পূর্বজন্মের কথা : উন্মেষ মিত্র

পর্ব ২

ছোটবেলার আতঙ্ক মানে ছিল হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার খাতা দেখানোর দিন। শুধু খাতা দেখানো তো নয় সাথে ‘গার্জেন সিগনেচার’।তো সেবার ভয়াবহ পরীক্ষার খাতাগুলো পাওয়া মাত্রই সেবার পারস্পরিক বোঝাপড়া হয়েছিল যে আমরা একে অপরের গার্জেনের ভূমিকা নেবো অর্থাৎ আমার খাতায় আমার বাবার জায়গায় সই করবে অর্ক আর আমি সই করব অরিত্রর খাতায়। সইসাবুদ পর্ব শেষ করে ব্যাগের ভিতর সযত্নে খাতাপত্র রেখে বিকেলে ফুটবল পিটিয়ে ক্লান্ত বুভুক্ষু হয়ে সদর দরজা দিয়ে ঢুকে মায়ের মুখদর্শন হল। ‘তোকে কতবার বলেছি,স্কুল থেকে ফিরে টিফিন বাক্সটা বাইরে বের করে রাখবি’। তারপর আবিষ্কার করলাম মায়ের হাতে স্কুলের ব্যাগ আর টিফিন বাক্স বের করতে গিয়ে মা ততক্ষনে খাতাগুচ্ছ বের করে ফেলেছে তারপর কয়েক সেকেন্ডেই বিকট সব সংখ্যাগুলোও পড়ে ফেলেছে এবং এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশেরও কম সময়ে প্রচন্ড এক কিল আছড়ে পড়েছে আমার পিঠের ওপর।

“টিউশন কামাই করা ছাত্রজীবনের অন্যতম পবিত্র কর্তব্য এবং ইহা না করিলে পাপ হয়।” ‘ছাত্রজীবনের কর্তব্য’ রচনায় এই বাক্যটি লিখে এসেছিল আমার এক বন্ধু।পরীক্ষার খাতা বেরনোর পরবর্তী ঘটনা লেখার আর প্রয়োজন বোধ করলাম না কারণ সেসব জুড়ে রয়েছে চর্ম-কাষ্ঠের সংঘাত ধ্বনি এবং কিছু নারকীয় আর্তনাদ।তখন শীতকাল,আর সেবার শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছিল এমনকি গুজব রটেছিল হাফ সোয়েটারের দাবিতে জলদাপাড়ার গণ্ডাররা নাকি বনদপ্তরের অফিসের সামনে ধর্না দিয়েছিল।শীত সম্পর্কে উদাসীন হয় কেবলমাত্র টিউশনের মাস্টাররা । শীতকালে নাকি ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে পড়ানো শুরু ! ভোর বেলা হনুমান টুপিতে মুখ ঢেকে তার ওপর দিয়ে মাফলার পেঁচিয়ে সোয়েটার-জ্যাকেটের ভল্লুকপ্রমাণ বোঝা নিয়ে বের হতাম বন্ধুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডাকাডাকি করে একসাথে টিউশনের পথে।সেদিন অর্ক বাড়ি থেকে বেরিয়ে কানে কানে ফিসফিস করে বলল, “ভাই আজ টিউশন যাব না,কি একটা পরীক্ষা নেবে,চল আজ একটা হেব্বি জায়গায় যাব।” পরীক্ষার কথা জানতাম না,আর কোন মানুষেরই বা এরম জাঁকালো শীতের সকালে ঢুলতে ঢুলতে ফিজিক্সের অঙ্ক করতে ভালো লাগে? আমরা বাকি ৩ জন এক পায়ে খাড়া।সাইকেলের গতিপথ পরিবর্তন হল।তারপর গঙ্গার ধার,মন্দিরের চাতালে মিঠে রোদ পোহাতে পোহাতে আসন্ন স্কুলের ফুটবল টুর্নামেন্টের দল নিয়ে গভীর আলোচনার পর গরম গরম নানপুরি খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বাড়ির পথে ফিরছি এমন সময় এক বন্ধু প্রশ্ন করল, “অর্ক তোর ব্যাগ কই?” অর্ক সাইকেলের পিছনে ক্যরিয়ারে ব্যাগ রাখত।ঘাড় ঘুরিয়ে সবাই দেখলাম অর্কর ব্যাগ নেই।এ যেন অকস্মাৎ বজ্রপাত। রাস্তার আশেপাশে তাকিয়ে দেখা গেল কোথাও ব্যাগ নেই।এক বন্ধু বলল, “শিওর গঙ্গার ঘাট থেকে নানপুরিওয়ালার কাছে যাওয়ার সময় পড়ে গিয়েছে।” সাইকেলের মুখ ঘুরিয়ে সজাগ দৃষ্টি তে ফেরত পথে যাত্রা শুরু হল।না কোথাও নেই । নানপুরির দোকানে গিয়ে একপ্রস্থ জিজ্ঞাসাবাদ করা হল কিন্তু কোথাও অর্কর ব্যাগের টিকি টুকুর দেখা পাওয়া গেল না।এক বন্ধু দাবি করল,গঙ্গার ধারে ঘোরার সময় ব্যাগটা সে দেখেছে,কিন্তু তারপর আর খেয়াল নেই। বেচারা অর্কর মুখের অবস্থা তখন বুনোহাঁসের হাঁস থুড়ি মহানায়কের মতন করুণ,শুধু কাঁদতেই বাকি রেখেছে।এদিকে ঘড়ির কাঁটাও ঘুরে চলেছে।মাস দুয়েক বাদে আমাদের হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা।আমি ভালো মানুষের মতন গিয়ে বললাম, “ভাই মন খারাপ করিস না তকে আমাদের সবার বই নিয়ে তোর পড়া হয়ে যাবে।” মুখের কথা শেষ না হতেই মহেঞ্জোদারোর কুমীরের মতন অর্ক লাফিয়ে উঠল, “বইয়ের কথা কে বলেছে,বইটা গেছে বাঁচা গেছে।ব্যাগের ভিতর একটা এমপি থ্রি প্লেয়ারটা ছিল,পাড়ার এক দাদার কালকেই নিয়েছি,আজ ফেরত না দিলে আমাকে খুন করে ফেলবে রে।” আবার গঙ্গার ধারের ধাপি,মন্দিরের চাতালে একপ্রস্থ খোঁজাখুঁজি হল তারপর হতাশ হয়ে বাড়ির পথে।বাড়ি ফেরার পথে অর্ক কে বিভিন্ন মন্ত্রণা দেওয়া হল কাকিমা কে ম্যানেজ করার ব্যাপারে।মারমোসেটের মতন নির্বিকার মুখে অর্ক ওর বাড়ির গলিতে ঢুকে পড়ল।

সেদিন স্কুলে অর্কর দেখা নেই,বিকেলে খেলার মাঠেও এল না।রাতে ওদের বাড়ির ল্যান্ডফোনে ফোন করতে কাকিমা গম্ভীর গলায় বলল, “অর্ক পড়ছে,এখন কথা বলা হবে না।” দুদিন পর অর্কর দেখা পাওয়া গেল স্কুলে,পিঠে সেই ব্যাগ। “ভাই,ব্যাগটা কোথায় পেলি?কোথায় পড়েছিল?কি হল বাড়িতে?” ইত্যাদি প্রশ্নের জবাব এল একটা বাক্যে, “ব্যাগটা বাড়িতে রেখেই পড়তে চলে গিয়েছিলাম।” তারপর কথায় কথায় জানা গেল,টিউশন কামাই করার উত্তেজনায় বিছানার ওপর ব্যাগটা ফেলে রেখেই শ্রীমান পড়তে চলে গিয়েছিল।তারপর বাড়ি ঢুকে হাউমাউ করে, “মা আমার ব্যাগটা কোথায় যেন পড়ে গেছে রাস্তায়,আসলে ফিজিক্সের অঙ্ক করে মাথাটা এমন…” ইত্যাদি বলতে বলতে অর্ক আবিষ্কার করে রান্নাঘরের সামনে ব্যাগ হাতে কাকিমা দাঁড়িয়ে আর অন্য হাতে বাঁধাকপির তরকারি আবৃত খুন্তি…

তারপরের পরের ঘটনা কিছুই না।পরবর্তী ১ মাস বাবার বাইকের পিছনে করে অর্ক পড়তে যেত আর বিকেলে আমরা যখন ফুটবল পেটাতাম বেচারা তখন একটি ফুটবলের ওপর এত নিউটন বল প্রয়োগ করা হলে… জাতীয় অঙ্ক কষত।

পর্ব ১

Facebook Comments
শেয়ার

One Reply to “পূর্বজন্মের কথা : উন্মেষ মিত্র”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *