বোধ অন (নীলার্ণব চক্রবর্তী )

 

 

বোধন। যার সঙ্গে মদনের ইদানিং তুলনা হচ্ছে। কেমন সে তুলনা? তা গুণিজনের কথা অনুযায়ী, বোধন মানে বোধ অন আর মদন মানে মদ অন। এই শুনে আপনি বলে উঠতেই পারেন গুণিজন নিপাত যাক, আমরা গুণহীনে থাকব’খন! কোথায় বোধ অন আর কোথায় মদ অন। দুটোর মধ্যে তো কোনও মিলই নেই, ওই অন ছাড়া। তা ছাড়া যার বোধটি অন তার তো মদটি অফ হয়েই যাবে তাই না! গুণিজনেরা বলবেন, বৎস কিস্যু বোঝেন না আপনারা মহোৎসব দুগ্গাপুজোর। আর মদ মানে সুমহান সুরা সম্পর্কেও ধারণা আপনাদের অতিসীমিত। শুনুন দুর্গাপুজোর সুর কখনও সমে আসে না সুরা না হলে। আবার দেখুন সুর ও আসুরের মহাযুদ্ধই তো এই দুর্গাপুজোর নেপথ্যে। শেষে অসুর হেরে যাবে সুরের জয় হবে তো! সুরের জয় মানে যে সুরারই জয়। তাই বোধনে বোধ অন মানেই মদ অন। বুঝলেন তো এ বার! যদিও ঠাকুরদেবতার কথা এখন মানুষজন তেমন গা দিয়ে শোনে না। শুনলে ও জানলে দুর্গাপুজো নামে তো কোনও পুজোই হত না এখন। কারণ এ তো চণ্ডীর পুজো। দুর্গা মানে যিনি দুর্গাসুরকে বধ করেন। দুর্গের যিনি রক্ষক। বহু দুর্গে সেই হেতু দুর্গার দেখা মেলে। আর আমাদের এই পুজোটি হল যিনি মহিষাসুর বধ করেন, তাঁর। মার্কণ্ডেয় পুরাণানুযায়ী বললাম এ কথা। যদিও লৌকিক জগতে এমনি করে অনেক এতোলবেতোল হয়। এক বহতা নদী হয়ে সব কিছু বদলে বদলে যেতে থাকে।

তো এখন আপনার মনে এ প্রশ্ন উঠতে পারে কেন মদ বোধটি অন-এর কথা বলা হচ্ছে, বোধন প্রসঙ্গে? এর জন্য আপনাকে পৌঁছে যেতে হবে আমার ছেলেবেলায়। হাতে তালি দিয়ে যাওয়ার কায়দা তো গুগাবাবা হতে শিখেছেন। আর বাঙালি মাত্রেই ভূতের বরপ্রাপ্ত। কারণ এ জাতিটা গতজীবনে বেঁচে থাকে। কী করেছি কী হয়েছে ইন দ্য ইয়ার অফ…। কিন্তু কী করিতে হইবে, তা নিয়ে ছটাকও ভাবনা নাই। যাই হোক, আমার ছোটবেলায় পাড়ার মদনদা আমাকে বুঝিয়েছিল বোধন ও মদনের যোগসূত্র। বোধনের দিন সন্ধ্যাবেলা জলের বোতলে রক্তরঙিন জল এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, মেরে দে ভাই। তখন ক্লাস এইটে পড়ি, ও কোনও দিন মদ খাইনি। কিন্তু খেতে দেখেছি অনেককে। জিনিসটা সম্পর্কে দৃশ্যজ ধারণা অতএব আমার রয়েছে। সেদিন বস্তুটা ওই ভাবে আচমকা খেতে বলায় আমি হকচকিয়ে যাই ও না না করতে থাকি। তখন মদনদা আমাকে ঢালাও করে বোঝায় বোধন ও মদনের যোগাযোগ (কিছু বছর আগে মদের মাদকতায় সিরোসিস অফ লিভার হয়ে শ্মশানে সুখী হয়েছে সেই মদনদা)। সে দিন অনেক বাহানা অনেক তানানা করলেও আমার জীবনে ফুটেছিল মদের প্রথম  ফুল। আহা কী আলৌকিক সপ্নালু শিহরণ সেদিন।

তার পর বাড়ি পা-টলানিতে। বাবা তো খপাৎ ধরল ঢুকতেই। জলদগম্ভীর স্বরে: তুই মদ খেয়েছিস! ছি ছি ছি ছি …

তখন মদনদার বলা মদন ও বোধন যোগাযোগটা বললাম বাবাকে। মদ ও বোধ জাগরণের ব্যাপারটা বললাম। নেশা ঘুচে গেছে বলে সমস্যা হল না গুছিয়ে বলতেও।

বাবা সেই শুনে আরও  আগুনঝরা গলায় গর্জন করে কান ধরে সদর দরজার বাইরে নিয়ে গেল। তারপর দরজা সপাটে বন্ধ হল মুখের সামনে।

বোধনের রাত দরজার বাইরে মশার কামড় খেতে খেতে কাটল। আমার বোধও গুলিয়ে গেল সে দিন থেকে নিদারুণ।

 

Facebook Comments
শেয়ার

One Reply to “বোধ অন (নীলার্ণব চক্রবর্তী )”

  1. অসুর আর সুরা, মদন এবং বোধনে পূজার উদ্বোধনটা বেশ রসে বসেই কাটল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *