গল্প : একটা জার্মান লোকগাথা এবং কয়েকটা ঘটনা

একটা জার্মান লোকগাথা এবং কয়েকটা ঘটনা / শুভময় দে

জার্মান বেড়াতে গেছেন লেখক টোয়েন। মার্ক টোয়েন। বিভিন্ন গ্রাম, গঞ্জ, শহর ঘুরে লিপিবদ্ধ করছেন পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা। সাথে নিজের মনমতো স্কেচ। ফোটোগ্রাফি আসতে তখনও বেশ কিছু দশক দেরী আছে। রাইন নদীর ওপর দিয়ে একটা বোটে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হচ্ছেন। অপরূপ সুন্দর এই রাইন। পরিস্কার নীল আকাশ। চারপাশে উঁচু-নিচু, মাঝারি, বেশ উঁচু টিলা। ঘন সবুজ। সুন্দর রঙ এই রাইনের জলের। চারপাশে মাঝে মাঝেই বিভিন্ন দুর্গ। বেশীরভাগই মধ্যযুগের, প্রত্যেকটিরই সুনির্দিষ্ট ইতিহাস আছে।

বোটচালক হঠাৎই একটা ছোট দুর্গ দেখিয়ে বললেন একসময় জায়গাটা খুবই অপয়া ছিল। আশপাশের গ্রামের চাষী, মেষপালকেরা একরকম এড়িয়ে চলত এই জায়গাটা। প্রত্যেক রাতে সুরেলা কন্ঠে এক কিশোরীর সুর ভেসে আসত।

সৌনেত্র লাইব্রেরী থেকে টোয়েনের এই ট্রাভেলগটা পড়তে শুরু করেছে। আজ রবিবার, ইউনিভার্সিটি বন্ধ। পাশের বড় বসার ঘরে সুরমিতা এবং ছাত্র-ছাত্রীরা। সুরমিতা সঙ্গীতে রিসার্চ করছে। সুগায়িকা। ক্লাসিকাল। প্রচুর ছাত্রছাত্রীরা রোজই আসে। রবিবারের দলটা সবচেয়ে বড়। সৌনেত্রর ক্লাসিকাল সঙ্গীত শোনার অভ্যেস এবং ভাললাগা কোনোটাই নেই। এর পেছনে একটা পারিবারিক কারণও অবশ্য আছে। সুরমিতার মা একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান প্রায় পঁচিশ বছর আগে। সুরমিতার বাবা শৌর্য আরেকটি বিবাহ করেন। গার্গীদেবী তার সন্তান সৌনেত্রকে, বরাবরই দিদির সাথে সেভাবে মিশতে দেননি। এক বাড়িতে থাকলেও কারণগুলো হয়ত উল্লেখযোগ্য নয়। সৌনেত্র এখন ইংরেজী সাহিত্যের এক গুণী ছাত্র। সুরমিতার এক ছাত্রী মালকোশ রাগে একটা গান ধরেছে।

কয়েক শতক আগের ঘটনা। লোকমুখে প্রচারিত। রাইনের ধারে এক বিরাট অঞ্চলের এক ব্যারন বা জমিদার একমাত্র সুন্দরী মেয়ের বিয়ে দিতে চান সমকক্ষীয় কোন ব্যারন বা নাইটপুত্রের সাথে। অনেকেই ইচ্ছুক, একমাত্র কিশোরী মেয়েটি ছাড়া। মেয়েটির পছন্দ এক সাধারণ সৈনিক। এর প্রতিক্রিয়ায় কিশোরী মেয়েটি বিরাট প্রাসাদের একটি ঘরে সুব্যবস্থায় বন্দী। তার সুরেলা সুর প্রত্যেকদিন উঁচুতলার জানলা বেয়ে নীচে বাগানে চাকর, ভৃত্যদের কান অবধি পৌঁছায়। একদিন হঠাৎই মেয়েটি অভিমানের তাড়নায় বাড়ি ছাড়ে।

এই অবধি পড়ে সৌনেত্র উঠে এক গ্লাস জল খায়। পাশের ঘর থেকে মালকোশ রাগে গলাটা এখনও ভেসে আসছে।

রাইনের শেয়ার বোটম্যানের দেখানো ভাঙা দুর্গে আশ্রয় নেয় কিশোরীটি। সারা অঞ্চল খুঁজে বেড়ান মেয়ের বাবা। মেয়েটি প্রতি রাতে একই সুরে গান গাইতে থাকে। জ্যোৎস্না ভেজা রাইনে সেই সুর উপত্যকাময় হয়ে ওঠে। অর্থবান পিতা ঘোষণা করেন, মেয়ে ফিরে এলে মেয়ের পছন্দের পাত্রের সাথেই বিয়ে দেবেন। স্বাভাবিকভাবেই, এই খবর মেয়ে অবধি পৌঁছয় না। মেয়ের মনে তখন দৃঢ় বিশ্বাস তার গানের পরিবর্তে গ্রামের চাষীরা তাকে ডাইনী ভেবে যদি লোকমুখে কুসংস্কারবশে এই গানের কথা প্রচার করে, তাহলে তার প্রেমিকের কানেও পৌঁছবে সেই কথা। এইভাবে প্রতিরাত, মাস, বছর ধরে প্রায় পাঁচ বছর চলতে থাকে।

সৌনেত্র মাত্র একবারই সুরমিতার প্রোগ্রাম দেখতে গেছে। বিশেষ অনুরোধে। বিশেষ দাগ কাটেনি। মাস দুয়েক আগের এক পৌষের সন্ধ্যে। বিশেষ দাগ কাটেনি বলাটা হয়ত পুরো সঠিক বলা হল না। মূল অনুষ্ঠান দাগ না কাটলেও, চারটে রো সামনে বসা, গোল খোপা, শান্ত চাহনী, সাদা-কালো শাড়ি, কালো ব্লাউজ, মাটির কাজ করা গয়না, দুল, পরিমিত মেক-আপ করা মুখে, একটা ছোট কালো টিপ অবশ্যই কিছুটা দাগ কেটেছিল। কথা বলা তো অনেক দূর হস্ত, কথা শোনারও সুযোগ হয়নি সেদিন। তারপর বেশ কিছুদিন সাদা-কালো রেশ, সৌনেত্রর বাড়ি, কলেজ, ক্যান্টিন, মিনিবাস, অটো, মেট্রো, শপিং মল, শোবার ঘর, প্রফেসর বাগচীর ক্লাসে ঘোরাফেরা করেছিল।

কিশোরী মেয়েটির সেই প্রেমিক বেশ কিছু যুদ্ধ জয় করে সেনাপতি পদে উন্নীত। নাইট। বিপুল সুসজ্জিত দরবারে তার আমন্ত্রণ। যেকোন  চাহিদা পূরণের সামর্থ্য তার রয়েছে। কিন্তু একটা গভীর ক্ষতর মত সেই কিশোরী মেয়েটি এবং সুরেলা সুর সে আজও মনে রেখে চলেছে। বলাবাহুল্য, ক্ষত সারেনি, বরং গভীরতর হয়েছে। ইতিমধ্যে গ্রামের চাষীদের মুখে সেই সুরেলা সুর একটা দৃঢ় কুসংস্কারে পরিণত হয়েছে। তাদের বিশ্বাস, এই সুর যাএর কান অবধি পৌঁছেছে, ঘোর বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের। অগত্যা তারা নাইট সেনাপতিকে আবেদন জানালো, এই ডাইনীর হাত থেকে তাদের রক্ষা করার। বাড়তি উপদেশ রইল, সেই গান যেন সেনাপতির কান অবধি না পৌঁছায়, অন্যথা ঘোর বিপদ।

নাইট সম্মতি জানালেন এবং তুলো দিয়ে কান ঢেকে যাওয়ার মনস্থির করলেন। ঘটনাচক্রে এক পূর্ণিমার রাতই স্থির হল। রূপালী আলোয় ফুটে উঠেছে রাইন। ধীরে ধীরে সেই পুরোনো দুর্গের দিকে বয়ে চলেছে সেনাপতির নৌকা। নির্দেশমত কানে তুলো, হাতে ছোট তলোয়ার। নৌকা ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। জ্যোৎস্নার আলোয় মোটামুটি অনেক দূর অবধি দেখা যায়। একটা বিশেষ জায়গায় নৌকা থামল। নাইট খুঁজতে বেড়ালো সেই ডাইনীকে। কিছুদূর যেতেই সাদা পোশাকের এক অবয়ব চোখে পড়ল। নাইট স্থির হল। আঘাত। লুটিয়ে পড়ল কিশোরী। তখনও গলায় গান। কান থেকে তুলো ফেললেন সেনাপতি। গানের কিছুটা অংশ শুনলেন। দিশাহারা হয়ে ছুটলেন সাদা অবয়বের দিকে। অনেক দেরী হয়ে গেছে।

সৌনেত্র হঠাৎ উত্তেজিত বোধ করল। মালকোশের কন্ঠ দেখার তাড়না তৈরী হচ্ছে মনে। সাদা কালো আবেশটা যেন আবার ঘিরে ধরছে। বই বন্ধ। পাশের দরজা খোলা। সরাসরিই তাকাবে স্থির করল। উঠে দাঁড়াল । এগিয়ে চলল পাশের ঘরের দরজার দিকে।

 

Facebook Comments
শেয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *