গদ্য: অন্ধ গলি

 

অন্ধ গলি : বিশ্বদীপ দে

একটা অন্ধকার গলির ভিতর দিয়ে আমরা হাঁটছিলাম। মনে পড়ে তোমার? আর কেউ ছিল না আশপাশে। একেবারে নির্জন একটা গলি। তুমি আর আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম। আর তখনই ফোনটা বেজে উঠেছিল।

ফোন মানে মোবাইল নয়। ল্যান্ডলাইন। তখনও মোবাইল যুগ শুরু হয়নি পুরোপুরি। গলির দু’পাশের যে বাড়িগুলো, তারই কোনও একটায় ফোনটা বাজছিল। একটানা। কেউ ধরেনি। ওই বাড়িটায় কি সেই সময়ে কেউ ছিল না? হয়তো। থাকলে নিশ্চয়ই  ধরত।

ওই নিশ্চুপ গ‌লিটার ভিতরে কেবল একটাই শব্দ ছিল ফোনটা বাজার। আর কোনও শব্দ ছিল না। এমনকী, আমরাও… হ্যাঁ, আমরাও একদম চুপ করে হাঁটছিলাম। একটা বাড়ির জানলার রঙিন পর্দা কী এক অলৌকিক নির্দেশে উড়ছিল। ফোনটা কি ওখানেই বাজছিল! আমি কৌতূহলে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। কিছুক্ষণ, মানে বড়জোর ১০ সেকেন্ড। তুমি আলতো ধমক দিয়েছিলে, ‘‘কী হল, দাঁড়ালে কেন। দেরি হয়ে যাচ্ছে না!’’

তোমার তখন বাড়ি ফেরার তাড়া। না হলে বাড়িতে চিন্তা করবে। আর কথা বাড়াইনি। খুব দ্রুত গলিটা পেরিয়ে যেতে পা বাড়িয়েছিলাম। তার পর বুঝতে পেরেছিলাম… কী বুঝতে পেরেছিলাম?

বলছি, দেখি তোমার নিজের থেকে মনে পড়ে কি না।

 

আজ এতদিন পরে সেই সন্ধেটার কথা কেন বললাম, জানো? তার আগে একটা অন্য কথা ব‌লি। সেই সময়টা ছিল হেমন্তকাল। এটা আমার মনে আছে। আসলে প্রতিবারই হেমন্তকাল এলে আমার মনে পড়ত। এখনও পড়ে। এই হেমন্তরই এক রোদ্দুর থইথই সকালবেলায় আমি প্রথম মৃত্যু দেখেছিলাম। মৃত্যু ঠিক নয়, মৃতদেহ। আমার দাদুর। উনি ভোরবেলাতেই মারা গিয়েছিলেন। তখন তাঁর দেহটা হাসপাতাল থেকে সবে মামাবাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সকলে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল। আমাকে কেউ একজন নিয়ে এল। বল‌ল, ‘‘প্রণাম করো।’’ কে বলেছিল, সেটা মনে নেই। প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। ক্লাস টুতে পড়ি। স্মৃতি স্বভাবতই ফিকে। মা বলতে পারে। কিংবা বড়মামা। বা অন্য কেউ। যেই বলুক, তাঁর কথা শুনে আমি এসে দাঁড়িয়েছিলাম দাদুর সামনে। এক হেমন্তের সকালে।

জীবনে সেই প্রথম আমি বিষণ্ণতাকে ছুঁয়েছিলাম। চারদিকে রোদ, মিঠে হাওয়া। তার সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান একটি মৃতদেহ। মুখটা হাঁ করা। সেই হাঁ মুখের ভিতরের অন্ধকার ওই রোদ্দুরের মধ্যে আরও প্রকট হয়ে উঠছিল। ওই বয়সে কেউ অত গুছিয়ে ভাবতে পারে না। এগুলো আমি পরে ভেবেছি। কিন্তু অনুভূতিটা একেবারে তখনকার। চারপাশের সুন্দরের মধ্যে বিষণ্ণতার একটা অন্ধকার কুয়োর ভিতরে কেউ আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

যে সকালের কথা বললাম, সেদিনই বিকেলবেলা। মামাবাড়ির উঠোনে ঠিক যে জায়গাটায় দাদুর শবদেহ রাখা হয়েছিল, সন্ধে হতেই সেখানে ধুপ আর মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হল। আমার খুব অবাক লেগেছিল। যেখানে রাখা ছিল শবদেহটি, সেখানে তখন কিচ্ছু নেই। ফাঁকা। তবু ওই শূন্যস্থানের সামনেই নির্জন মোমবাতি আর ধুপ রাখা হয়েছিল। পাশেই বিরাট একটা কাঁঠাল গাছ ছিল। সেই গাছের অন্ধকার ছায়ায় জায়গাটা অন্য রকম হয়ে উঠেছিল। সন্ধের পেটের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছিল গুঁড়ো গুঁড়ো বিষণ্ণতা। আর তা হাওয়ায় উড়ে এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছিল।

ওই ঘটনার পরই আমি জ্বরে পড়ি। ধুম জ্বর। একশো তিন-চার। প্রায় মাসখানেক অসুখে ভোগার পরে তবে সেরে উঠি। ততদিনে ঘোর শীত নেমে গেছে। সেই থেকে হেমন্ত এলেই আমি তটস্থ থাকতাম। বুঝি নতুন করে কোনও বিষণ্ণতা আবার আমাকে টেনে নেবে তার ভিতরে। এমন নয় আমি ছোটবেলায় খুব বিষণ্ণ থাকতাম। হইহই আনন্দের ভিতরেই কেটেছে সেই সময়টা, অন্যদের মতো। কিন্তু এরই মাঝে ওই বিষণ্ণতা, তাকে আমি খুব ভয় করতাম।

 

সেই ছোটবেলা থেকেই হেমন্ত আমার ভিতরে এ ভাবেই পুঁতেছিল বিষণ্ণতার বীজ। আর তাই এক নির্জন গলির ভিতরে ফোন বাজার শব্দ শুনে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। হয়তো সময়টা হেমন্তকাল বলেই।

সময় কেবলই চলে যায়। দাঁড়ায় না। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে সময় জিনিসটাকে মানুষ এতদিন বুঝতেই পারেনি। সময় একটা মাত্রা। যেমন দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা— ঠিক তেমনই সময়। জগতের চতুর্থ মাত্রা। টাইম আর স্পেসকে একত্র করে এর নাম দেওয়া হয়েছে স্পেসটাইম। আর সেই কারণেই টাইম ট্র্যাভেল নিয়েও কত রকম আইডিয়ার জন্ম হয়েছে।

টাইম ট্র্যাভেল। সময়ের সরণি ধরে এদিক সেদিক যাওয়া। কেমন করে সেটা সম্ভব, সে সব অনেক জটিল ব্যাপার। কিন্তু যদি সেটা সম্ভব হয়, তা হলে সুদূর ভবিষ্যতের পৃথিবীতে যাওয়া সম্ভব হবে। কিংবা ঘটে যাওয়া জীবনের আলো-আঁধারিতে নতুন করে চোখ মেলতে পারব। সময় নামের জেদি ঘোড়ার জিনটাকে চেপে ধরে তার মুখটাকে পিছনদিকে ফেরালেই হু হু করে সব ফেলে আসা ছবি আবারও দেখতে পাওয়া যাবে! হতেই পারে। কেউ কেউ বলছেন।

কিন্তু আমি তো ফিরে পেতে চাই না সবকিছু। প্রতিটি বিষণ্ণতাতেই আমার হেমন্তকালের কথা মনে পড়ে। প্রতিটি হেমন্তকালেই আমি বিষণ্ণতাকে ফিরে পাই। হেমন্ত তাই না ফিরলেই ভাল ছিল।

 

আবার একটা হেমন্ত এসেছে। ছোটবেলায় এই সময়টায় বিকেলে খেলতে গেলে অসম্ভব মনখারাপ হতো খেলার শেষে। যখন দেখতাম আচমকা এসে পড়া মৃত্যু সংবাদের অভিব্যক্তি ফুটে উঠছে আকাশের গায়ে। ঝপ করে বিকেল ফুরিয়ে অন্ধকার নেমে আসত। আলো নিভে যেত মুহূর্তে।

খালপাড়ে একটা পরিত্যক্ত, জনহীন গোডাউনের পাশের ফাঁকা অংশটাই ছিল আমাদের মাঠ। খেলার সময়ে কতবার বল উঠে যেত গোডাউনের চালে। সে সব দিব্যি পেড়ে আনা হতো। কেউ ওই গোডাউনের ভেতর থমকে থাকা নির্জনতাকে পাত্তাই দিত না। কিন্তু সন্ধে নামার পরেই ভয় জাঁকিয়ে বসত। দেখতাম গোডাউনের ভিতরে আলো হাতে কে যেন হেঁটে যাচ্ছে! কে যাবে? কেউ তো থাকে না ওখানে। ভেতরে মালপত্রও নেই। তবে?

কোনও এক বন্ধু সেই অলৌকিকতায় নতুন রং মিশিয়ে ছিল। তার বক্তব্য, ভেতরে নাকি দেওয়াল-টেওয়াল আছে। কিন্তু যে হেঁটে যাচ্ছে সে তো সোজাই চলে যাচ্ছে! যেন দেওয়াল ভেদ করে। গা শিরশির করত। এ আবার কী! এমন হয় নাকি? ভাল করে সবটা বোঝাও যেত না। কাচের জানলা বন্ধ। তার ভিতর দিয়ে যেটুকু আলোর প্রতিফলন, তা দিয়েই সবটা বোঝার চেষ্টা করা।

গোডাউনের গেট ছিল উল্টো দিকে। ফলে কোনও কারণে কেউ ওখানে ঢুকতেই পারে। এই সহজ কথাটা আমরা কেউ বুঝতাম না। বলা ভাল, বুঝতে চাইতাম না। যেন এক অলৌকিকতাকে নির্মাণ করার নাছোড় অভিপ্রায়।

নেহাতই ছেলেমানুষি। খেলার শেষে এক অন্যতর খেলার শুরুয়াৎ। কিন্তু ভয়ের সঙ্গে এক বিষণ্ণ রং চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকত ভেতরে। সেটার ব্যাখ্যা আমার কাছে ছিল না। কিন্তু এখন ভাবতে গেলে মনে হয়, যে কোনও অলৌকিকতার মধ্যেই একটা বিষণ্ণতার দীর্ঘশ্বাস থাকে। যেন অন্ধকার বাতাসের শিস। এটাও সেই রকমই। নির্জন গোডাউনের মধ্যে কারও একটা হেঁটে চলা যে অসম্ভব, সেটাই হয়তো আমাকে বিষণ্ণ করে তুলত। এই কল্পনাটা কিন্তু হেমন্ত থেকেই জন্ম নিত। আর শীতকাল জুড়ে চলত। গরমকালে বেলা বড়। তখন ওসব দেখার মতো সময় থাকত না।

কেব‌ল হেমন্ত এলেই বেলা ছোট হতো। আর আমাদের অস্তিত্ব জুড়ে সন্ধে নামার পরেই আলো হাতে হেঁটে যেত কেউ।

আসলে কেউই যেত না। আর সেটাই ছিল ভয়ের আসল কারণ।

কিন্তু আজ এত কথা তোমাকে কেন বলছি? বলছি। এটা বলতেই তো এত কথার আয়োজন।

আজ এই হেমন্তের সন্ধেবেলায় আমাকে চমকে দিয়ে আমার মোবাইলটা বেজে উঠেছে। বাজছে। বেজেই যাচ্ছে। আমি ধরছি না। কে করেছে ফোন সেটা পর্যন্ত দেখা হয়ে ওঠেনি।

আসলে আমার সব মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে একটা দৃশ্য। পর্দা উড়ছে জানলার। আর আমার বাড়ির সামনের গলিতে এসে দাঁড়িয়েছে একজোড়া তরুণ-তরুণী। তারা হাঁ করে তাকিয়ে দেখছে উপরের দিকে। ভাবছে ফোনটা বাজছে। কিন্তু কেউ ধরছে না! তাদের ওই বিস্ময় আর বিরক্তি আমি নির্মাণ করছি তিলে তিলে।

গলিটা অন্ধকার। কিন্তু আলো থাকলেও কি আমরা ওদের চিনতে পারতাম! সময়ের ধাঁধার পাতা ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে একটা দৃশ্য। ওই দৃশ্যের কাছে আমার যৌবনবেলার প্রথম রোমাঞ্চ জমা রাখা আছে।

ফোন থেমে গেছে। পর্দাটা অবশ্য উড়ছে। দেখো, গলিটা এখন আবার জনহীন। যদিও জানি, খুব বেশিক্ষণ থাকবে না। ওই তরুণ-তরুণীই আবার ফিরবে। যেমন প্রতিটি বিকেলের শেষে গোডাউনের ভিতরে ফিরে আসত আলো হাতে লোকটা। এসো আমরা ওদের অপেক্ষা করি।

 

ফিরতে তো ওদের হবেই। ওদের যে বলে দেওয়া হয়নি, এটা আসলে অন্ধ গলি। যার ভেতরে মাথা খুঁড়ে মরে স্পেসটাইম।

Facebook Comments
শেয়ার

One Reply to “গদ্য: অন্ধ গলি”

  1. নিজের ভুলে যাওয়া অতীতে ফিরে গেলাম।গল্পটা পড়ে। খুব ছোট বয়সে আমারও।নানা মারা গিয়েছিল।মৃত্যু বুঝতাম না তখন।সেই আগোরবাতিড় গন্ধটা নাকে এসে বার বার ধাক্কা দিচ্ছিল।প্রচন্ড জর।অতপর বমি।নানীর বিষণ্ণ মুখ কাদছিল না।শেষ পর্যন্ত কেউ কাদাতে পারেনি।বিষণ্ণ মুখে বাইরে তাকিয়ে ছিল।নানার ভালোবাসা নানিকে আলোকিত করে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *