গল্প : অর্ডার নং ২২৭

 

অর্ডার নং ২২৭ : শুভাশীষ রায়চৌধুরী

(১)

-নি শাগু নাজাদ, নি শাগু নাজাদ, নি শাগু নাজাদ!!

জানলার পাশে বসে শীতে কাঁপতে কাঁপতে এই একটা কথাই বিড়বিড় করে চলেছিলেন সার্জেন্ট। প্রায় দুমাস ধরে সার্জেন্টের সাথে থাকলেও কোনোদিন তাকে এতটা বিচলিত হতে দেখেনি আলেক্সি। আজ সকাল থেকেই যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছেন সার্জেন্ট আর মার্শাল স্তালিনের দেওয়া শেষ নির্দেশটা আপনমনে বিড়বিড় করে চলেছেন। ভোলগার ওপার থেকে শেষ অস্ত্র আর খাদ্যের যোগান এসেছিল প্রায় দু সপ্তাহ আগে। টানা দুই মাস লড়াই করে তাদের পঁচিশ জনের প্লেটুন এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র দশ জনে। এক অসম যুদ্ধের চাপ তো আছেই তারওপর এই বাড়ির মাটির তলার ঘরে রয়েছে কয়েকটা শরণার্থী পরিবার। তাদের দায়িত্বও সার্জেন্টের ওপরে এবং তাদেরও রসদও প্রায় শেষের দিকে।। এদিকে যা গোলাবারুদ রয়েছে তা আজকে দুপুরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে তা সার্জেন্ট ভালই বুঝতে পেরেছেন। তার মাথায় এতসব চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে বলেই হয়ত তিনি এতটা বিচলিত হয়ে উঠেছেন বলে মনে হল আলেক্সির। যদিও সে লক্ষ্য করল সার্জেন্টের সমস্ত শরীর ঠাণ্ডায় কাঁপলেও রাইফেলের ট্রিগারে তার তর্জনী জিব্রাল্টারের পাথরের মতই নিষ্কম্প।
-নি শাগু নাজাদ, নি শাগু নাজাদ, নি শাগু নাজাদ, নি শাগু নাজাদ!!
হঠাৎ করে সার্জেন্টের গলার স্বরের মাত্রা যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। এবার আর বিড়বিড় করছেন না তিনি। বেশ জোরে জোরেই আউরে যাচ্ছেন মার্শাল স্তালিনের সেই নির্দেশ। তা দেখে হতভম্ব আলেক্সি নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে সার্জেন্টের কাছে এসে দাঁড়াল। হাল্কা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে সার্জেন্টের কাঁধ ঝাঁকানোর জন্য হাত তুলতেই গর্জে উঠল সার্জেন্টের রাইফেল। সে আওয়াজে চমকে উঠে আলেক্সি আছড়ে পড়ল মাটিতে আর দূর থেকে কোনও একজনের তীব্র আর্তনাদ শোনা গেল। সেই চিৎকারে নিজের লক্ষ্যভেদ নিশ্চিত করে মৃদু হেসে পাশ ফিরতেই সার্জেন্টের নজর পড়ল আলেক্সির উপর। নিমেষে বদলে গেল তার মুখের অভিব্যক্তি। প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে তিনি বলে উঠলেন,

-প্রাইভেট আলেক্সি!! এখানে কি করছ? বার বার করে বলা সত্ত্বেও নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে এসেছ কেন?

-সা-সার্জেন্ট পাভলভ, আপনি কেমন একটা করছিলেন যে।

-কি? কি করছিলাম?

-বি-বিড়বিড়…

অস্ফুট স্বরে কথাটা বলতে বলতে মাটি থেকে উঠল আলেক্সি। সার্জেন্ট তার উত্তর ভালমত শুনতে না পেয়ে ফের ঝাঁঝিয়ে উঠে জিজ্ঞাসা করলেন,
-কি করছিলাম সেটা বল রে বেয়াদব? কি এমন দেখলি যে আমার নির্দেশ অমান্য করে নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে এলি? এখনই গিয়ে রাইফেল ধর নাহলে তোকেও মেরে ফেলব। ফ্যাসিস্তের বাচ্চারা অনেকটা কাছে এসে গেছে। আজ দুপুরের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যাবে। লড়াই করে মর রে কাপুরুষ। কুকুরের মত মৃত্যুর কোন দাম নেই। নি শাগু নাজাদ, নি শাগু নাজাদ, নি শাগু নাজাদ……
এক নাগাড়ে কথাগুলো আবার আপনমনে বিড়বিড় করতে শুরু করলেন সার্জেন্ট। আলেক্সি তাড়াতাড়ি নিজের জায়গায় গিয়ে রাইফেল উঁচিয়ে বসে পড়ল। তার মনের ধারনাটাই ঠিক তাহলে। সার্জেন্ট বুঝতে পেরেছেন যে এই গোলাবারুদে আজ দুপুরের বেশি আটকে রাখা যাবেনা নাৎসিদের। দীর্ঘ দুমাস ধরে চলতে থাকা রক্ষণের শেষ দিন এসে গেছে বলেই আজ সকাল থেকে এরকম পাগলামো করছেন তিনি আর যত সময় এগোচ্ছে ততই বাড়ছে তার পাগলামোর মাত্রা। তবে একটা কথা মানতেই হবে। সার্জেন্ট পাভলভের মানসিক অবস্থা তার সামরিক পারদর্শিতায় বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলেনি। নিখুঁত লক্ষ্যভেদে কয়েক মাইল দূরের নাৎসিদের খুলি হেলায় উড়িয়ে চলেছেন তিনি। এসব ভাবতে ভাবতে আজ দুপুরের শেষে তাকেও মরতে হবে সেটা মাথায় আসতেই কিছুটা উদাস হল আলেক্সি তবে পরক্ষণেই শক্ত হয়ে উঠল তার চোয়াল। স্তালিনগ্রাদের শেষ সোভিয়েত ঘাঁটি, ভোলগা নদীর তীরের এই ভগ্নপ্রায় বাড়িটার তিনতলার বসে নিজের অজান্তেই আলেক্সির মুখ থেকেও বেরিয়ে এল,

-নি শাগু নাজাদ।

যুদ্ধ শুরুর সময় পাওয়া মার্শাল স্তালিনের সেই নির্দেশ, যার সরকারী নাম ছিল ‘অর্ডার নং ২২৭’ এবং যার অর্থ ‘এক পাও পিছিয়ে আসবে না‘।

(২)

‘অপারেশন বারবারোসা’ নামক সামরিক অভিযানে সোভিয়েত দেশের অনেকটা ভিতরে ঢুকে পড়ে মস্কোর বদলে স্তালিনগ্রাদকে নিশানা বানায় নাৎসিরা। গ্রজনির বিপুল তৈলসম্ভারের উপর নজর পড়েছিল হিটলারের এবং তা দখল করতে গেলে আগে স্তালিনগ্রাদকে নিজের কব্জায় আনা ছাড়া আর অন্য কোন উপায় ছিল না তার। স্তালিনগ্রাদ ছিল সোভিয়েত দেশের সবথেকে মূল্যবান শিল্পাঞ্চল। ভোলগা নদীর তীরের এই শহর থেকে স্তালিনের কোষে সিংহভাগ অর্থ সরবরাহ হত। এসব ছাড়াও হিটলারের স্তালিনগ্রাদকে পাখির চোখ করার মূল কারণ ছিল সেই শহরের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর নামটা যুক্ত থাকা। তাই নাৎসি বাহিনীর ষষ্ঠ এবং সপ্তদশ সেনাবাহিনীর সাথে দুটো ট্যাঙ্কবাহিনী মিলে মস্কোর আগে অজগরের মত গিলতে এসেছিল স্তালিনগ্রাদকে। তাদের পরিকল্পনাও ছিল তারিফ করার মত। প্রথমে নাৎসি বিমানবাহিনী এই শহরকে ভোলগা নদীর অপর প্রান্তের সমস্ত রকম অস্ত্র এবং খাদ্য সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে নদীর ওপর ক্রমাগত বোমা ফেলতে থাকে। তারপর শুরু হয় শহরের মধ্যে বোমাবর্ষণ। বিমানবাহিনী শহরের অধিকাংশ অঞ্চলকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পর সেখানে ঢুকতে থাকে নাৎসি সেনাবাহিনী, যার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন স্বয়ং ফিল্ডমার্শাল জেনারেল ফ্রেডরিখ পাউলাস। শহরের ধ্বংসস্তূপে লুকিয়ে থাকা সোভিয়েত সেনাবাহিনীর সাথে শুরু হয় নাৎসিদের ছায়াযুদ্ধ। সেই যুদ্ধের মূলে ছিল দুই পক্ষের স্নাইপারেরা তবে সোভিয়েত বাহিনীর কাজ ছিল শুধুই রক্ষণ, আরও অস্ত্র এবং সৈন্য সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত স্তালিনগ্রাদকে রক্ষা করাই ছিল তাদের প্রধান কর্তব্য। শহরের সোভিয়েত সেনারা তাই ছোট ছোট প্লেটুনে ভাগ হয়ে চালিয়ে যাচ্ছিল নাৎসিদের ওপর হানাদারি।
অবশেষে এল সেই দিন। ততদিনে নাৎসি বাহিনীর স্তালিনগ্রাদ আক্রমণের এক মাস হয়ে গিয়েছে। স্তালিনগ্রাদ পরিণত হয়েছে এক কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপে। শহরের ভিতরে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে সোভিয়েত ও নাৎসি সেনাবাহিনী। শহরের বাইরে নাৎসিদের পাহারায় ছিল রোমানিয়ার তৃতীয় এবং চতুর্থ সেনাবাহিনী, যারা অক্ষশশক্তির তরফে হিটলারের হয়ে এই লড়াই লড়তে উদ্যত হয়েছিল। দিনটা ছিল সেপ্টেম্বর ২৭, ১৯৪২। সোভিয়েত লেফটেন্যান্ট ইভান আফানাসিয়েভের অধীনে চল্লিশ জনের একটি বাহিনী ভোলগা নদীর থেকে মাত্র তিনশো মিটার দূরে অবস্থিত এক চারতলা বাড়ির ভিতর হানা দেয়। নাৎসিদের বোমাবর্ষণে বাড়িটার ক্ষতি হলেও তা তখনও বসবাসযোগ্য ছিল। লেফটেন্যান্ট আফানাসিয়েভের আদেশে সার্জেন্ট জাকভ পাভলভ এর সাথে তেইশজন সেনা মিলে প্রথম ঢোকে সে বাড়িতে। সেই দলেই ছিল আলেক্সি। আলেক্সি দাসায়েভ। রেড আর্মির আঠারো বছর বয়সী এক নব্য নিযুক্ত সৈনিক। লাথি মেরে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই তারা দেখে ভিতরে জনা দশেক মানুষ হাঁটু গেড়ে বসে তাদের দিকে করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে। সেই দলের বাচ্চা, বুড়ো, মহিলা, পুরুষ সকলেরই চোখে মুখে আতঙ্ক। তাদের অবস্থা বুঝে সার্জেন্ট পাভলভ রাইফেল নামিয়ে বলে ওঠেন,
-আমরা রেড আর্মি। আপনাদের কোনও ভয় নেই। আপনাদের সুরক্ষা দিতেই আমাদের এখানে আসা। নদীর এত কাছে এতটা উঁচু বাড়ি আর নেই। এখান থেকে শহরের বেশ অনেকটা অঞ্চলে ভাল নজর রাখা যাবে। তাই আপাতত আমরা কদিন এখানে থাকব। ঠিক আছে?
সার্জেন্ট পাভলভের কথায় সেই মানুষগুলো কোনও উত্তর দিলনা। কেবল চোখ উল্টে উপরে তাকাতে থাকল। তাদের এরকম আচরণ দেখে একটু অবাক হয়ে সার্জেন্ট আবার প্রশ্ন করলেন,

-আপনাদের ভাঁড়ার থেকে কিছু খাদ্য সামগ্রীও আমরা নেবো যতদিন না নদীর ওপার থেকে আমাদের জন্য রসদ আসছে। আপত্তি নেই তো?

এবারও তারা কোনও জবাব না দিয়ে একই ভাবে উপরের দিকে তাকিয়ে রইল। সার্জেন্ট মুহূর্তের জন্য যেন কিছু একটা ভাবলেন, তারপর কি মনে হতে হঠাৎ চোখ বড় বড় করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলেক্সিকে ফিসফিসিয়ে বললেন,

-আমাদের আগে এই বাড়িটা কব্জা করতে কিছু নাৎসি সেনা এসেছে, তবে তারা আমাদের থেকে সংখ্যায় কম তাই আক্রমণ না করে উপরের ঘরে লুকিয়েছে। তুমি এদের সাথে জোরে জোরে কথা বলতে থাকো যাতে ওদের সন্দেহ না হয়, আমি বাকিদের নিয়ে উপরে যাচ্ছি।

কথাগুলো বলেই হাত নাড়িয়ে বাকি সেনাদের ইশারা করে পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকলেন সার্জেন্ট। আলেক্সিও নির্দেশমত জোরে জোরে সেই বাড়ির মানুষগুলোকে বলতে থাকল,
-আপনাদের কোনও ভয় নেই। আমরা নিজেদের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত এই শহরকে আর আপনাদের রক্ষা করে যাব। শুধু আমরা যে কটা দিন এখানে থাকব আপনারা শুধু আমাদের কথা মেনে চলবেন। তাহলেই হবে।
এইরকম সাত পাঁচ বলতে বলতে হঠাৎ আলেক্সির কানে এল এলোপাথাড়ি গুলির শব্দ আর সেই সাথে জার্মান ভাষায় তীক্ষ্ণ চিৎকার। কিছুক্ষণ সেভাবে চলার পর হঠাৎ সার্জেন্টের গলা শুনতে পেল সে,
-পালাও, জলদি নিচে নামো সবাই!!
কথাটা শেষ হতে না হতেই হুড়মুড়িয়ে সার্জেন্টের সাথে কয়েকজনকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে চমকে উঠল আলেক্সি। তার হতবাক অবস্থা বেশিক্ষণ স্থায়ী হওয়ার আগেই উপরতলায় প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। তা শোনার সাথে সাথে মাটিতে শুয়ে মাথা নিচু করে ফেলল আলেক্সি। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কিছুক্ষণের জন্য তার মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল। নির্বিকার হয়ে মাটিতে শুয়ে রইল সে।
সম্বিৎ ফিরতে আলেক্সি দেখল তার চারপাশে সার্জেন্ট কে নিয়ে জনা সাতেক সৈনিক মাটিয়ে পড়ে রয়েছে। যদিও তাদের দেহে কোনও আঘাতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনে বাইরে অপেক্ষারত লেফটেন্যান্ট আফানাসিয়েভ ততক্ষণে বাকি প্লেটুনকে নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছেন। সার্জেন্ট পাভলভ আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন এবং ধীর পায়ে লেফটেন্যান্টের কাছে এসে বললেন,
-সাত জন নাৎসি সেনা ছিল লেফটেন্যান্ট। বাড়িটার সুবিধাজনক অবস্থান দেখে ওরাও এখানে স্কাউটিং করতে এসেছিল। আমাদের আসার আগেই ওরা উপরে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। আমি বাকিদের নিয়ে অ্যামবুশ করার চেষ্টা করলে কয়েক রাউন্ড ফায়ারিং হয়। আমাদের সাথে পেরে উঠবেনা এটা ভালমত বুঝতে পেরে ওদের একজন মডেল-২৪ এর একটা হ্যান্ড গ্রেনেড ছোঁড়ে। আমরা যারা ওই সময়ে নামতে পেরেছি তারা ছাড়া মনে হয়না আর কেউ বেঁচেছে। উপরের তলাগুলোরও প্রভূত ক্ষয় ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
লেফটেন্যান্ট সব শুনে দৃপ্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন।

-আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট নয় সার্জেন্ট। স্কাউটরা না ফিরলে ওরা আরও বড় প্লেটুন পাঠাবে, সাথে ট্যাঙ্ক বাহিনী। এখনই এই বাড়ির আশে পাশের অঞ্চলে মাইন বিছিয়ে দাও। আর দেখ বিস্ফোরণে বাড়িটার কতটা ক্ষতি হয়েছে। যে জায়গাগুলো এখনও অক্ষত রয়েছে সেখানের প্রতিটা জানলায় স্নাইপার আর বাড়ির বাইরে দুটো মেশিনগান পোষ্ট বসাও। এসব আমার আধ ঘণ্টার ভেতরে চাই। ততক্ষণ ছাদে অ্যান্টি ট্যাঙ্ক রাইফেলগুলো বসাতে আমি সাহায্য করছি।

-এখনই করছি লেফটেন্যান্ট।

সেলাম ঠুকে সার্জেন্ট বাকি সৈনিকদের নিয়ে চলে যেতে লেফটেন্যান্ট আফানাসিয়েভ আলেক্সির দিকে তাকিয়ে বললেন,

-তুমি এনাদের বাড়ির নিরাপদ কোন স্থানে রাখার ব্যাবস্থা কর আর এদের ভয় পেতে মানা কর।

-হ্যাঁ লেফটেন্যান্ট।আলেক্সি সেলাম ঠুকতেই লেফটেন্যান্ট চলে গেলেন ছাদের দিকে। আলেক্সি সেই দশজনের কাছে এসে বলল,

-অনেক ধন্যবাদ, নাৎসিদের উপস্থিতি আমাদের জানানোর জন্য।তাদের মধ্যে এক বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বলে উঠল,

-তাও তো আপনাদের এতজন প্রাণ হারালেন।

-কি করা যাবে। ইতিমধ্যে এ শহরের অধিকাংশ মানুষই প্রাণ হারিয়েছেন। স্তালিনগ্রাদ হিটলারের হাতে আমরা যেতে দেব না। তার জন্য প্রাণ যায় তো যাক। এখন বলুন ওই বাড়ির সবথেকে সুরক্ষিত জায়গাটা কোনটা।

বৃদ্ধ মাথা নাড়তে নাড়তে বলল,

-আমি আর আমার পরিবার এই বাড়িতে শরণার্থী মাত্র। এ বাড়ি হল এনার।

বৃদ্ধ আঙ্গুল তুলে দেখাল এক মধ্যবয়স্ক লোকের দিকে। লোকটি আলেক্সিকে বলল,

-এনারা সকলে আমার প্রতিবেশী। নাৎসি বিমান হানায় সকলের বাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে তাই এনারা আমার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। আমার বাড়িতে মাটির নিচে একটা ভাঁড়ারঘর রয়েছে। সেটাই মনে হয় সবথেকে সুরক্ষিত জায়গা।

-তাহলে দেরি না করে সকলে সেই ঘরে চলুন। আমাদের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত কেউ বেরোবেন না সেখান থেকে।

-যে আজ্ঞে।

দশজনকে মাটির নিচের ঘরে রাখার সমস্ত বন্দোবস্ত করে এসে আলেক্সি দেখল সার্জেন্ট ততক্ষণে প্রায় সব কাজই করে ফেলেছেন। বাড়ির আশেপাশে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে মাইন। দরজার বাইরের পাঁচিলের দুদিকে বসে গেছে দুটি মেশিনগান। দোতলা আর তিনতলার একটা অংশ বিস্ফোরণে ধ্বসে গেলেও সিঁড়িগুলো এখনও অক্ষত রয়েছে। সেই সিঁড়ি বেয়ে স্নাইপাররা উঠে সমস্ত জানলার পাশে বসে গেছে নিজেদের রাইফেল নিয়ে। সার্জেন্টকে দেখা যাচ্ছে দরজার বাইরের মেশিনগান পোষ্টগুলোকে পরিদর্শন করতে। গুটি গুটি পায়ে তার কাছে এসে দাঁড়াল আলেক্সি। সেলাম ঠুকে বলল,

-সার্জেন্ট, আমার পজিশন কি হবে?

তার দিকে না তাকিয়েই সার্জেন্ট বললেন,

-আলেক্সি দাসায়েভ। তোমার জন্য তিনতলার বাঁদিকের কোণের জানলাটা খালি রাখা আছে। পাশে রাখা আছে একটা তকারেভ স্নাইপার রাইফেল। আমি না বলা পর্যন্ত অথবা মরে না যাওয়া পর্যন্ত যেন ঐ জায়গা থেকে নড়তে না দেখি।

আলেক্সি কিছু বলার আগে ছাদ থেকে শোনা গেল এক সৈনিকের গলা। তারা দুজনে উপরে তাকাতে একজন হাসিমুখে বলল,

-সার্জেন্ট, আধঘণ্টার মধ্যেই সব সেরে ফেলেছে ছেলেরা। আমাদেরও অ্যান্টি ট্যাঙ্ক রাইফেল বসানো শেষ। এবার আসুক নাৎসির বা….
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ছেলেটির মাথাটা তরমুজের মত ফেটে গেল আর তার প্রাণহীন দেহটা চারতলার ছাদ থেকে এক লহমায় আছড়ে পড়ল মাটিতে। ছাদের ওপর থেকে ভেসে এল লেফটেন্যান্ট আফানাসিয়েভের আর্তনাদ। এই আকস্মিক ঘটনার ধাক্কায় কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর সার্জেন্ট চেঁচিয়ে উঠলেন,

-কেউ ছাদে মাথা তুলে দাঁড়াবে না। সবাই হামাগুড়ি দাও। আমরা ওদের স্নাইপারদের রেঞ্জের মধ্যেই আছি। জানলার সকল স্নাইপার তৈরি থাক। মেশিনগান পোষ্টের দুজন ছাড়া সকলে বাড়ির ভিতরে যাও।

কথাটা বলে তিনি দৌড় মারলেন ঘরের ভিতরে। আলেক্সি সার্জেন্টের কথামত গিয়ে বসল তিনতলার জানলার পাশে। কিছুক্ষণ পরে লেফটেন্যান্ট আফানাসিয়েভকে কাঁধে নিয়ে ছাদ থেকে নামলেন সার্জেন্ট পাভলভ। লেফটেন্যান্ট ভালমত জখম হয়েছেন। নাৎসি স্নাইপারের গুলি তার কাঁধ ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে। তাকে মাটিতে নামিয়ে রেখে সার্জেন্ট বললেন,
-লেফটেন্যান্ট আফানাসিয়েভ এখন যুদ্ধ করার মত অবস্থায় নেই। আমাদের জন্য রসদ এলে সেই দলের সাথে ওনাকে চিকিৎসার জন্য ফেরত পাঠানো হবে। তবে তোমরা ঘাবড়ে যেও না। লেফটেন্যান্টের পর সিনিয়র হিসাবে আমিই এখন এই প্লেটুনের ইনচার্জ। এটাই একমাত্র বদল, আর কিছুই বদলায়নি। আমরা মৃত্যুবরণ করব কিন্তু শত্রুকে স্তালিনগ্রাদের দখল নিতে দেবোনা। ফাসিস্ত পুতেরা যেন ভোলগা পারাপার করতে না পারে। ভাইসব, মার্শাল স্তালিনের নির্দেশ মনে আছে তো?
সেকথা শুনে সকলে সমস্বরে চিৎকার করে উঠেছিল,

-নি শাগু নাজাদ!!

সে সমষ্টিগত চিৎকার আজও কানে বাজে আলেক্সির। সেদিন ছিল ২৭ সে সেপ্টেম্বর আর আজ ২৫শে নভেম্বর। মাঝের দিনগুলোতে কতবার যে নাৎসিরা আক্রমণ করেছে তার হিসাব নেই। শুরুতে ওদের ট্যাঙ্কগুলো মাইনের আঘাতেই নষ্ট হয়ে যেত। যেগুলো মাইনের গণ্ডি টপকে এগিয়ে আসতো সেগুলোর জন্য ওঁত পেতে থাকত ছাদে বসানো অ্যান্টি ট্যাঙ্ক রাইফেল। উঁচুতে থাকার দরুন তারা ট্যাঙ্কের উপরের অপেক্ষাকৃত কম সুরক্ষিত অংশে আঘাত হানতে পারত। নাৎসি ট্যাঙ্কগুলোর নল অতটা উপরে উঠতনা বলে তারা পাল্টা আঘাত করতে না পেরে বিনা বাধায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধ্বংস হয়ে যেত। স্নাইপারেরা প্রত্যেকে দিনে গড়ে সাত-আটটা নাৎসি সৈন্য হেলায় মারত। প্রতিটা জানলায় ঘাপটি মেরে বসে থাকা স্নাইপার আর বাড়ির বাইরে দুটো মেশিনগান পোষ্ট থাকার দরুন নাৎসিরা বড় দল নিয়ে আক্রমণ করার সাহস দেখায় নি। তাছাড়া পুরো শহরটাই যেখানে ধ্বংসস্তূপ হয়ে রয়েছে সেখানে একসাথে বড় প্লেটুন নিয়ে হামলা করা আর লুকোনো শত্রুর হাতে নিজেদের জীবন তুলে দেওয়া একই ব্যাপার, তাই নাৎসিরা সে ভুল করেনি। এভাবে চলতে চলতে হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল অস্ত্র আর খাবার রসদের জোগাড়। জানা গেল বিশাল বড় দুটো সোভিয়েত বাহিনী নাকি আরও গুরুত্বপূর্ণ এক যুদ্ধ লড়ছে তাই খাদ্য আর অস্ত্রের টান দেখা দিয়েছে। ভোলগার ওপার থেকে নির্দেশ এসেছে আরও কদিন অপেক্ষা করতে হবে। এদিকে অস্ত্রাভাবে এক এক করে কমতে শুরু করল সেনারা। তার ফলস্বরূপ পঁচিশ জনের প্লেটুন কমে আজ মাত্র দশ জনের হয়েছে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে তাদের যাবতীয় গোলাবারুদ। নাৎসিরা এতদিনের চেষ্টার পর দখল করে নেবে এই বাড়ি। সার্জেন্টের মনের অবস্থা, যা দেখে আজ সকালে তাকে পাগল মনে হচ্ছিল তা যেন শেষ ঘণ্টায় সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করেছে আলেক্সিকে। এতসব চিন্তা উপেক্ষা করে রাইফেলের দূরবীনে চোখ রেখে সে দেখতে পেল নাৎসি সেনাদের একটা বড় প্লেটুনকে সেই বাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলে উঠল,

-সার্জেন্ট পাভলভ। মনে হয় সময় এসে গেছে। এই প্লেটুনেরই কোন এক ফ্যাসিস্তের বাচ্চার গুলিতে আমার নাম লেখা আছে। কিন্তু মরার আগে মরব না।

সার্জেন্ট রাইফেলের দূরবীন থেকে চোখ না সরিয়ে বললেন,

-শাবাশ বাঘের বাচ্চা। এই তো চাই।…….

সার্জেন্টের গলার স্বর পড়ে যেতে আলেক্সি বুঝল তিনি আবার বিড়বিড় করতে শুরু করেছেন। এদিকে সেই প্লেটুনও আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে তাই ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে প্রমাদ গুণতে থাকল আলেক্সি। প্লেটুনের মাঝের লোকটার মাথাতে লক্ষ্য স্থির করার সময় কিছু একটা চোখে পড়তে হঠাৎ বুক কেঁপে উঠল তার।

(৩)

সার্জেন্ট জাকভ পাভলভের সংজ্ঞাহীন দেহটা পড়ে রয়েছে মাটিতে। ঘরের একটা কোণায় হাঁটু মুড়ে চোখ বুজে বসে রয়েছিল আলেক্সি। তার মাথা আর কাজ করছে না। সাইবেরিয়ার সংলগ্ন তার সেই ছোট্ট গ্রাম পোকরভস্কয়কে খুব মনে পড়ছে আজ। তার ইচ্ছা ছিল সেই গ্রামেরই কিংবদন্তী গ্রিগরি রাস্পুতিনের মত যাজক হওয়ার। কিন্তু কালক্রমে তা আর হয়ে ওঠেনি। ভাগ্যের ফেরে নাম লেখাতে হয় সোভিয়েত সেনাবাহিনীতে আর অনিচ্ছা সত্ত্বেও জড়িয়ে পড়তে হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাথে। শেষ কয়েকমাসে একবারও অন্যকিছু মনে পড়েনি আলেক্সির, আজ হঠাৎ করে তাই গ্রামের কথা মনে পড়াতে সে নিজেও একটু অবাক হল। সেই গ্রামে পশুপালন করে আর বরফে ঢেকে যাওয়া জলাশয়ে গর্ত করে মাছ ধরেই আনন্দে কাটত তার জীবন। গ্রামের ঠিক মাঝখানেই একটা বড় মাঠ ছিল, যেটা প্রায় সারাবছরই ভরা থাকত দুধ সাদা বরফের কুঁচিতে। তার ওপর দিয়েই কুকুরে টানা স্লেজে চড়ে যেতে হত দূরের জঙ্গলে কাঠ কাটতে। সেই কাঠেই জ্বলত তাদের বাড়ির চুল্লী আর সেই আগুনেই রান্না হত তার প্রিয় কালাচ রুটি। সন্ধ্যা নামলে গ্রামের সকলে দলবেঁধে ভিড় করত সাদা রঙের কাঠের তৈরি ছোট্ট একটা গির্জাতে। সেখানে সারা গ্রাম একসাথে মিলে প্রার্থনা করত।
উৎসবের সময়ে গ্রামের মেয়েরা হাত ধরাধরি করে লোকগান গাইত আর আলেক্সি গির্জার দরজার সামনে বসে ব্যালালাইকা বাজিয়ে গায়কবৃন্দের যোগ্য সঙ্গত দিত। তার বড় আপন ছিল সেই গির্জা। মার্শাল স্তালিনের আদেশে সেটা যেদিন গুঁড়িয়ে দেওয়া হল সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিল আলেক্সি। সারাদিন ধরে বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছিল। শেষে রাতের বেলা মা গরম গরম খরগোশের স্যুপ এনে নিজে হাতে খাইয়ে দিয়েছিল আর মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল। মায়ের কথা মনে পড়তেই কেঁপে উঠে চোখ খুলল আলেক্সি। তার সামনে তখন দাঁড়িয়েছিল লেফটেন্যান্ট ভাসিলি চুকভ।

-কি প্রাইভেট? ভয় করছে?

আলেক্সির চোখ-মুখের অবস্থা দেখে লেফটেন্যান্ট চুকভ বললেন,

-ভয় নেই। নিজের কমান্ডিং অফিসারের উপর চড়াও হয়েছ বলে তোমাকে কোর্ট মার্শাল করা হবেনা। যেটা করেছ সেটা একেবারে ঠিক করেছ। নাহলে সার্জেন্ট পাভলভ একাই আজ আমাদের শেষ করে দিতেন।

আলেক্সি উঠে দাঁড়িয়ে লেফটেন্যান্টকে সেলাম ঠুকে বলল,

-আমিও প্রথমে বুঝতে পারিনি যে ওটা রেড আর্মির প্লেটুন। যখন বুঝতে পারি ততক্ষণে সার্জেন্ট দুজনের ওপর গুলি চালিয়ে দিয়েছেন। আমি তাকে বোঝাতে গেলে আরও দেরি হয়ে যেত তাই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পরে যখন বুঝি যে ওনাকে কাবু করতে পারব না তখন বাধ্য হয়ে রাইফেলের বাঁট দিয়ে ওনার মাথার পিছনে আঘাত করে ওনাকে অজ্ঞান করে দি। উনি আজ সকাল থেকেই কেমন যেন উন্মাদের মত ব্যাবহার করছিলেন।

-জানি প্রাইভেট। ওনাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। যেভাবে উনি তোমাদের এই সামান্য কয়েকজনকে নিয়ে এই বাড়ির দখল রেখে দিয়েছিলেন তা সত্যিই অভাবনীয়। তোমাদের এই মজবুত রক্ষণের কারণেই মার্শাল স্তালিন প্রতিআক্রমণ করার হিম্মত দেখিয়েছেন। ওনার নির্দেশে জেনারেল জর্জি জুকভ স্তালিনগ্রাদের দুই প্রান্ত থেকে দুই বিশাল বাহিনী নিয়ে নাৎসিদের পাহারারত রোমানিয়ান বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই দুমাস ধরে তাদের খতম করে আমরা আস্তে আস্তে স্তালিনগ্রাদের দিকে অগ্রসর হই। শহরের ভিতরে আর যে কটা নাৎসি বাহিনী রয়েছে তাদেরকে আমরা সাপ্লাই লাইন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। এখন শীতকাল এসে গেছে, আর চিন্তা নেই। নাৎসিদের এইরকম কড়া ঠাণ্ডা সহ্য করার ক্ষমতা নেই। এবারে শুধু কলে পড়া নোংরা ইঁদুর গুলোকে খুঁজে খুঁজে নিকেশ করতে হবে। তাহলেই আমরা স্তালিনগ্রাদ পুনর্দখল করব।

-খুব ভাল খবর লেফটেন্যান্ট। তাহলে এখন আমাদের কাজ কি?

-কোনও কাজ নেই।

-মানে?

-মানে তোমরা মস্কোতে বিখ্যাত হয়ে গেছ হে। এবার সবাই মিলে বাড়ি যাও। বাকিটা আমরা সামলে নেব।

-বিখ্যাত?

অবাক হয়ে প্রশ্ন করল আলেক্সি।

-হ্যাঁ, তা নয়ত কি? তোমরা যত দিন ধরে ভোলগা নদীর এই পারটাকে রক্ষা করলে ততদিন গোটা ফ্রান্স দেশটা নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি নাৎসিদের থেকে। টানা আটান্ন দিন। ভাবতে পারছ?

আলেক্সি লেফটেন্যান্টের কথার কোনও উত্তর দিলনা। লেফটেন্যান্ট একমুখ হাসি নিয়ে বললেন,

-আমরা আসার পথে যে নাৎসি ঘাঁটিটা উড়িয়ে এলাম সেখানে ওদের ম্যাপে এই বাড়িটাকে ওরা সোভিয়েত দুর্গ হিসাবে চিহ্নিত করে রেখেছে। সেই ম্যাপ দেখে গর্বে আমার বুকটা ভরে গেল প্রাইভেট। সত্যিই তোমরা অসাধ্য সাধন করেছ। যাও যাও নিচে তোমাদের জন্য ট্রাক অপেক্ষা করছে। অনেক লড়েছ এবার বাড়ি যাও।

লেফটেন্যান্ট চলে যেতে আস্তে আস্তে নিচে নামল আলেক্সি। ততক্ষণে পুরো বাড়িটার দখল নিয়ে নিয়েছে লেফটেন্যান্ট চুকভের প্লেটুন। আলেক্সি চেয়ে দেখল ট্রাকে উঠে পড়েছে তার সঙ্গীরা। ট্রাকে তোলা হয়েছে সেই বাড়ির দশজন শরণার্থীদেরও। তাদের পাশে স্ট্রেচারে করে রাখা হয়েছে সার্জেন্ট পাভলভকে। সেই মানুষটার জন্য সম্মানে বুকটা ভরে উঠল আলেক্সির। উনি যেভাবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন তা সত্যিই ভাবা যায় না। বাড়িটাকে শেষবারের মত একবার দেখে নিয়ে গুটি গুটি পায়ে ট্রাকে উঠতে গেল আলেক্সি।
ট্রাকে ওঠার পা-দানিতে পা রেখেও হঠাৎ কোন এক অজানা কারণে থেমে গেল সে। তা দেখে ট্রাকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোকরা ড্রাইভারটা প্রশ্ন করল,

-কি হল প্রাইভেট?

সে প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে কি যেন একটা ভাবতে থাকল আলেক্সি। ছোকরা আবার বলল,

-প্রাইভেট? গাড়িতে উঠুন।

এবার তার দিকে একবার ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আলেক্সি ছুট লাগাল বাড়িটার দিকে। ছোকরা ঘাবড়ে গিয়ে চেঁচাতে থাকল,

-একি? কোথায় যাচ্ছেন প্রাইভেট? আপনাকে মস্কো নিয়ে যাওয়ার আদেশ আছে আমার কাছে। দোহাই আপনাকে, ফিরে আসুন।
তার ডাকের তোয়াক্কা না করে আলেক্সি সোজা ছুটে গেল বাড়ির ভিতরে লেফটেন্যান্ট চুকভের কাছে। তিনি তখন একতলার ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া সোফাটার এক কোণে বসে সবে একটা সিগারেট ধরিয়েছিলেন। আলেক্সিকে দেখে তিনি যারপরনাই অবাক হয়ে গিয়ে বললেন,

-কি হল? ফিরে এলে কেন?

আলেক্সি কোন উত্তর দিল না দেখে তিনি আবার বললেন,

-আরে জলদি যাও। তোমরা মস্কো না গেলে মার্শাল স্তালিন আমার গর্দান নেবেন।

-ওরা যাক।

শান্ত হয়ে জবাব দিল আলেক্সি।

-মানে? তুমি যাবেনা? কেন?

-লেফটেন্যান্ট,একটা সময় ছিল যখন রক্ত দেখলে আমার গা গুলিয়ে উঠত,অনেক সময় থাকতে না পেরে বমি করে ফেলতাম। আর আজ সেই আমি শত্রুর ছিতরে যাওয়া মাথা না দেখে শান্তি পাই না। রাতে ঘুমানোর আগে ঐ লাশগুলোর কথা না ভাবলে আমার ঘুম আসেনা জানেন?

-কি বলতে চাইছ তুমি?

-এটাই, যে কয়েক বছর আগেও আমি খুব ভাল ব্যালালাইকা বাজাতাম। লিদিয়া রুসলানোভার সব গানের স্বরলিপি আমার মুখস্ত ছিল, কিন্তু কিকরে জানিনা এখন আমার এই দুই হাত ব্যালালাইকার বদলে রাইফেল ধরতে বেশি পছন্দ করে ফেলেছে। আমার মাথা থেকে সেই সমস্ত লোকগানের সুর চিরতরে মুছে গেছে লেফটেন্যান্ট । এখন গুলির শব্দ আর মানুষের চিৎকার ছাড়া আর কিছুই বাজে না আমার কানে।

কথাগুলো বলে লেফটেন্যান্ট চুকভের আরও কাছে এসে দাঁড়াল আলেক্সি। বরফশীতল এক চাহনিতে লেফটেন্যান্টের চোখের দিকে নীরবে চেয়ে রইল সে। লেফটেন্যান্ট কি বলবেন বুঝতে পারছিলেন না। সেই ভাঙ্গা ঘরে ঘুরপাক খেতে থাকল এক অদ্ভুত নীরবতা। কিছুক্ষণ পরে সে নীরবতা ভেঙ্গে আলেক্সি ভারি গলায় বলে উঠল,

-আমিতো নিজে থেকে এই জীবন চাইনি লেফটেন্যান্ট। মার্শাল স্তালিনের এক পদক্ষেপই আমাকে এই জীবনে এনে ফেলেছে, আর আজ আমি যখন এই জীবনটাকে ভালবেসে ফেলেছি তখন আবার ওনারই নির্দেশে এটাকে ছেড়ে যেতে পারব না। এটা আমার নিজেরই থাক। আমাকে ক্ষমা করবেন।

আলেক্সির কথাগুলো শুনে লেফটেন্যান্ট চুকভের কপালে অনেকগুলো ভাঁজ দেখা দিল। গম্ভীর গলায় তিনি আলেক্সিকে প্রশ্ন করলেন,
-মার্শাল স্তালিনের আদেশ অমান্য করার মানে জানো?

এক ম্লান হাসির আড়ালে আলেক্সি উত্তর দিল,

-আমিতো ওনার আদেশ অমান্য করছি না। উনিই তো বলেছেন ‘নি শাগু নাজাদ’ তাই ওনার আদেশ মেনে একপাও পিছু হটব না আমি। আমার আর পিছু ফিরে যাওয়ার কোনও জায়গা নেই লেফটেন্যান্ট।

কথাটা বলার পর মাটি থেকে একটা তকারেভ স্নাইপার রাইফেল তুলে নিয়ে আলেক্সি সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল তিনতলায়। লেফটেন্যান্ট চুকভ অবাক হয়ে দেখতে থাকলেন তাকে। এদিকে তার আঙ্গুলের সিগারেট পুড়ে প্রায় শেষ হওয়ার দিকে।

*****************************************************

ছবিতেঃ-সার্জেন্ট জাকুব পাভলভ এবং স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের সেই “Pavlov’s House”

 

Facebook Comments
শেয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *