে বলেই যে ছায়া আর আলো মেয়েটার মুখে একটা থিয়েটার স্টেজ নির্মাণ করছিল সেইটা,কোনটা আমাকে বেশি আকর্ষণ করছিল! না,সত্যি নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। কিন্তু ব্যাপারটা তো আসলে এটাই যে এই মুহূর্তে এই হল ঘরটায় যতগুলো টেবিল আছে সবকটায় দুজন নয়ত চার জন বসে আছে। শুধু আমার টেবিলটাতেই আমি একা। একটা টেবিল নি:সঙ্গতার ভাষা যতটা বোঝে আর কোন কিছুই ততটা বোঝেনা।

আটটা ছাব্বিশ
দুনিয়ার সব খেলার মধ্যে সবচেয়ে টানটান উত্তেজনার খেলা হল এইটা। এই যে একা একা মানুষ দেখা। কোন হারজিত নেই, কিন্তু ধারাবাহিক একটা এডভেঞ্চার আছে। এইটা আমার ভাল লাগে।
কলকাতা শহরটা এখন অনেক বদলে গেছে। আমার বাবা এই শহরটা চিনতে পারতো না। এই হলের অন্যান্য টেবিলে যারা বসে আছে তাদের একে অপরের সাথে সম্পর্ক, দেখে এটুকু বোঝা যায়, বাবা বা তাদের প্রজন্মের মানুষেরা এই সম্পর্কগুলোকে উপন্যাসের পাতায় যতটা পড়ত, রোজকার বাস্তবে ততটা দেখতে পেতনা। হতে পারে হয়ত তাদের ফ্যান্টাসির জগৎটাই কিভাবে যেন কয়েক দশক পার করতে করতে আজকের সময়ের মধ্যে নিজেকে লিখতে শুরু করেছে।
আমার ডানদিকের টেবিলে যে মেয়েটি,যার কথা একটু আগে বলছিলাম,সে তার উল্টো দিকে বসা ছেলেটিকে বললো, আসি যাই মাইনে পাই,ও সব আমাদের জন্যে নয় বস,চল্লিশ মিনিট যেতে চল্লিশ মিনিট আসতে,ভীড় বাসে কনুয়ের গুঁতো খেতে খেতে যদি অফিসে যেতে হত,বুঝতিস। ছেলেটি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল,মেয়েটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, মেয়ে হয়ে তো জন্মাস নি,তুই আর কী করে বুঝবি এসব,তোরা ছেলেরা কত কি ঠেকাতে জানিস মেয়েদের!

আটটা তেত্রিশ

আমার উল্টোদিকের টেবিলে যারা বসে আছেন, অবশ্য ছেলেটির মুখ আমি দেখতে পাচ্ছি না,কিন্তু তার সামনের মহিলা আমার মুখোমুখি,আর ওনার মুখ নয়,আঙুলের দিকে বারবার আমার চোখ পড়ছিল। লম্বাটে আর সরু আঙুল। যেন তাদের সৃষ্টি হয়েছে পিয়ানো বাজানোর জন্য। যদিও তারা এখন নিছক হুইস্কির গ্লাস ধরে আছে।
হঠাৎ মনে পড়ল বিলি জোয়েল-এর একটা গান ছিল, পিয়ানোম্যান। সেখানে একটা লাইন ছিল, ‘এখন এই মিউজিক বার-এ তারা একটা ড্রিঙ্ক নিয়ে বসে আছে,যার নাম ‘একাকিত্ব’, যদিও একা একা পান করার থেকে সেটা অনেক ভাল’।

……………….

এই অবধি লীনা খুব মন দিয়ে পড়ছিল। অতীন একটা সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ ধোঁয়া ছাড়ছিল আর লীনার মুখের ওপর এসে শেষ দুপুরের যে আলো ছায়াটা লুকোচুরি খেলছিল, সেটাকে মন দিয়ে দেখছিল।

লীনা লক্ষ করল, প্রথমে এক দুটো বাক্য দিয়ে পাতাটা শুরু হয়েছিল, তারপর বেশ বড় করে ছড়িয়ে লেখা, আর তারপর থেকে আবার একটা কি দুটো বাক্যে ছাড়াছাড়া কয়েকটা লাইন। তার মনে হল, লোকটা যেই হোক নেশাটা একটু একটু করে চড়ছে তার মানে। কিন্তু দুটো জিনিস বোঝা যাচ্ছেনা। আমি কে সেটা তো বুঝলাম। কিন্তু ওই যে ওয়েটার, অখিলেশ, সে গেল কোথায়?

………………

 

আটটা চুয়ান্ন

অখিলেশ আর একটা বিয়ার দিয়ে গেল এইমাত্র। গত কয়েকঘন্টায় ওর মুখের ভাব একবারের জন্যেও বদলাতে দেখলাম না। ওটা কি ওর মুখ না মুখোশ?

পাশের হল ঘরের বন্ধ দরজা একটু ফাঁক হতেই বিকট হুল্লোড়ের আওয়াজ আর ‘বিড়ি জালাইলে, জিগর সে পিয়া’ আর তার সাথে ঝাঁই ঝাঁই মিউজিক কানে এসে ধাক্কা মারল।

হঠাৎ মনে হল, আমার হাতের টিপ সাধারণত বেশ ভাল। মানে মোটামুটি দশ ফিট দূরত্ব থেকে আমি এক লাইনের সব বেলুন এক চান্সেই ফাটাতে পারি,ঝোলানো কয়েন উড়িয়ে দিতে পারি আর জ্বলন্ত মোমবাতি নিভিয়েও দিতে পারি। দশ ফিট দূরত্ব মানে আমার বেডরুমের এ দেয়াল থেকে ও দেয়াল। তাহলে গৌরী লঙ্কেশ কে যে রিভলভারটা, রিভলভার ধরা আঙুল,আঙুলের পেছনের মানুষটা,খুন করল,সে মাত্র দশ ফিট দূরত্বে দাঁড়িয়ে সাতটা গুলি চালিয়ে শুধু তিনটে গুলি টার্গেটে হিট করতে পারলো কেন? তার আঙুল কি তার মানে সেই মুহুর্তে কেঁপে গিয়েছিল?

সেও ভয় পেয়েছিল তার মানে!

খুনিদের কোথায় ভয় কাজ করে এটা জানা খুব জরুরী। খুবই জরুরী আজকের সময়ে।

নটা একুশ

১. সামনে থেকে দেখলে একরকম লাগবে, পাশ থেকে আর একরকম।

২. রাত আর দিনের মাঝখানেও তো কিছু থাকে।

৩. দিক পালটানোর সাথে সাথে আসলে সবকিছুই বদলে যায়।

৪. নেব কি নেব না সেটার উত্তর কী হবে তাহলে?

৫. রচনা, কথা, শিল্প, সাহিত্য, সবকিছুই তো এক অর্থে তাই। তাই না?

৬. সময়, আসলে সময়টাকে খুঁজে বেড়ানো।

৭. বইয়ের ভেতরে তুমি সময়কে খুঁজছো! জীবনে নয়?

৮. কিসের জন্যে চাইছো? কেন চাও মৃত সময়কে ধরে রাখতে?

৯. ছুঁয়ে থাকতে চাই বলে। রক্তের চলাচল। শিরার স্পন্দন। সবকিছুকেই।

১০. ইলিশের রুপোলী ঝাঁক মনে কর মোহনার থেকে নদীর উৎসের দিকে ফিরে আসছে যেন।

১১. কে বলতে পারে শিকারী যেমন করে তার শিকারকে টানে, শিকারও তেমনি তার শিকারীকে কাছে টানে কিনা?

১২. মধ্যমগ্রামে কাল একটা মার্ডার হয়েছে। ট্রেন অবরোধ আজ। ঝাড়া একঘন্টা দেরী হল ফিরতে।

১৩. ন-পার্টির লোকজন শুনলাম। অবশ্য ক-পার্টিও হতে পারে। কিছুই বোঝা যায়না আজকাল।

১৪.ছেনালীর মত মনে হয় সবকিছুই।

১৫. রাত বাড়ে, রাত বাড়ে, রাত বাড়ে।

১৬. ছেলেমানুষের মত কথা বোলনা তো। আমাদের রাষ্ট্র, প্রশাসন, সরকারী দপ্তরগুলোয় কোনই কাজ হয়না মনে কর!

১৭. রাত আর দিনের ঠিক মাঝখানের যে সময়টা সেটা জারজ সময়। না আলোর। না অন্ধকারের।

১৮. হাওয়ায়, অন্ধকারে, এমন অনেক কথা ভেসে থাকে, যাদের কোনও ঘর নেই, ঠিকানা নেই, গন্তব্যও নেই।

১৯. জারজ সময়ের জারজ সন্তান সব। আমরা। ভাঙা মন, ভাঙা কথা, ভাঙা ঘরের ছেলেমেয়ে সব।

২০. রমণ যেখানে শুধু ভোগের জন্য হয় সেখানে আর কিছু আশা করতে পারো তুমি?

২১. কাম তো শুধু যৌনতা নয়। সে যত বেশি চায়, ততটাই, না চাওয়াতেও যেতে চায় তো।

২২. হিয়া কাঁপে, হিয়া ভীরু হয়, হিয়া উৎসর্গ করতে চায় নিজেকে, কী বলবে তুমি এটাকে?

২৩. নিঃসঙ্গতা বলবো। হয়ত নৈঃশব্দ্য। কবন্ধ বলবো। কণ্ঠস্বর নেই। শুধ বোবা কোন আওয়াজ।

২৪. রক্ত অনেক শতাব্দী পার করে তবু, রক্তেরই আলোড়ন খোঁজে না কী?

 

২৫. বীভৎসতা একধরনের স্পেকটেকল, ছাড়েনা, বাধ্য করে দেখতে।

২৬. জনগণের মাথা নেই ভাবো? মন নেই?

২৭. তার ছিঁড়ে যায় যখন, ছেঁড়া তার কেমন অসহায় ভাবে ঝুলতে থাকে, দুলতে থাকে, গুটিয়ে আসে, দেখেছো কখনও?

২৮. ইচ্ছে করেনা। ভয় করে।  জানি তো, সে আর সুর তুলতে পারবে না কোনদিন।

২৯. একটা আঙুলের স্পর্শ, কোনও একলা হাত , যদি না আর একবার তাকে ছুঁয়ে দেয়।

৩০. খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে সে হয়ত তখন চীৎকার করে; তবু তার আর্তনাদ শুধু প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে ফিরে আসে তার     কাছে।

৩১. নেমেসিস?

৩২. ইয়েহী ওহ জাগাহ হ্যায়, ইয়েহী ওহ ফিযায়ে , ইয়েহী পর কভী, আপ হম সে মিলে থে… বন্ধ হল ঘরের ফাঁক দিয়ে এখন এই গানটা ভেসে আসছে। সেই ক্রুনার মেয়েটাই হবে হয়ত। শান্ত হয়ে আসছে সব কিছু তাই না!

৩৩. আমরা কি এবার ঘরে ফিরবো?

৩৪. ছেড়ে আসা ঘরে?

 

………………………….

ডায়রীর ছেঁড়া পাতা এখানেই শেষ। পড়া থামিয়ে লীনা কিছুক্ষণ ঝিম হয়ে বসে থাকে। তারপর বলে, এটা যে লিখেছে সে কি উন্মাদ না শয়তান! মানে কি এসবের? এর মধ্যে গল্প কোথায়?

অতীন হাসে। বলে, তোমায় বলেছিলাম না, লেখা হল কোডিং আর ডিকোডিং। শুধু চোখের ভাষা লক্ষ করো।

কী ভাবে?

লেখাটার শেষ চৌত্রিশ লাইনের প্রথম অক্ষরদের পাশাপাশি রাখো। তোমার গল্প তুমি পেয়ে যাবে।

কথাটা বলেই অতীন আর দাঁড়ায় না। বেরিয়ে যায়।

লীনা শেষ চৌত্রিশটা এন্ট্রির প্রথম অক্ষরগুলো আবার পড়ে। সাজাতে চেষ্টা করে। শব্দগুলো প্রথমে দানা বাঁধেনা। তার পর ধীরে ধীরে রূপ পায়। একটা বাক্য তইরি হয়। তারপর আর একটা।

লীনা দেখে অদৃশ্য দুটো বাক্য ক্রমশ দৃশ্য হয়ে উঠছে। সেখানে লেখা আছে,

সারা দিনের সবকিছুই কেমন ছেঁড়া ছেঁড়া। হাজার কাহিনির বীজ তাই এখানেই আছে।

Facebook Comments
শেয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *