গল্প : একটি বড়দের রূপকথা

 

একটি বড়দের রূপকথা:  প্রকল্প ভট্টাচার্য

এক দেশে এক রাজা ছিল।  ওই যেমন থাকে আর কি।  তার ছিল দুই রানী, বিয়েরানী আর পি.এ. রানী।  বিয়েরানী থাকত রাজার সাতমহলা প্রাসাদে, তার গাড়িশালে গাড়ী, শাড়িশালে শাড়ী, কিছুরই অভাব ছিল না। তবু তার মন খারাপ থাকত সবসময়, কারণ রাজা প্রায়দিনই অফিসেই থেকে যেতেন পি.এ.রানীর সঙ্গে।
কোনো নতুন বাণিজ্য থেকে রাজার যখনই মুনাফা আসতো, পি.এ.রানীর নতুন গয়না গড়ানো হতো, দামী আইফোন কেনা হোত, কিন্তু তার মন ছিল এমন প্যাঁচালো, সে সারাক্ষন হিংসে করতো বিয়েরানীকেই। আর রাজাকে গালমন্দ করতো।

যথাকালে বিয়েরানীর কোল আলো করে জন্মালো এক ফুটফুটে সুন্দরী রাজকন্যা, আর পি.এ.রানীর মুখ অন্ধকার করে জন্মালো এক কুচুটে ছেলে।  মেয়েকে দেখে সবাই বলল, “আহা, যেমন সুন্দরী মা, তার তেমনি সুন্দরী মেয়ে হয়েছে!” ছেলেকে দেখিয়ে পি.এ.রানীই সকলকে বলে বেড়ালো, “হবে না! যেমন কুচ্ছিত বাপ্, তেমনি কুচ্ছিত ছেলে হয়েছে!”

রাজার কষ্ট হলো, কিন্তু রাজাদের কষ্ট পেতে নেই, তাই আবার মুখে হাসি এনে ব্যবসা বাণিজ্যে মন দিল।

রাজকন্যা বড় হয়ে নামকরা এক স্কুলে ভর্তি হলো।  খবর পেয়ে পি.এ.রানী জেদ ধরলো, তার ছেলেকেও একই স্কুলে পড়াতে হবে।  রাজা পড়লো বিপদে, কিন্তু কোনো উপায় না দেখে তাতেই রাজী হলো।  কন্যা যেমন রূপসী তেমন বুদ্ধিমতী, ক্লাসে প্রতিবার ফার্স্ট হতে লাগলো।  আর ছেলেটা অগা বগাদের সঙ্গে মিশে ফেল করতো। তার জন্য তার নিজের বা তার মায়ের কোনো চিন্তা ছিল না, কারণ তারা জানতো যে রাজার ছেলেকে ক্লাসে প্রমোশন দিতেই হবে! হতোও তাই!

একবার হলো কি, পেরেন্টস-টিচার্স মিটিং, আর দুই মায়েরই শরীর খারাপ। অগত্যা রাজাকেই যেতে হলো স্কুলে । প্রথমে আলাদা ডাক পড়লো ছেলের বাবা হিসেবে।  সব শিক্ষকরা একযোগে জানালেন, বড়োলোকের বিগড়ে যাওয়া সন্তান, ওকে সিধে করা যাবে না।  বাবা-র প্রশ্রয় আর অবহেলার ফলেই আজ ছেলেটার এমন দুর্গতি, প্রধান শিক্ষক সেটাও জানিয়ে দিলেন।  রাজামশাই মুখ নীচু করে শুনলেন সব।  তারপর পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। সকলের সামনে সেরা ছাত্রীর পুরস্কার নিতে রাজকন্যার ডাক পড়লো।  তাকে জিজ্ঞেস করা হলো তার সাফল্যের রহস্য কি, সে বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে বলল, “আমার বাবা!” বাবা-কে মঞ্চে ডাকা হতে রাজামশাইকে আবার সবার সামনে আসতে হলো, এবার সমস্ত শিক্ষকেরা মুখ লুকোলেন লজ্জায়।
এইভাবেই দিন কাটে, মাস যায়, বছর ঘোরে।  বুড়ো হয়ে রাজা একদিন মারা গেলেন, বিয়ে রাণী কেঁদে কেঁদে চোখদুটো জবাফুল বানালো।  রাজার ফেসবুক পেজ ভরে গেলো ‘রিপ’-এর মেসেজে, হিংসেয় জ্বলে পুড়ে পি.এ. রানীও গেল মারা।  এদিকে রাজকন্যা ভাল চাকরি পেল, আর রাজপুত্র  হয়ে উঠল নামকরা মস্তান।  কথায় কথায় বলে, ‘জানিস, আমি কার ছেলে!’

একই পাড়ায় থাকতো সারিকা, সে খুব ভালবাসতো ওই গুন্ডা রাজপুত্রকে।  কিন্তু বলতে ভয় পেত।  তার ভাই শুকদেব আবার ছিল রাজকন্যার অফিস কলিগ, একে অন্যকে পছন্দও করত। এদিকে রাজার মারা যাওয়ার পর থেকে মন্ত্রীর ক্ষমতা গেল বেড়ে, তার ছেলে ধরাকে সরা জ্ঞান করতো। রাজকন্যার রূপ গুনের খবর পেয়ে সে উঠে পড়ে লাগলো  তাকে বিয়ে করবে বলে।  মন্ত্রী স্বয়ং এলো বিয়েরানীর বাড়ি, হাবেভাবে বুঝিয়ে দিলো পরদিনই মেয়ের বিয়ে নিজের ছেলের সঙ্গে  না দিলে ওদের সমূহ বিপদ।  বিয়েরানী আর কি করে, সম্মত হলো। রাজকন্যা আর থাকতে না পেরে জানালো শুকদেবকে, শুকদেব জানালো সারিকাকে, সারিকা হোয়াটস্যাপ করে রাজপুত্রকে জানালো।

রাজপুত্র মেসেজ করে জানতে চাইলো, “তুমি কি নিশ্চিত যে রাজকন্যার এই বিয়েতে মত নেই?”

উত্তর এলো, “নিশ্চিত।  রাজকন্যা শুকদেবকেই ভালোবাসে। ”

-“কী করে বুঝলে?”

-“মেয়েরা মেয়েদের মন ঠিক বোঝে। আর তুমি যে মেয়েদের মন একেবারেই বোঝো না, সেটাও জানি। ”

-“তাই নাকি! কী বুঝি না আমি?”

-“সেটাও বলে দিতে হবে! হায় রে! থাক তাহলে!” এই বলে লাল গাল এর ব্লাশ করা ইমোজি পাঠালো সারিকা।

রাজপুত্র কী বুঝলো কে জানে, কিন্তু শুকদেবকে ফোন করে, নিজের সঙ্গীপাঙ্গদের নিয়ে সোজা চড়াও হলো মন্ত্রীর বাড়ি।  সেখানে বিয়ের সব প্রস্তুতি চলছিল, তার মধ্যেই ধুন্ধুমার বাধলো।  যেমনটা হয় আর কি, প্রথমে ক্যালাকেলি, তারপর কোলাকুলি… হ্যাঁ  সারিকাও এসে জুটেছিল।  হ্যাপি এন্ডিং-এর বাকিটা নিশ্চিত করতে শুকদেব আর রাজকন্যাকে নিয়ে রাজপুত্র আর সারিকা যেই এসে পৌঁছল বিয়েরানীর বাড়ি, বিয়েরানী দুই জুটিকেই বরণ করে ঘরে তুললেন।  রাজপুত্র তারপর বলল, “মা, তাহলে আমায় বিদায় দিন!” বিয়ে রানী বললেন, “বাছা, তোমারও যেমন কেউ নেই, আমাদেরও কেউ নেই। কোথায় আর যাবে, এখানেই থাকো, তোমার বাবার ব্যবসাটা তুমিই সামলাতে পারবে।  হাজার হোক, রাজপুত্র তো তুমি!”  রাজপুত্র রাজী হলো, সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলো!

ব্যস, আর কি! আমার কথাটি ফুরোয়িং, নট এ গাছ ইস মুড়োইং !!

Facebook Comments
শেয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *