গল্প : তিনটি অণু গল্প

তিনটি গল্প / আহমেদ খান হীরক

 

গল্প।। লাবনী আপা হয়তো প্যারিসে আছেন।।

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার পর জানলাম লাবনী আপার কথা তেমন কেউ জানেন নাই। আমি তাকে প্রথম দেখি আমাদের স্কুলে। আমি তখন ক্লাস ফোরে বা ফাইভে পড়ি। লাবনী আপা সুন্দর ছিলেন। তার চুলগুলো কাটা ছিল ছোট ছোট করে। আর লাবনী আপা খুব হাসতেন। হাসতে হাসতে বান্ধবীর গায়ে গড়িয়ে পড়তেন।

লাবনী আপা তখন এইটে পড়তেন বোধহয়।

স্কুলের ত্রৈমাসিক অনুষ্ঠানে লাবনী আপা একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছিলেন। নদী আপন বেগে পাগলপারা। গানটা আমার ভেতর ঝনঝনিয়ে যায়। তারপর থেকে লাবনী আপাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম।

লাবনী আপার গলার পেছনে একটা তিল ছিলো কালো।

এখন একজন বলল যে লাবনী আপা কোথায় আছে কেউ জানে না। আমি লাবনী লিখে ফেসবুকে গুগলে সার্চ দিলাম, তাতে অনেক লাবনী এলেও কেউ লাবনী আপার মতো দেখতে না। গলার পেছন দেখতে না পেলেও আমি নিশ্চিত তাদের কারোরই ওখানে তিল নেই।

আমার মনে হয় লাবনী আপা প্যারিসে আছেন। হয়তো প্যারিসেই আছেন। কোনো দিন প্যারিস গেলে আমি একবার লাবনী আপাকে খুঁজবো।

 

গল্প।। শীত চলে এলে পুনর্ভবার পাথরঘাটে

 

শীত চলে এলে পুনর্ভবার পাথর ঘাটে গভীর রাতে আর কেউ যায় না। সন্ধ্যা রাতেও সেদিকে সাড়া থাকে না তেমন।

ভুল করে কেউ চলে গেলে শোনে পানির আবর্তন আর পায় এক অসম্ভব গাঢ় ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণ কাঁঠাল চাপার হতে পারে। তবে পুনর্ভবার দুদশ মাইলে কাঁঠাল চাপার গাছ কেউ কখনো দেখে নি। এপারের খাড়া ঢালে, তেলকুচির ছোপ বনের ভেতর যদি কোনো তেমন গাছ থাকে তাহলে ভিন্ন কথা! কিন্তু সে তেলকুচি বনে কে ঢুকবে? শেষবার এই রকম আসি আসি শীতে ঢুকেছিল রবু। সেই থেকে রবু আর চোখে দেখে না। অথচ রবুর খুশির কোনো খামতি নেই। কী দেখেছিলি রবু? -এমন প্রশ্ন করলে সে শুধু মুচকি মুচকি হাসে। যেন কী এক অভিজ্ঞান সে মনে করছে আবার, আর করে, তার খুব, লজ্জাও হচ্ছে।
যদি বলি, বল না রবু কী হয়েছিল ওই রাতে?
সে বলে, কিছু না। কিছু না।
তারপর সে হাসে। একটা ময়ূরপুচ্ছ কানে গুঁজে রাখে। অন্ধ তাকে লাগে না। অথচ ডাক্তার বলেন রবুর চোখ ঝলসে গেছে!

কী দেখে রবু অন্ধ হয়েছিল কেউ জানে না। কিন্তু দৃশ্যটা নিশ্চয় খুব সুখেরই ছিল। রবুর মুখের হাসি তাই বলে।

শীতের সকালগুলোতে, কেউ কেউ খুব ভোরে পাথর ঘাট গেলে, ঘাটময় বড় বড় রূপালি আঁশ দেখতে পায়। এই আঁশ কোনো মাছের তো নয়!

অনেক পুরনো মানুষেরা বলেন, শীতকালে বিদেশ থেকে শুধু পাখিই আসে না… পানির অভাবে জলপরিরাও আসে এই ঘাটলায়। গভীর রাতে তারা নাকি ডাঙায় উঠে জ্যোৎস্নায় নিজেদের পিঠ শুকায়। নিজেরাই হাসি তামাশা করে। আর তাদের কী অদ্ভুত রূপ। এমন সুন্দর পৃথিবীতে আর কিছু নেই। কিছু নেই। সেই রূপের দিকে তাকালে চোখ ঝলসে যায়, বুদ্ধি লোপ পায়।

আমরা অবশ্য বুড়াদের এইসব কথা বিশ্বাস করি না। তবে আসি আসি শীতের এইসব সন্ধ্যা আর রাতে আমরা কেউ পাথর ঘাটে যাই না।

পুনর্ভবার বাতাসে থাকে শুধু কাঁঠাল চাপার চাপা ঘ্রাণ।

 

গল্প।। তুমি বা তুই না হয়ে ওঠা তুই বা তুমি।।

তোর সাথে আবার দেখা হলো। আসলে দেখাও তো না। তোকে ফেসবুকে পেলাম। ফেসবুকে যে তুই আছিস তা তো আমি বুঝি নাই। আমি ভুলেই গেছিলাম যে তুই বলে কেউ আসলে আছিস। তুই একদিন দুম করে জানালি যে তুই আসলে তুই। তখন তোকে তুমি মনে হলো। ফলে তুমি বলে অনেকক্ষণ কথা বললাম। একসময় তুমি বললি যে আসলে ছিল তুই। তখন একটু সময় নিলাম আর ভাবলাম যে তুই আসলে কী ছিলে! ভাবতে গিয়ে দেখলাম আসলেই তুমি ছিলি তুই। তখন ভালো লাগলো যে আবার তোকে পেলাম। আসলে পাওয়ার মতো তো কিছু নাই, তুমিতেও নাই তুইয়েও নাই।

জিগ্যেস করলাম, তুই ভালো আছিস?
তখন তুই জানালি যে তুমি খুবই ভালো আছো। যেহেতু তোমার এখন স্বামী আর সন্তান আছে। সন্তান নিয়ে ব্যস্ত্ম থাকতে পারছো। মনে হলো ব্যস্ত থাকতে পারাটা ভালো থাকা। আমার মনে হলো আমি যে ভালো নাই এর কারণ আমি ব্যস্ত না। ফলে তোকে জানালাম যে আমি ভালো আছি, খুবই ভালো আছি।
তখন তুই মুচকি হাসির ইমো পাঠালে। আমার মনে হলো গোল মাথার ওই ইমোটা আমাকে উপহাস করছে। মনে হলো যে তুমি বুঝেছিস আমি আসলে ভালো নাই। বা, আমার যেমন তোর ভালো থাকার সংবাদে ভালো লাগলো না, এক ধরনের খারাপ লাগলো, বেশ খারাপ লাগলো, যে কেন তুমি ভালো থাকছিস আর এইখানে ভালো থাকার কী আছে? সন্তান থাকলেই মানুষ ভালো থাকে না। সন্তানই কি শেষ? আর কিছু ভালো নাই। আর কোনো ব্যস্ততা নাই? আর এত ব্যস্ততা কিসের? কেমন ব্যস্ততা? তখন গালি চলে এল মনে। খুব খারাপ ধরনের গালি। কিন্তু গালি না দিয়ে আরেকটা হাসির ইমো পাঠিয়ে দিলাম।
আর এরকম খারাপ মনে হলো তোরও লাগলো। মনে হলো গালির বদলে তুমি একটা হাসির ইমো পাঠালি।

তুমি অনেকক্ষণ কোনো জবাব দিলি না। জবাবের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমি ঘুমিয়েই যাচ্ছিলাম, তখন তুই প্রশ্ন করলি–
এ্যাই ঘুমায়ে গেছ?

 

Facebook Comments
শেয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *