আলাপচারিতায় সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

 

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় সাংস্কৃতিক ভাষ্যকার সমালোচক অনুবাদক অধ্যাপক প্রশাসক বক্তা মিডিয়াচ্যুত নাগরিক।
তাঁর লেখায় তর্কের অজস্র উপাদান। তাঁর উচ্চারণে সাজানো থাকে প্রচুর ফাঁক-ফোকর; সেখান থেকে ডালপালা ছড়ায় আরও নানা জরুরি প্রসঙ্গ। যাকে প্রবন্ধ বলে তা থেকে বেশ কয়েক কিলোমিটার পার হয়ে গেলে তবে দেখা মেলে এই লেখকের বিষণ্ন আক্রমণাত্মক আমুদে ও মৌলিক ভাষাপ্রদেশের। চলচ্চিত্রস্রষ্টা ঋত্বিক কুমার ঘটক সংক্রান্ত তাঁর রচনা ঋত্বিকতন্ত্র প্রায় দেশজুড়ে সমাদর পেয়েছে। আর সিনেমার সীমানা ছাড়িয়ে, কবিতা, গদ্যসাহিত্য, চিত্রকলা, সংগীত ও নাটক শিল্পের নানা স্তরেই তাঁর স্বচ্ছন্দ ও অবিরত যাতায়াত। প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য ‘স্থানাঙ্ক নির্ণয়’, ‘অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন’, ‘অনভিজাতদের জন্য অপেরা’, ‘ওগো মায়া ওগো বাতায়ন’ ইত্যাদি। অনুবাদ করেছেন ছ’টি কিংবদন্তিপ্রতিম ছায়াছবির চিত্রনাট্যের। তাঁর সম্পাদনাকুশলতার দৃষ্টান্ত ঋত্বিক ঘটকের বাংলা প্রবন্ধাবলী ‘চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু’
  ও ‘অনন্য রায়ের কাব্যসমগ্র’।

 

 

ছয়লাপ: আমরা জানি আপনি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র ছিলেন, সেখান থেকে আপনি আপনার সাহিত্য প্রীতির জন্য ফিল্ম স্টাডিজ এর দিকে চলে গেলেন। আমরা সমকালে দেখেছি, সাহিত্য আর বিজ্ঞানের বিভাজনটা। আপনিও আপনার অনেক লেখায় বলেছেন যে সাহিত্যে বিজ্ঞান সেভাবে আসছে না। আমরাও অনুভব করেছি, মাধ্যমিক পরবর্তী সময় থেকেই কেউ যেন আমাদের মধ্যে এই বিভাজন তা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। এটা সাইন্স এটা আর্টস। আমরা মেলাতে পারছি না কোনও একটা জায়গায় পরে। অথচ এরম নয় যে বিজ্ঞানের ছাত্রের সাহিত্যে উৎসাহ নেই বা উল্টোটাও সত্যি। এই সমন্ধে যদি আপনি কিছু বলেন।

স.মু: আমার মনে হয় একুশ শতকে দাঁড়িয়ে এইরকম বর্ণাশ্রম প্রথা জ্ঞানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। হেঁসেল ভিন্ন হওয়া, এই যে এটা বিজ্ঞান এটা জীবন বিজ্ঞান সেইটা গাণিতিক বিজ্ঞান বা ওইটা পরিসংখ্যানগত বিজ্ঞান এরম যে ভাগাভাগি এতে মানুষের জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে অপরিমিত ক্ষতি হচ্ছে বিশেষ করে বাংলায়। পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় এই ধরনের পাঠক্রম আর নেই, কেননা ধরুন অংক এবং দর্শন এই দুটো প্রাথমিক জিনিস যা যে কোনও জ্ঞানকেই প্রভাবিত করে থাকে এবং আজকের যুগে আপনি অংক সমন্ধে প্রাথমিক ধারণা নিয়ে , আমি অংকের হাতিয়ার এর কথা বলছিনা যাতে আপনি যোগ করেন গুণ করেন বিয়োগ করেন ভাগ করেন সেতো দিব্ব ক্যালকুলেটর এই করে; কম্পিউটার আপনাকে যেটুকু হাতুড়ি বা পেরেক দিয়েছে তার বাইরে আপনি আপনার দার্শনিক চিন্তার জগতে আপনি একদম অংককে আনতে পারছেন না, বিজ্ঞানের নতুন নতুন ধারণা গুলোকে আনতে পারছেন না, সেটা যে কত মর্মান্তিক তা বলে বোঝানোর নয়। বস্তুত এখনও বাঙালি সংস্কৃতি আধুনিক বিজ্ঞান বলতে আইনস্টান কে বুঝি যিনি একশ বছরের থেকেও বেশি পুরোনো। তারপর হাইজেনবার্গ, তাও দেখবেন মোটামুটি নব্বই বছরের পুরনো। মানে গত পঞ্চাশ বছরে বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে সংস্কৃতির যে প্রয়োগ আছে তার সমন্ধে আমরা ততোটাও অবগত নই। শিক্ষা ক্ষেত্রেও সেটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আমি নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম। মোটামুটিভাবে কলা বিদ্যা, ভাষাবিদ্যার ছাত্ররা তাঁরা প্রায় বিজ্ঞান চর্চা কিছু করেনা, তাঁদের কাজকর্মে বিজ্ঞানের কোনও ছাপ নেই। অথচ এটা উনিশ শতকে ছিল। জগদীশ বসু, সত্যেন বসু, মেঘনাদ সাহা এঁরা প্রত্যেকেই ভালো ভাষা চর্চা করতেন। তার প্রমাণও আছে। উল্টো দিকে দিয়ে সাহিত্যিকরাও বিজ্ঞানে আগ্রহী ছিলেন। সেটা রবীন্দ্রনাথকে দেখলেই বোঝা যায়। বা যদি জীবনানন্দের কথা বলি, উনি গভীরভাবে বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। ছিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। আজকের দিনের কবি না গদ্য লেখক বা শিল্পীদের দেখে আমার খুবই কষ্ট হয়, ব্যক্তিগত ভাবে তাঁরা অনেকেই আমার বন্ধু এবং সহযোগী। কিন্তু তাঁরা এসবের খোঁজও রাখেন না। এমনকি কোনও বিজ্ঞান পত্র-পত্রিকা পড়েনও না। প্রেমেন্দ্র মিত্র ‘নেচার’ পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন, সে লেখার কারণেই হোক বা অন্য। এখন আমি কোনও সাহিত্যিক কে দেখি না যে পদার্থবিদ্যার আধুনিকতম আবিষ্কার নিয়ে কোথাও ছাপা হলেও সেটা পড়ে দেখছেন। এর ফলে হচ্ছে কি এক ধরনের সংকীর্ণ, ডোবার মত সমাজ তৈরি হচ্ছে আমাদের চারপাশে। এর প্রভাব গভীর ভাবে পড়ছে আমাদের সংস্কৃতি চর্চায়। আমরা যে ধরনের কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, সিনেমা বা নাটক ইত্যাদি করছি, এত পিছিয়ে থাকা সংস্কৃতি পৃথিবীর আর কোথাও হয়না। আমার মনে হচ্ছে বাংলা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এটা একটা পশ্চাদগমন।

ছয়লাপ: উল্টোটাও আপনি বলেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন কিন্তু উনি পুরো মাত্রায় সাহিত্যচর্চা করতেন। এটা আপনার লেখাতেই আমরা পড়েছি।

স.মু: হ্যাঁ, অবশ্যই। মানিকবাবুর মনস্তত্ব নিয়ে যে নতুন অভিনিবেশ এই জিনিসগুলোতে বাংলা সাহিত্য উপকৃত হয়েছে। আমার বক্তব্য খুব সোজা। একটা জানলা তো খোলা রাখতে হবে। আজকের যুগে আপনি বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে কোনও কাজ করতে পারেন না। আর বিজ্ঞানের কষ্টিপাথর বলতে আমরা বাঙালি লেখকরা যে বিজ্ঞানকে বুঝছি সেটা আঠারো শতকের বিজ্ঞান। দুই দুই যোগ করলে চার হয়; বা ছয়কে দুই দিয়ে ভাগ করলে তিন হয় ; বা একটা আপেল গাছ থেকে পড়লে মাটির দিকেই পরে, বা ত্রিভুজের দুই বাহু যোগ করলে তৃতীয় বাহু অপেক্ষা বড়, এই ধরনের বিজ্ঞানের থেকে যে বিজ্ঞান আরও অনেক দূর এগিয়ে গেছে এবং ভাষাও এগিয়ে গেছে সেটার কোনও খোঁজই আমরা রাখিনা। বিজ্ঞানকে আমরা ব্যবহার করছি মানে ব্যবহারিক এবং প্রায়োগিক ক্ষেত্রে। আমাদের বাড়িতে এসি থাকে, কম্পিউটার থাকে বা আমরা ফেসবুক, হোয়াটস আপ, মেসেঞ্জার যা ব্যবহার করছি এগুলো কোনোটাই বিজ্ঞানের ব্যবহার না, বিজ্ঞানের প্রয়োগের ব্যবহার। বাল্ব জ্বালালে আলোকিত হয় জানে, কেন হয় সেটা অনেক লোক জানে না। জুলস একুইভ্যালেন্ট টু হিট এটা জানেন না। আসল কথা হলো সংস্কৃতিতে বিজ্ঞান বাদ দিয়ে কিছু হয়না। সেটা সমকালীন আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি প্রমাণ করে।

ছয়লাপ: আপনার লেখায় আমরা পড়েছি, আপনি ফিল্ম স্টাডিজ কে একটা ভাষা হিসেবে দেখছেন। যেমন ইংরাজি, বাংলা, তেমনই ফিল্ম স্টাডিজ। আপনি বলেছেন যে বর্তমান যে সিনেমা তাতে ‘স্টোরি টেলিং’-এর ভীষণ অভাব। কারণ ফিল্ম স্টাডিজ নিয়ে চর্চার অভাব, পড়াশোনার অভাব। আসলে ছেলেবেলা থেকেই আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে অংক বা ইংরাজি বা ভূগোল বা ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিং এগুলোই হল পেশাগত একমাত্র পথ। সেখানে আমরা ফিল্ম স্টাডিজ নিয়ে পড়ব কেন। আমাদের পশ্চিমবঙ্গে সেই পরিকাঠামোও অনুপস্থিত। হাতে গোনা দু’তিনটে কলেজে পড়ানো হয় ফিল্ম স্টাডিজ।আপনি কি মনে করেন, ফিল্ম স্টাডিজকে  কেন পেশা হিসেবে বেছে নেব আমরা?

স.মু: চলচ্চিত্র অবশ্যই একটি ভাষার মত। এবার বেশি বিশ্লেষণে না গিয়ে যে এটাকে ল্যাঙ্গুয়েজ সিষ্টেম বলবে নাকি ল্যাঙ্গুয়েজ বলবে সেটার মধ্যে না গিয়ে বলি, আমরা যখন সিনেমা দেখছি তখন দেখার যে চোখটা সেটা যে কোনও কারণেই হোক আমাদের দেশে একটু ভুলভাবে তৈরি হয়েছে। আমরা ভাবছি যে সিনেমা বা চলচ্চিত্র বা চলমান চিত্রমালা বা চলচ্ছবি বা ছায়াছবি যাই বলি না কেন এর মানে হচ্ছে একটা গল্প, শব্দ ও দৃশ্যের অনুবাদ করে দেওয়া , পর্দায় দেখব গল্পটাকে। একটা অনুদিত সংস্করণ। কিছু লিখিত ভাষার দৃশ্যধ্বনিতে অনুবাদ আমরা দেখব। আমরা যখন কোনও ভাষা শিখি বাংলা, ইংরাজি, জার্মান, জাপানি, চীনা যাই হোক না কেন আমরা একটা পদ্ধতি অনুসরণ করি, নয়ত ভাষাটা শিখতে পারতাম না। এই যে জানতে পারে, জানার রহস্য, দ্বিজদাসের কবিতা কেন চন্ডীদাসের থেকে আলাদা,কেন রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাপতির থেকে আলাদা, সেইসব জিনিস জানার জন্য বাংলা ভাষার কিছু রহস্য জানার দরকার রয়েছে। আমাদের এখানে সমালোচকরাই দায়ী, যাঁরা সিনেমা নিয়ে লেখেন তাঁরা কখনও বলেনি যে শব্দ বা ধ্বনি বা আলোকচিত্র কিভাবে একটা ভাষা হয়ে উঠতে পারে, তা কিভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে তার কোনও উদাহরণ দেননি। আমরা ধরে নিয়েছি এই যে নর্মাল লেন্স বা ওয়াইড এঙ্গেল লেন্স বা টেলিফোটো লেন্স বা ডিরেক্ট সাউন্ড, কোন সাউন্ড কিভাবে কাজ করবে। আমরা যদি গত শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ ইংলিশ কবি টি. এস.এলিয়ট-এর কথা ভাবি,  এই যে এলিয়টের লেখা ওয়েস্টল্যান্ড, গত শতকের সবথেকে চর্চিত এবং বিখ্যাত ইংরাজি কবিতা, তা যদি আপনি পড়তে চান তাহলে আপনাকে তার টিকা গুলোকেও ভালো করে বুঝতে হবে। হতেই পারে যে আমি সব টিকার মর্মার্থ বুঝলাম না, না বুঝতে পারলে তো আমি এটা বলতে পারিনা যে এলিয়ট বাজে কবিতা লিখেছেন। কারন তিনি নিজে সংস্কৃতির এমন এক স্তরে এসে ওই কবিতা রচনা করেছেন তা বুঝতে গেলেও আপনাকে সংস্কৃতির সেই স্তর অনুযায়ী শিক্ষিত হতে হবে। ঋত্বিকের সুবর্ণরেখা বা কোমলগান্ধার বা মেঘে ঢাকা তারা, তার দৃশ্যগত মাত্রা এমন আছে, ধ্বনিগত মাত্রা এমন আছে যে শুধুমাত্র সাহিত্যর মাত্রা দিয়ে তা বোঝা যাবে না। এতে আমরাই কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, আমরা ধরতেই পারছিনা আরও আনন্দ আমাদের জন্য অপেক্ষা করেছিল। স্বর্গাভিজানের পথ আমাদের জন্য প্রস্তুত ছিল, কিন্তু আমরা অন্তরীক্ষ অব্দি কোনও মতে গেলাম, আর গেলাম না, মর্তবাসী হয়েই রয়ে গেলাম। এইখানেই চলচ্চিত্রকে ভাষা হিসেবে চর্চা করার প্ৰয়োজনীয়তা। এখন সবাই গল্পের উপর জোর দেন, কিন্তু এটা ভুলে যান যে গল্পটা কিন্তু শব্দে লেখা হবেনা, সেটা লিখতে হবে দৃশ্যে। সাউন্ড ইমেজ বা পিকটোরিয়াল ইমেজ কে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা বা উপস্থাপন করার পদ্ধতি যদি না জানা থাকে তাহলে কখনই চলচ্চিত্রকে মাধ্যম হিসেবে প্রকাশ করা যাবে না। আর চলচ্চিত্রকে পেশা হিসেবে নেওয়ার যে প্রশ্ন, হ্যাঁ এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পেশা। আপনি খেয়াল করবেন আমরা যে সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, এই একুশ শতকে ভাষা কিন্তু ক্রমশ দৃশ্যভাষা হয়ে যাচ্ছে। যেমন আপনার সামনে কম্পিউটার স্ক্রিন, স্মার্ট ফোন, ওয়েব পেজ সর্বত্র। আপনি দেখবেন এয়ারপোর্ট বা স্টেশনে এখন আর স্নানাগার বা প্রসাধনাগার বা টয়লেট এসব লেখা থাকে না, সেখানে ছবি দেওয়া থাকে যাতে আমরা বুঝি কোনটা নারীদের কোনটি পুরুষদের। সমস্ত আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এখন ভাষার এই বদল। আগে আমরা ইংরাজি জানার ভয়ে বিদেশ যেতাম না। কিন্তু এখন কনজিউমার সোসাইটি। একজন স্বাক্ষর লোক যে পয়সা দেবে একজন নিরক্ষর লোকও সেই পয়সা দেবে লন্ডন যাবার জন্য। ফলে ব্যবসার খাতিরেই এরা এমন ব্যবস্থা করেছে যাতে সমস্ত ভাষা না শিখলেও হয়, দৃশ্যভাষার গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। শব্দজনিত ভাষার জ্ঞান না থাকলে আমি কখনই বলতে পারিনা রবীন্দ্রনাথ ভালো কি খারাপ, শেক্সপিয়র ভালো কি খারাপ। এখানেই দৃশ্যগত ভাষার সুবিধা। আজকে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এবং একজন গ্রুপ ডি কর্মচারী একটি সিনেমা দেখে তার দৃশ্যের মাত্রা মোটামুটি সমানভাবে বুঝতে পারেন, এখানেই সিনেমার জনপ্রিয়তা। আজকের পৃথিবীতে একটা কোম্পানি কিরকম তা মুখে বলার থেকে অনেক বেশি কার্যকরী হয়ে যাচ্ছে তিন মিনিট সময়ে সেটা দেখিয়ে দেওয়া। তো এই পেশাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কাহিনীচিত্র বলে নয়, তথ্যচিত্র বলে নয় আজকের দিনে যেকোনও জ্ঞাপন প্রক্রিয়াতে চিত্র ও ভাষা সবার আগে এসে পড়েছে। এখন সত্যি কথা হল, ভারতীয় চলচ্চিত্র বিদ্যা  তাত্বিকভাবে যাদবপুর, আম্বেদকর, জে. এন.ইউ,মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, বারাসাত ছাড়া এখনও খুব কম জায়গায় আছে। এস.আর.এফ.টি.আই বা পুনের এফ.টি.আই এবং রূপকলা কেন্দ্র ছাড়া সরকারি ভাবে তেমন কিছুই নেই। বেসরকারি যেগুলো আছে তাতে এত বেশি পয়সা লাগে যে সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েদের পক্ষে সেখানে পড়া সম্ভব না। আগে টেকনিশিয়ানরা যেভাবে কাজ শিখত একজন এর সহকারী হয়ে, তাঁরাও এখন নিরুপায় হয়ে সেভাবেই কাজ শিখছে। তার উপর আছে গিল্ড এর মেম্বারশিপ ইত্যাদি সমস্যা। চলচ্চিত্র বিদ্যার সঠিক প্রয়োগ এরা কখনই শিখতে পারছেনা প্রকৃতভাবে। তবে আশা করা যায় এই সমস্যা মিটবে। বাজারের চাহিদাই চলচ্চিত্র বিদ্যাকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলবে।

ছয়লাপ:  আপনার লেখা বুনো স্ট্রবেরি, যেখানে আপনি কালীঘাট জনপথ নিয়ে বলছেন, কালীঘাটের কুকুর নিয়ে বলছেন। অদ্ভুত এক ধরনের লেখা। বা সম্প্রতি আপনি শিলাদিত্যতে লিখেছেন খলনায়কেরা যখন নায়ক। বা হ্যারিসন রোডের অসুখ নিয়ে লিখছেন যেখানে বলছেন কলকাতার চামড়ায় উল্কির মত মেস বাড়ি, একদিকে জীবনানন্দ একদিকে শরদিন্দু। আপনার শৈলী অন্য ধরনের। ফেসবুকে আপনার যে পেজটা অনিন্দ্য সেনগুপ্ত চালান সেখানে উনিও বলছেন আপনি গদ্য লিখছেন কিন্তু তা অনন্য রায় এর মত নয়, অন্য ধারার গদ্য। আপনি নিজেই বলেছেন যে বাংলা সাহিত্যে সম্পাদক ঠিক করে দেয় গদ্য-গল্প। অথচ আপনার লেখা সেই ছকে পড়েনা। আপনি বনফুল রেস্টুরেন্ট নিয়ে লিখছেন, শ্রীহরির কচুরির কথা বলছেন। বলা হয় গদ্যের চলন দেখতে গেলে কমলকুমার মজুমদারের পরে বাংলা সাহিত্যে আপনি। এই যে আপনার ছকভাঙা ভাষা বা সাহিত্য চর্চা, এটা নিয়ে আমাদের জানতে ইচ্ছে করছে আপনার কাছ থেকে।

স.মু: আমার সবসময়ই মনে হয় মানব সভ্যতা এই এগিয়ে এসেছে, এত পরস্পরের সাথে জড়িয়ে যাওয়া এত বিষয়বস্তু, একটা ছায়া একটা অন্ধকার, এই যে আমি গত বাইশে অক্টোবর জীবনানন্দের মৃত্যুদিনে এই সময় পত্রিকায় লিখলাম এই যে আলো থেকে অন্ধকারে যাই না, আসলে আলো-অন্ধকারে যাই, এই যে সহাবস্থান যেখানে কবি বলেছেন ‘আলোর রহস্য মুনি সহোদরার মতই অন্ধকার’ অর্থাৎ আলো আর অন্ধকার পাশাপাশি থাকে। একটার পরে আরেকটা থাকে না। এই ভাবনাটা কিন্তু আমাদের সাম্প্রতিক আধুনিক যুগের অন্যতম উত্তরাধিকার। আজকের দিনে আমরা গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, সিনেমা কেন আলাদা আলাদা করে দেখব? এ দেখার কোনও কারণও নেই। ধরুন একটি যুবক ও যুবতী বসে প্রেম করছে, তার মধ্যে পালাস্ট্যাইনে একটি বোমা পড়ে গেল। এই ঘটনাটা কিন্তু সংবাদ মাধ্যম এবং আরও নানা মাধ্যমে এসে আমাদের জীবনে জড়িয়ে গেল। আপনি বলতে পারবেন না কিন্তু আপনি আলাদা করে যুদ্ধ করছেন, আপনি আলাদা করে কিছু পরিবর্তন করছেন। আপনার সমস্ত জীবন মিলেমিশে আছে। সাহিত্যই বা আলাদা কেন থাকবে? আর সাহিত্যে এই আলাদা ধারার প্রবাহ অনেক আগে থেকে। আমার মনে হয় বঙ্কিমচন্দ্র যখন কমলাকান্তর দপ্তরে কে গায় ওই লিখতেন, বঙ্কিমচন্দ্র যখন আমার দুর্গোৎসব লিখতেন, কিংবা উপন্যাসের মধ্যে অনেক সময় সন্দর্প ঢোকাতেন; ধরা যাক শৈবালীনির স্বপ্নদৃশ্যের মত জায়গা চন্দ্রশেখর উপন্যাসে; এরম কাজ রবীন্দ্রনাথও করেছেন। আপনি যদি ওনার শেষ দশটা কবিতা দেখেন, তাহলে দেখবেন সেগুলো এমনই ছক ভাঙা রূপ যে বাংলা মতে সেগুলিকে কবিতা বলা যায় কিনা সন্দেহ আছে। এই যে নানা রকম কাজ, পুতুল নাচের ইতিকথার মত লেখা, বা সাতটি তারার তিমির-এর মত লেখা, এগুলোকে বলা যেতে পারে সাহিত্যের কোনও আলাদা আলাদা ধারা নয়, বরং এক সমন্বিত রূপ। এগুলো আলাদা করে ব্যাখ্যা করা যায়না। এই যে হিন্দুদের কথা যদি ধরি, কেউ সাকার রূপে ভগবানকে পুজো করে আবার কেউ নিরাকার বা ব্রহ্মবিদ্যা মতে। কিন্তু মূল কেন্দ্রবিন্দু সেই ভগবান। সেরমই শিল্পের ক্ষেত্রে কেউ গল্প, কেউ প্রবন্ধ, কেউ নাটক ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে তাঁদের কথাটা বলছেন। আমার মতে আমার বাংলা ভাষা এত সমৃদ্ধ, এত মূল্যবান, এত মহান যে তাকে ঠিক খবরের কাগজ বা বিজ্ঞাপনে ছেড়ে দেওয়াটা উচিত না। আমাদের চেষ্টা থাকে যে ভাষা অনুভূতিদেশ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে তাকে একভাবে প্রকাশ করা, যেমন আপনি যে লেখা গুলোর কথা বললেন কালীঘাট, মেসবাড়ি বা আমি যে লিখেছি ওগো মায়া ওগো বাতায়ন, সেগুলো একধরনের কথা। কথা তো আমরা নানা ভাবে বলি, প্রেম করার সময় যেভাবে বলি রেগে কারোর সাথে ঝগড়া করার সময় সেভাবে বলি না, আবার মা’র সাথে যেভাবে কথা বলি বন্ধুর সাথে সেভাবে বলি না। এই যে ভাষার নানা স্তর, নানা স্বর এটাকে পরীক্ষা করা লেখকদের দ্বায়িত্ব। কারন লেখকরা যদি এই কাজটা ভুলে যায় তাহলে সমাজ কি করে নতুন ভাষা পাবে? লেখককে মনে রাখতে হবে যেকোনও বানের জল, যেকোনও নিন্মচাপ এসে বাংলা ভাষাকে কেটে ফেলতে পারে, লেখককে সেই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। লেখক নানান ভাবে ভাষার পরীক্ষা করবেন। আমি বুনো স্ট্রবেরি যেভাবে লিখেছি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন সেভাবে লিখিনি। খুব সচেতনভাবেই করেছি সেটা। আমি মনে করি যে সমস্ত উত্তরাধিকার আমি পেয়েছি, যে সমস্ত সম্পত্তি আমি পেয়েছি তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হল বাংলা ভাষা। এর মধ্যে দিয়েই আমি সন্তানকে স্নেহ করতে পারি, প্রেয়সীকে ভালোবাসতে পারি, এবং কাউকে ঘৃণাও করতে পারি। কাজেই সেই সম্পত্তি রক্ষা করা, তাকে সুদে-আসলে বৃদ্ধি করা আমার দ্বায়িত্ব।

ছয়লাপ: সাহিত্যে যেরম সম্পাদক ঠিক করে দিচ্ছে যে লেখক কি লিখবেন, এই একই রকম সংকট আমরা দেখছি সিনেমার ক্ষেত্রেও। একজন পরিচালক তাঁর ভাবনা চিন্তার চিত্ররূপ দেবার আগে ভাবছেন সেটা সেন্সর হয়ে যাবে কিনা, এমন কিছু ভাবনায় সিনেমা করা যাবে না যাতে সিনেমার মুক্তি আটকে গেল। এতে কিন্তু আদতে শিল্পের সাথে আপস করা হচ্ছে বলে আমাদের মনে হয়। আপনার কি মনে হয় একজন পরিচালকের এই সেন্সরের ভয়ে নিজের ভাবনা চিন্তাকে হারিয়ে ফেলা উচিত নাকি শিল্পের প্রতি সৎ থেকে তার নিজের ভাবনাকে চিত্রভাষারূপ দেওয়া উচিত সেন্সরের রক্তচক্ষু কে ভয় না পেয়ে।

স.মু: নীতিগতভাবে আমি যা লিখতে চাই তা আমি লিখব, যা আঁকতে চাই তা আমি আঁকব। কিন্তু এই সংস্কৃতি বা কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি, এটা তো একটা ব্যবসা। আজকে যাঁরা টাকা ঢালবেন তাঁরা তো আমায় বলেই দেবেন এটা করতে হবে এটা না। কিন্তু একজন লেখকের নিজের আত্মপরীক্ষা হবে যে তিনি সেই নির্দেশাবলী অতিক্রম করে কতদূর এগোতে পারেন। কাফকা, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ, মানিকবাবু এঁরা সকলেই এই নিয়মের উদাহরণ। তাঁরা কিন্তু এই বাধা অতিক্রম করেছেন, নয়ত সাহিত্য এগোত না। আর চলচিত্রে যা বলছেন সেটা তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যের ক্ষেত্রে পুঁজির ভূমিকা কম। এখনও আপনি দু’টাকার খাতা, দু’টাকার পেন কিনে লিখতে পারেন। কিন্তু ফিল্ম বেশ খরচ সাপেক্ষ। যাঁরা এতে টাকা ঢালবেন তাঁরা আপনাকে সুবর্ণরেখা বা কোমলগান্ধার বা পথের পাঁচালী তৈরি করার জন্যে টাকা দেবেন না। তাঁরা চাইবেন যে বিষয়গুলো দর্শক টানে, নাচ গান মসলা এসবের মধ্যে আপনাকে বেঁধে রাখতে। সত্যিকারের শিল্পীর চেষ্টা হচ্ছে সেই বাধা বন্ধনগুলো কাটিয়ে নতুন ভাবনা, নতুন কাজ করে যাওয়া। এটা খুব বড় একটা প্রশ্ন যে সামাজিক নীতিনির্দেশ এই লেখকের ব্যক্তিসত্বা কিভাবে নিজেদের মধ্যে সাম্যাবস্থা তৈরি করবে।

ছয়লাপ: আপনি ঋত্বিক এবং পুঁজির প্রসঙ্গ তুললেন। এখানে নবারুণের একটা কথা মনে পড়ছে, ‘Ritwik was murdered in three days’ । সেখানে উনি ঘাটশিলার প্রসঙ্গ তুলেছেন। যে ঋত্বিক ঘটক স্টেশনে বসে থাকতেন, একের পর এক ট্রেন চলে যেত কিন্তু ফিল্মের স্টক আসতো না। কিন্তু আজকের দিনে ঋত্বিক কিন্তু মেইনস্ট্রিমে ঢুকে যাচ্ছে। সবাই এখন ঋত্বিক ঋত্বিক করছে। জন্মদিন এলেই সোশ্যাল মিডিয়াতে পোষ্ট হচ্ছে। গুগল করে কিছু তথ্য জেনে নিয়ে বড় বড় পোস্ট হচ্ছে। এতে কি আমরা আদেও ঋত্বিক এর ভাবনা চিন্তাকে ছুঁতে পারছি নাকি পুরোটাই মার্কেটাইজেশন মাত্র?

স.মু: আসলে কি জান, এই যে বিরাট বিপণন সাম্রাজ্য এখানে দেশদ্রোহীকেও শেষ পর্যন্ত এই বাজার শুষে নেবার চেষ্টা করে। যেমন ধরো চে গুয়েভারা। যে লোকটা বিপণন সাম্রাজ্যের শোষণের  বিরুদ্ধে লড়ে গেল সেই এখন সবথেকে জনপ্রিয় বিপণন বস্তু। দেওয়ালে দেওয়ালে চে। মার্কিন দেশে অন্তর্বাসেও চে-এর ছবি থাকে। এখন চে বল ঋত্বিক বল বা অন্য কোনও বিপ্লবী বল, তাঁদের দিয়ে যদি ব্যবসা হয়, ব্যবসায়ীরা তাই করবে। বা ধর আ্যন্টি-ভিয়েটনাম যুদ্ধ, সেখানে বব ডিলানকে নিয়ে ব্যবসা হল। ঋত্বিক ঘটককে তাঁর জীবদ্দশায় যতদূর সম্ভব উপেক্ষা করা হয়েছে। এখন যে মুহূর্তে ঋত্বিক একজন ভালো বিপণনযোগ্য পণ্য হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, অমনি সব জায়গায় ঋত্বিক ভরে গেল। তোমাদের ভাষায় Ritwik selles, ঋত্বিক বিক্রি হয়, ঋত্বিকের বিপ্লবের একটা রেডিমেড প্যাকেজ পাওয়া যায়। আসলে ঋত্বিকের মত মানুষরা প্রতি-সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করত। প্রতি-সংস্কৃতি অর্থাৎ যেটা সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করে। যেমন অর্থনীতির ক্ষেত্রে একদা কার্ল মার্ক্স করেছিল। অর্থাৎ উনি মূল সংস্কৃতিকে ভাঙতে চেয়েছিলেন, অন্য একটা সাংস্কৃতিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্ল মার্ক্স পড়ানো হয়।  গুগল, উইকিপিডিয়ার দৌলতে কার্ল মার্ক্স নিয়ে রেডিমেড তথ্য হাজির। এটা পুঁজিবাদী সভ্যতার নিয়ম। যা কিছু বিপণনযোগ্য তাই তাঁরা বিক্রি করবেন। আগে ছিল এইটা ভালো, এইটা খারাপ, অতএব ভালোটাকে বেছে নাও। কিন্তু এখন ধারণাটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এখন বলা হয় এটা বিপণনযোগ্য অতএব বেচে দাও। এরা ভালো জিনিসটাকে চালু জিনিস হিসেবে গ্রাহ্য করছে, এবং অতিব্যাবহারের ফলে এই সংস্কৃতিকে ওই জীবনানন্দের ভাষায় ‘শুয়োরের মাংস’ করে ফেলছে। এখন আমাদের শিল্পী সমাজের আশু প্রয়োজন হল বিকল্প পথ, বিকল্প ভাবনাচিন্তা করতে হবে এই সমস্যার সমাধানের জন্য।

ছয়লাপ: এই বিকল্প কি আমাদের সামনেই বর্তমান নাকি এটা আরও সময়সাপেক্ষ?

স.মু: দেখ, শুরুতেই বলেছি যে গুটিকয়েক প্ৰচেষ্টা ছাড়া, বাংলা সাহিত্যের যা সমকালীন অবস্থা, তাতে আমি অত্যন্ত হতাশ। একটা হীনমন্যতা কাজ করছে সারাক্ষণ। সবাই যেকোনও রকমে নাম করতে চাইছে। প্রত্যেকেই পনের মিনিটে আন্তর্জাতিক খ্যাতি চাইছে। তাঁরা মিডিয়ার কাছে সমর্পিত প্রাণ। একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে যে বাংলা সাহিত্য বলো, সিনেমা বলো বা রাজনীতি বলো সব ক্ষেত্রেই প্রকৃত প্রতিষ্ঠার অভাব। এটা বাংলার খুব বড় একটা দুঃসময়। তবে এই দুঃসময় তো সারাক্ষণ থাকতে পারে না। সমস্ত সংস্কৃতি এমনই একটা আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে যে আমার মনে হয় তরুণ প্রজন্ম একটা উর্বর জমি খুব শিগগিরিই খুঁজে বার করবে। সেই সময় আসন্ন।

ছয়লাপ: আচ্ছা ঋত্বিকের সিনেমায় আমরা দেখেছি সামাজিক প্রভাব খুব বেশি। দেশভাগের যন্ত্রনা আছে, আছে আর্কিটাইপাল মাদারহুড। ঋত্বিকের এক একটা সিনেমা সমাজের এক একটি দিকের প্রতিভূ। বারবার ওনার সিনেমায় সমকাল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঋত্বিক ছাড়াও আমরা বলতে পারি ‘মাদার ইন্ডিয়া’-র কথা। কিন্তু আজকের দিনে তৈরি সিনেমাগুলোর ক্ষেত্রে সামাজিক প্রভাব খুবই কম দেখা যায়। সমাজের বাস্তব চালচিত্র তুলে ধরার প্ৰচেষ্টা অত্যন্ত কম এখন। এ বিষয়ে আপনার কি মনে হয়, বর্তমান পরিচালকদের মধ্যে কেন এই অনীহা?

স.মু: আচ্ছা তোমাদের কি মনে হয় এখন যা তৈরি হচ্ছে তা কি আদেও সিনেমা? আমি কোনও একটা নির্দিষ্ট ধরণ নিয়ে বলছি না। সে বাণিজ্যিক হোক বা আর্ট ফিল্ম হোক বা দুটোর সংমিশ্রণ। স্বাধীনতার পরে পঞ্চাশ-ষাটের দশকে যাঁরা সিনেমা বানিয়েছেন, শুধু সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, রাজেন তরফদার এঁদের কথা নয়; তথাকথিত বাণিজ্যিক সিনেমার পরিচালক বলতে যাঁদের মনে করা হতো, যাঁদের দিকে নাক উঁচু বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা তাকাতেন না; সেই নির্মল দে, অজয় কর, তরুণ মজুমদার এঁরাও কিন্তু অসামান্য ছবি তৈরি করেছেন। বা যদি ধর মিডল সিনেমার ঋষিকেশ মুখোপাধ্যায়, অসিত সেন এঁরা যে ছবিগুলো বানিয়েছেন সেই ছবিগুলোর মধ্যে শ্রম এবং মেধা অনেকখানি জড়িয়ে ছিল। এখন তো যন্ত্রপাতির এতই উন্নতি হয়েছে, এডিটিং এবং ক্যামেরা এত উন্নত এখন যে এখনকার পরিচালকদের কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে। একসময় সৌমেন্দু রায় বলেছিলেন, ক্যামেরা এখন এত বেশি উন্নত হয়েছে ডিজিটাল এবং উন্নত এডিটিং এসে গিয়ে, যে তুমি আর সুব্রত মিত্র দুজনেই ছবি তুললে কোনটা তোমার তোলা কোনটা সুব্রতর সেটা বোঝা যাবে না! এখন এত বেশি ছবি তৈরি হচ্ছে এবং এত দ্রুত যে সামাজিক প্রেক্ষাপটকে মাথায় রাখার সময় কারোর নেই। ইদানিংকালে কি মনে পড়ে বাংলায় কোনও দিকদর্শনকারী ছবি তৈরি হয়েছে বলে? প্রতি সপ্তাহে গুচ্ছ গুচ্ছ ছবির নাম মিডিয়াতে ভেসে ওঠে আবার হারিয়ে যায়। কিন্তু তুলনামূলক যে ছবিগুলো একটু ভালো তা মোটামুটি টিকে যায় মানুষের মনে, তবে সেরম উল্লেখযোগ্য নয়। তোমরাই বল না, যদি সেরম সঠিক ভাবনাচিন্তা এবং সময় নিয়ে ছবি বানানো হত, তাহলে সেই ছবি কি এত সহজে মানুষ ভুলে যেত? তবে আমার মনে হয় বাংলা ছবিতে খুব একটা না হলেও, হিন্দি ছবি কিন্তু অন্যরকম ভাবনাচিন্তা করছে, কাজ করছে। এই বিষয়ে আমি খুব বেশি আলোচনা করতে রাজি নই। এরা অনেকেই আমার সহযোগী। কি জানতো থুতু উপর দিকে ছুঁড়লে নিজের মুখেই পরে। এটুকুই বলতে পারি এখন যা হচ্ছে তাকে ফিল্মের ইতিহাস কখনোই মনে রাখবে না, বাদ দিয়ে দেবে।
দেখো তুমি আমার সাথে কথা বলছ কেন? আমি তোমার সাথে কথা বলছি কেন? কারণ আমাদের মনে হয়েছে আমরা একা একা বাঁচাতে পারব না। মূল বিষয় হল আমাদের বেঁচে থাকতে গেলে কারোর কারোর সাথে কথা বলতে হবে, কারোর কারোর সাথে কাজ করতে হবে। একজন কবি বা একজন পরিচালক তো নিজের জন্য কিছু করেন না। তাহলে তো তিনি ঘরে বসে নিজের ডায়রিতেই সব লিখে রাখতে পারতেন, ঘরে বসেই ছবি দেখতে পারতেন। তাঁরা মানুষের জন্যে করেন। মানুষের জন্যে করলে আমি সমাজের কথা কিছু বলব না তা তো হতে পারেনা। একা থাকাও তো একটা সামাজিক সমস্যা। এই যে ঘরে ঘরে ডিপ্রেশন হচ্ছে এটা যতটা ব্যক্তিগত ততটাই সমাজিক সমস্যা। শুধু মাত্র প্রেম, শুধু মাত্র তুমি-আমি, আর রাজনীতি একটা খারাপ বিষয়, এ নিয়ে আমি কখনও কোনও ছবি যে কিছু বলব না; এইভাবে তো সিনেমা হতে পারেনা। এমনকি উত্তম কুমার-সুচিত্রা সেনের ছবিতেও কলকাতার নাগরিক সমাজ দেখা যেত। এখন যে কলকাতা দেখায় সিনেমাতে সে তো শুধু ফ্লাই ওভারের, সোডিয়াম-ভেপারের, রাজারহাটের কলকাতা। সেখানে প্রকৃত কলকাতা কোথায়? মানুষ কোথায়? মানুষ না থাকলে ছবি করে লাভ কী? লিখে লাভ কী? কোনও সংযোগই নেই। একটা সংযোগসেতু না থাকলে ফিল্ম, কবিতা, ভাস্কর্য পৃথিবীতে কোনও কিছুরই কোনও মানে থাকেনা। এটা যেন একটা লঘু চালের সস্তা বিনোদন। মানুষের চেতনার সম্প্রসারণ যে শিল্প ঘটাতে পারেনা সেই শিল্প শিল্পই নয়।

ছয়লাপ: ঋত্বিক ঘটকের প্রিয় সিনেমা হচ্ছে আইজেন্সটাইনের ‘ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন’। এখানে মন্তাজ মুভমেন্ট থেকে ঋত্বিক তৈরি করছেন এপিক ফর্ম। অর্থাৎ কোনও না কোনও ভাবে তিনি এই সিনেমার কাটিং বা অন্য বিষয়বস্তু থেকে অনুপ্রাণিত। কিন্তু আমাদের দেশে এখন যে সিনেমা তৈরি হচ্ছে সেখানে কি এই ধরনের অনুপ্রেরণা কাজ করে? আমরা কি দিনদিন কপি-পেস্টে বিশ্বাসী হয়ে উঠছি নাকি সত্যিই কোনও অনুপ্রেরণা এখনও কাজ করে?

স.মু: দেখো এই প্রশ্নের উত্তর যতটা আমি দিতে পারি ততটাই তুমিও দিতে পারো। তুমি এখন যে ছবিগুলো দেখছ তা দেখে তোমার যদি মনে হয় এরা অনুপ্রাণিত হয় ভিতর থেকে বা বাইরে থেকে, তাহলে তাই। আর তোমার যদি মনে হয় হচ্ছেনা, তাহলে হচ্ছেনা। এই যে এদিক থেকে ওদিক থেকে কিছু জুড়ে দিয়ে কিছু কথা বলা হলো, সে কথা কোথাও যায় না। তোমায় আমি একটা ছোট উদাহরণ দিই। তুমি এমন বাঙালি ছেলে দেখছ এখন যে কোনও বাঙালি নায়কের অনুসরণ করে, এমন কোনও বাঙালি মেয়ে দেখছ যে কোনও বাঙালি নায়িকার অনুসরণ করে! স্টারডম ব্যাপারটাই হারিয়ে গেছে। তাহলে তুমি পয়সা ঢালছ কেন? ব্যবসার জন্যেও না আর্টের জন্য তো ছেড়েই দিলাম। এই ছবিগুলোকে আর্টের কোন মানদন্ডে ধরব? এদের কথা হল পুরস্কার না পেলে আবার ভালো ছবি কি! কিন্তু পুরস্কার পেলেই যে ভালো শিল্প হবে তা কখনই না। জীবনানন্দ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এঁরা জীবনে কোনও পুরস্কার পাননি। কিন্তু তোমাকে তোমার ছবিতে তো নতুন কিছু বলতে হবে। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে যে নতুন কিছু ভাবনা আসছে, চেষ্টা আসছে তা আমরা বুঝতে পারছিলাম, ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে যে নতুন ভাষা আসছে তা আমরা বুঝতে পারছিলাম। অজয় করের ক্যামেরা চালানো যে অন্যরকম তা আমরা বুঝতে পারছিলাম। তপন সিংহের ‘গল্প হলেও সত্যি’ যে অন্য রকম ছবি তা আমরা বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু এখন আমরা কিছুই বুঝতে পারিনা। এখন শুধুই স্মৃতিকাতরতা। বাঙালির গল্প বলো, নাটক বলো, সিনেমা বলো; শুধুই স্মৃতি, শুধুই স্মৃতি। তুমি দেবব্রত বিশ্বাসকে ভাবছ, কি উত্তম কুমারকে ভাবছ, কি উনিশ শতকের বাংলাকে ভাবছ, সবই স্মৃতির পাহাড়পুঞ্জ।

ছয়লাপ: সঞ্জয়দা, ঋত্বিকের সিনেমায়, লেখায়, নির্দেশনায় আমরা অনেকবার দেশভাগের যন্ত্রণাকে পেয়েছি। ঋত্বিক নিজেও বলতেন, কোনও ঘটনাই অরাজনৈতিক হতে পারেনা। আজকে আমরা দেখছি আমাদের দেশ এখনও এই বিচ্ছিন্নতা সমস্যায় জর্জরিত। আমরা কাশ্মীর দেখতে পাচ্ছি। আরও আঞ্চলিক দিকে এলে, আমাদের পশ্চিমবঙ্গে গোর্খাল্যান্ড নিয়ে সমস্যা চলছে। বা আমরা আন্তর্জাতিকভাবে বিচার করলে, ক্যাটালুনিয়া এখন স্পেন থেকে আলাদা হতে চাইছে। আপনার কি মনে হয়, ঋত্বিক যদি এই সমকালীন হতেন, তবে ঋত্বিকের সিনেমা, ঋত্বিকের নির্দেশনা কতটা প্রাসঙ্গিক হতো?

স.মু: খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠত। এই যে বলা হয় যে ঋত্বিক শুধু মাত্র দেশভাগের ছবি করেছেন, একেবারেই তা নয়। ঋত্বিক আসলে একধরনের অবস্থানচ্যুতির কথা বলেছেন। মানুষের তথা সমাজের যে এক মানসিক বা নৈতিক অবস্থানচ্যুতি বা দার্শনিক অবস্থানচ্যুতি হলে কি হয় তার কথা উনি বলেছেন। আমি আমার নানা লেখায় অনেকবার বলেছি, ‘দূরে কাছে কেবলই ঘর ভাঙে, গ্রাম পতনের শব্দ হয়’। সেটা প্যালেস্টাইন হতে পারে, পেরু হতে পারে, সিরিয়া হতে পারে, সর্বত্রই হচ্ছে। যে মানুষ নিজেও জীবনে তাঁর একটা অবস্থান থেকে চ্যুত হন, সেই ঘটনাগুলো বলতে পেরেছিলেন বলেই ঋত্বিক ঘটক এবং তাঁর শিল্প, তাঁর মৃত্যুর পরেও এত জ্যান্ত আছে। আর রাজনীতির কথা বলতে গেলে বুঝতে হবে শুধুমাত্র বাইরের দিকে দিয়ে না অর্থাৎ ক্ষমতার রাজনীতিই শুধুমাত্র রাজনীতি না। Expressional Love is a kind of political statement। যখন দুর্গেশনন্দিনীতে আয়েশা বলেছিল যে,’এই বন্দী আমার প্রাণেশ্বর’ that is definitely a kind of political statement, বা মার্চেন্ট অফ ভেনিসে পর্শিয়া প্রেমের অভিব্যক্তি দেয় সেটা অবশ্যই রাজনৈতিক উক্তি। কেননা রাজনীতি মানে শুধু ভোট দেওয়া, সমাজের-প্রশাসনের কাঠামো পাল্টানো নয়। এমনকি সম্পর্কজনিত পরিবর্তনও কিন্তু রাজনীতি। কিন্তু এখন যা হয় সেটা আদতে পুতুল নাচ। একটা নির্দিষ্ট ভঙ্গিতেই ভাবনা-চিন্তার চলাচল, ছক ভাঙার দুঃসাহস নেই। এই যে নিজেকে প্রতিবন্ধী করে রাখার প্রচেষ্টা, এই প্রচেষ্টাটাই বাংলা সিনেমার সর্বনাশ করছে। আসলে জীবন সর্বতমুখী এবং সর্বব্যাপী। এখানে যেমন অন্য কিছু আছে, রাজনীতিও আছে। সব বিষয়েই কথা বলা উচিত। কিন্তু আমি যদি ভাবি আমি এগুলো বলব না, এগুলো নিষিদ্ধ, রাষ্ট্রযন্ত্র নিষেধাজ্ঞা চাপানোর আগেই যদি আমি নিজের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিই, তাহলে আমার ভূমিকা ওই পঙ্গু হয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু হবেনা, এবং সেটাই বাংলা সংস্কৃতিতে হচ্ছে।

ছয়লাপ: ঋত্বিকের সুবর্নরেখায় দেখেছি, একজন মহিলাকে একজন মা বলে ডাকছেন একজন বাগদি বউ বলে। এটা একটা ফর্ম যেটা ঋত্বিক বলতে পেরেছিলেন। বা যুক্তি তক্কো গপ্পে ছৌ নাচের যে শিল্পী তাঁর সাথে তাত্বিক পন্ডিতের তর্ক হচ্ছে, আবার তাকেই আত্মীয় বলে জড়িয়ে ধরছে। এই যে ভাবনা চিন্তাকে ভাঙাচোরা করার যে ফর্ম ঋত্বিক শুরু করেছিলেন সেটা এখন আর পাওয়া যায়না। একটা দৃশ্য মনে পড়ছে যেখানে একটা রমনের দৃশ্য শুধু মাত্র ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

স.মু: একদমই তাই। কোনও রকম শারীরিক সান্নিধ্য না দেখিয়ে উনি একটা যৌন মিলন বর্ননা করেছেন, আদতে ইতিহাসের দুটো মুহূর্তের মিলন। এটাই আমি বলছি, ভাষা, চলচিত্রের ভাষা। ভাষা পরীক্ষা। বাল্মীকি যেমন ক্রৌঞ্চ মিথুনের যে শোক সেখান থেকে শ্লোক সৃষ্টি করলেন, শিল্পীকে তেমন একটা ভাষা তৈরি করতে হবে। শুধু ঋত্বিক কেন, এরম কাজ সত্যজিৎ বাবুও করে গেছেন। দেবী এবং মেঘে ঢাকা তারা একই বছর একই সময় তৈরী ছবি। দুটোতেই দেবীর যে ভূমিকা, নীতাও তো জগদ্ধাত্রী আর দেবীকে দুর্গা বানানো হচ্ছে। তাদের যে যৌন বা অন্যান্য মানসিক অবদমন দেখানো হল বা তাঁদের যে মৃত্যুদৃশ্য যেভাবে বোঝানো হলো সরাসরি মৃত্যু না দেখিয়ে; একজন সর্ষে ক্ষেতে হারিয়ে গেলেন একজন হিমালয়ে। এই যে দেখানোর বিভিন্ন প্রক্রিয়া যা দেখে আপনার চৈতন্য হাজার হাজার জানলা খুলে আলোতে স্নান করবে, সেটাই শিল্পীর কাজ। এটা না করতে পারলে শুধু খবরের কাগজে নাম তোলার জন্য বা বক্স অফিস ভর্তি করার জন্য শুধু ছবি করে তো লাভ নেই। আসল কথা হল তোমার কিছু নতুন বলার আছে কিনা। বলার থাকলে সেটা সৎভাবে বলতে হবে। মানুষ মাত্রই সামাজিক জীব। আর সিনেমা তো একটা সামাজিক কর্ম। তাই তোমার ভৌগলিক অবস্থান, তোমার পারিপার্শ্বিক, তোমার সমকালকে শিল্পী হিসেবে তুমি অগ্রাহ্য করতে পার না।

ছয়লাপ: অনেক অনেক ধন্যবাদ সঞ্জয়দা। ভীষণ ভালো লাগলো আপনার সাথে কথা বলে। আমরা সমৃদ্ধ হলাম।

স.মু: ভালো থেকো তোমরা। তোমাদের পত্রিকার জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইল।

 

ছয়লাপের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ইন্টারভিউটি নিয়েছেন অভিজিৎ দে এবং ত্রয়ী দাস

Facebook Comments
শেয়ার

3 Replies to “আলাপচারিতায় সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়”

  1. সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের সংে ছয়লাপের এই আলাপচারিতা, প্রথম থেকে শেষ অবধি যে একটি মূল্যবান দলিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সমু-র পাণ্ডিত্য এবং জ্ঞানের পরিধি ছাড়ানো বিস্তৃতি ও আগ্রহ দেখে মুগ্ধ হলাম।…তবে এখন থেকে বেশ কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে গেলে, আধুনিক বিজ্ঞানের শুরুর সময়, তখন বিদ্যাক্ষেত্র এখনকার মতন এত বিভাগের খোপে আবদ্ধ ছিল না। শিল্পকলা জগতের একাধিক মানুষজন সে সময় বিজ্ঞান দুনিয়ার নানান অগ্রগতি ও উদ্ভাবন সম্পর্কে যথেষ্ট খবর রাখতেন। তেমনি বিজ্ঞানীদেরও শিল্পকলা জগতের সংে ছিল গভীর সংযোগ! জ্ঞানের একাধিক শাখায় বিচরণ করা এমন বহু চিন্তানায়ক, কবি, শিল্পী আর বিজ্ঞানীদের দৃষ্টান্ত আছে, যা আমার ‘বিপরীত পরাগ সং যোগ’ এবং ‘ দুই ভুবনের পারে’ বইয়ে দেখিয়েছি।… আক্ষেপের যে, তবু আমাদের সৃজনশীল কবি, শিল্পী বা বিজ্ঞানী-রা আজও সেই ‘ টু কালচার’ এর বিভাজন-পরম নিশ্চিন্তে চালিয়ে যাচ্ছেন!!… স.মু তাঁর কথায়, সহাবস্থান এবং ব্যবধানের এই চিত্রটি সুন্দরভাবে এঁকেছেন। একই সংে, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চলচিত্রের ভাষা নিয়ে বলা তাঁর কথাগুলি আমাদের সম্মৃদ্ধ করে তোলে।… অভিজিৎ দে এবং ত্রয়ী দাস-কে অভিনন্দন এমন একটি ফলপ্রসু আলাপচারিতার জন্যে!
    সিদ্ধার্থ মজুমদার

  2. চলচ্চিত্রের সঙ্গে আছে সাহিত্য । সঞ্জয় স্যারের ভাষণ শোনার চমৎকার অভিজ্ঞতা একবারই হয়েছে এ যাবৎ । হ্যাঁ, Eliot/Wasteland নিয়ে সেখানেও বলেছিলেন । ওই বক্তৃতা রেকর্ড করে রাখলে খুব ভাল হত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *