বাজারবাজি (সৌনক দাশগুপ্ত)

রাতের মিশমিশে কালো চাদরটা তখন প্রায় খসে পড়েছে। রোগা, দোহারা চেহারার মেয়ে মানুষটা হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে গ্রামের দিকে। আঁচলের খুঁট ধরে একটা বাচ্চা মেয়ে, তাঁর ঠিক পিছনেই দশ-এগারো বছরের একটা ছেলে। তারও পিছনে পরে আছে কাঁটাতার, দেশভাগ এবং ফরিদপুর। সামনে ধলদিঘি গ্রাম, উদ্বাস্তু শিবির, আসন্ন বাঁচার লড়াই।

-মা আইয়া পড়ছি তো, রিকশা থিকা নামেন এবার।

বেলুড়ের প‍্যারীমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের বাড়িটার সামনে এসে রিকশাটা দাঁড়িয়েছে। সুধে মানে ছেলে সুধীরনাথের কথায় ঘোর কাটলো অন্নপূর্ণা দেবীর। ধীরে সুস্থে রিকশা থেকে নামলেন, বয়স হয়েছে। সেই আটচল্লিশে ভিটে-মাটি-পুকুর, স্বামীর চিহ্ন সব কিছু ফরিদপুরের গ্রামে ছেড়ে এদেশে এসেছেন। ধলদিঘি থেকে বেলুড় অব্দি এই পথটা জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতায় পুষ্ট। রিকশা থেকে নামতেই গোপাল ছুটে এলো, পাড়ার ছেলে, ছবি আঁকে।

– ও বুড়িমা, ক্যামনে হইসে কন দেহি সাইনবোড খান?

অন্নপূর্ণা দাস, ওরফে সবার প্রিয় বুড়িমা সামনের দিকে তাকালেন; লাল-হলুদ বোর্ডে গোটা গোটা অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে ‘বুড়িমার আতশবাজি’।

হ্যাঁ, সুধী পাঠক ঠিকই ধরেছেন, এই হলো আমাদের অতি পরিচিত বুড়িমার ব্র্যান্ড। পশ্চিমবঙ্গের আতশবাজির বাজারে সব থেকে পরিচিত এবং জনপ্রিয় নাম। হ্যাঁ, বাজি বাজার। পশ্চিমবঙ্গের  ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পগুলির মধ্যে বাজি শিল্প অন্যতম। বেলুড়, বজবজের নুঙ্গি, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার চাম্পাহাটি-হাড়াল এই সব নামগুলো আমাদের সবার পরিচিত। রং মশাল, তুবড়ি, ফুলঝুরি, চড়কি- পরিচিত এই আতশবাজি গুলোর নামও। আমরা পরিচিত ধনতেরাসে ১০% ছাড়ে গয়নার সাথে, দেওয়ালির রাতে বাজির আলোয় চকচকে চোখ গুলোর সাথে, ফানুস হয়ে উড়তে থাকা উল্লাসের সাথে। রবিবাসরীয় গল্পে খুশি থাকা বাঙালি সঙ্গত কারণেই পরিচিত নয় বাজির বাজারের সাথে, বাজার অর্থনীতির সাথে, এই শিল্পের সাথে যুক্ত মানুষ গুলির সাথে।
তো বহু আলোকবর্ষ পেরিয়ে নয়, বাড়ি থেকে আধ ঘন্টাখানেকের দূরত্বে হাড়াল যাওয়া মনস্থির করলাম আমরা, মানে ছয়লাপের আলাপীরা। উদ্দেশ্য অবশ্যই বাজি শিল্পের বাজারগত দিকটা সরেজমিনে খতিয়ে দেখা।

প্রথমেই পাঠকদের একটা ভুল সংশোধন করা দরকার। বাজি বাজার হিসেবে সবার কাছে চাম্পাহাটির নামটাই সুপরিচিত। কিন্তু বাজি বাজার বা উৎপাদন কেন্দ্র কোনটাই কিন্তু চাম্পাহাটি নয়। মূল কেন্দ্র হল হাড়াল। চাম্পাহাটি লাগোয়া গ্রাম। ষাটের দশকের শুরুর দিকে রায়দুলাল দত্ত চাম্পাহাটি-হাড়াল অঞ্চলের প্রথম বাজি কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই শুরু। প্রতি বছর দুর্গা পুজোর দিনকয়েক আগে থেকে শুরু করে কালীপুজো পর্যন্ত চলে বিশাল বাজি মেলা। অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে তাকে ঘিরেই এলাকার মানুষগুলোর জীবনযাত্রার সাপ-লুডো খেলা চলে। প্রথম অভিজ্ঞতা হল বাজি বাজারে পৌঁছানোর খানিক পরেই। বাজারের আশেপাশে গোটা অঞ্চলে একটাই চায়ের দোকান বা গুমটি, বাজারের মূল প্রবেশপথ থেকে মিনিট দু-তিনেক দূরত্বে মেইন রোডের উপরেই। তো বাজারে ঢোকার আগেই একটু ওই বাজার সরকার গোছের মনোভাব নিয়ে স্থির হল একটু চা-সিগারেট সহযোগে শুরু করা যাক। দোকানটিতে গিয়ে দাম মেটাতে গিয়ে দেখলাম সব কিছুর দামই এক টাকা করে বেশি। জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল এটা শুধু মাত্র এই বাজি মেলার সময়টুকুই; কারন বছরের বাকি সময় দোকানটি তথৈবচ ভাবেই চলে। এখানেই শেষ নয়, আগামী তিন ঘন্টায় স্তরে স্তরে অভিজ্ঞতার পলি জমা হল আমাদের ঝুলিতে। পাঠকের সুবিধার্থে সেই সব দিকগুলোকে আলাদা আলাদা করে আলোচনা করা যাক।

সংগঠন অর্থাৎ বটবৃক্ষ: যেকোনও ব্যবসা-শিল্প ক্ষেত্রে  ব্যবসায়িক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। চাম্পাহাটি-হাড়াল বাজি বাজারও তার ব্যতিক্রম নয়। চাম্পাহাটি-হাড়াল আতশবাজি ব্যবসায়ী আ্যশোসিয়েশন। প্রায় শ’খানেক ব্যবসায়ীর জন্য ছাতার মত কাজ করছে। ব্যবসায়ীদের কথায়, যাবতীয় আইনি-বেআইনি ঝুট ঝামেলা সব আ্যশোসিয়েশন সামলায়। এই মেলা আগে এত সংগঠিত ছিল না। আ্যশোসিয়েশন তৈরি হবার পরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসা দোকানগুলো কে এক জায়গায় এনেছে। মেলা চলাকালীন যাতে কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে, জোর দিয়েছে সেই বিষয়েও। কারণ আতশবাজি এমনই এক উপাদান যে সামান্য অসতর্কতা ভয়াবহ দুর্ঘটনার জন্ম দিতে পারে। আদতে পুরো বাজারটাই তো জতুগৃহ। এই আ্যশোসিয়েশন-এর  ভূমিকা পরবর্তী বিষয়বস্তু আলোচনা করতে গিয়ে আরও স্পষ্ট হবে আমাদের কাছে।

‘লাই’-সেন্স অথবা লাইসেন্স: সাধারণ বিচার বিবেচনা বলে যে, কোনও ব্যবসা করতে গেলে সেটি আইনসম্মত অর্থাৎ লাইসেন্স প্রাপ্ত হওয়া জরুরি। বাজি ব্যবসাও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু ভুলটা ভাঙলো একটু জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করতেই। আদতে মাত্র ছয়-সাত জন ব্যবসায়ীর কাছে ডিলারশিপ লাইসেন্স আছে। তাহলে বাকিরা? বাকিদের জন্য দুটি উপায়:
এক. স্থানীয় পঞ্চায়েত অস্থায়ী লাইসেন্স দেয়, অবশ্যই সেটা আ্যশোসিয়েশন-এর অনুমোদনের পরে।
দুই. পুলিশ/আইনি সমস্যায় পড়লে দেখাতে হয় বৈধ লাইসেন্স প্রাপ্ত কারোর হয়ে আপনি ব্যবসাটা চালাচ্ছেন মাত্র। অর্থাৎ বাজির দোকানে আপনি বসে বিক্রি-বাটা করছেন, পুঁজি আপনার, মাল আপনার, কিন্তু আইন ধরলে ওই দোকানের মালিক হল বৈধ লাইসেন্স প্রাপ্ত ব্যবসায়ী। আপনি কর্মচারী মাত্র। বলা বাহুল্য এখানেও আ্যশোসিয়েশন-এর অভয়দান আছে। ব্যবসায়ীদের কথায়, আ্যশোসিয়েশনই এসব ঝামেলা সামলায় তাঁরা কোনও বিপদে পড়লে। বৈধ লাইসেন্স জোগাড় করতে যে পরিমাণ পুঁজির দরকার হয় তা আদতে নব্বই শতাংশ ব্যবসায়ীরই নেই। অথচ মানুষগুলোর জীবন-জীবিকা বাঘ-বন্দী হয়ে আছে এই বাজি শিল্পেই।

স্ব-শাসন, রাজ-শাসন ও প্রজা কথা: বাজি শিল্পে দু’রকমের ব্যবস্থা চলে; এক স্তরীয় এবং দ্বি-স্তরীয়। ব্যাপারটা কিরম একটু বিস্তারে আলোচনা করা যাক।
প্রথমে বলি দ্বি-স্তরীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে। এটা হল আদি-আদিম মালিক-শ্রমিক ব্যবস্থা। মালিক পক্ষ পুঁজি, মাল-মশলা, জায়গা সব কিছুর যোগান দেয়। কিন্তু হাতে সামান্য বারুদের আঁচটুকুও লাগে না। সব কাজ করে ঠিকা শ্রমিক। এরা মূলতঃ হাড়াল বা তার আশপাশের গ্রাম থেকে আসে। বয়স আট থেকে আশি সব রকম। হ্যাঁ, আট। মোট ঠিকে শ্রমিকের একটা বড় অংশই শিশু শ্রমিক। শিশুশ্রম এই বাজি শিল্পের একটা অন্ধকার দিক, আলোর শিল্পে আঁধারের নিকষ ছায়া। কারণ? কারণ শিশু শ্রমিকদের অনেক কম পুঁজিতে কাজ করানো যায়। আর তৃতীয় বিশ্বের যে দেশে আধার কার্ড না থাকায় রেশন না পেয়ে অনাহারে শিশু মৃত্যু ঘটে, সেখানে অন্ন-সংস্থানে বাড়ির বড়দের সাথে শিশুদেরও কাজে নেমে পড়াটা খুব একটা লজ্জার কিছু নয়! এমনিতেই আমরা ক্ষুদাতুর দেশের নিরিখে বিশ্বে প্রথম একশোয় নাম তুলে গৌরবান্বিত। তো প্রসঙ্গে ফিরি, এক ব্যবসায়ী তথা মালিকপক্ষের ভাষায়, ‘আরে মশাই কেউ কি পাগল নাকি, দিব্বি বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকতে বাজি বানাবো! জানেন কি কি কেমিক্যাল ব্যবহার হয়। বাড়িতে কারখানাও করিনি। এখানে শুধু মাল স্টক করি। আমার বৈধ লাইসেন্স আছে। সেটাই তো আসল। কজনের আছে! আমি সব জায়গায় মাল সাপ্লাই করি। সব কিছুর লোক ফিট করা আছে’। অর্থাৎ বাজি বানাতে গিয়ে মরলে শ্রমিক মরুক, আমি আপনি কেন!
এক স্তরীয় ব্যবস্থাটা একটু অন্যরকম। এখানে ব্যবসায়ী নিজের বাড়িতেই বাজি তৈরি করেন। না কোনও ঠিকে শ্রমিক নয়। বাড়ির সদস্যরাই তৈরি করে এই বাজি। এবং বাজারে বিক্রি করে। এদের সরাসরি লাইসেন্স নেই। পঞ্চায়েতের অস্থায়ী লাইসেন্স অথবা কোনও বড় ডিলারের লাইসেন্সের পরজীবী এরা। এই ধরনের ব্যবসায়ীরা চেষ্টা করেন প্রতি বছর নতুন কিছু বাজি তৈরি করার, বাজার ধরার জন্য। যেমন এক ব্যবসায়ী জানালেন তিনি সামনের বছর একটা নতুন বাজি আনছেন বাজারে যেটা পা দিয়ে ফাটানো যায়। ওনার মতে সব রকম পরীক্ষা করা হয়েছে, কোনও রকম আগুন ছিটোবে না। শুধুই শব্দ। এই বছরও তৈরি করেছেন নতুন ধরনের শেল, যেটা ইতিমধ্যে আইনি পরীক্ষায় পাস করেছে। এই শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের মূল পুঁজিটাই হল নিজেদের নৈপুণ্যতা। অথচ বাজারে এদের সংখ্যাই সব থেকে কম।

ফুল টাইম ও পার্ট টাইম : একথা ধরে নিলে ভুল হবে যে বাজি শিল্পের সাথে যুক্ত প্রত্যেকেরই সারা বছর এই একটি শিল্পের উপর নির্ভর করেই জীবন-জীবিকা চলে। আদতে এদের প্রত্যেকেরই বাজি ব্যবসার বাইরেও অন্য একটি করে স্থায়ী জীবিকা আছে। স্থায়ী বলছি এই কারণেই, বাজি কখনই এই মানুষগুলোর জন্য স্থায়ী জীবিকার উৎস হতে পারেনি। বিশ্বকর্মা পুজো থেকে শুরু করে কালী পুজো পর্যন্ত যে পরিমান চাহিদা থাকে সারা বছর তার কুড়ি শতাংশ চাহিদাও থাকে না। সেপ্টেম্বর-নভেম্বর, বছরের এই তিন মাসের জন্য এরা অবশ্যই সারা বছর ধরে প্রস্তুতি নেয়, বাজি তৈরি করে। কিন্তু জীবিকা অনুযায়ী তখন এদের কেউ দর্জি, কেউ মুদিখানা চালান, কেউবা সব্জির ব্যবসা। এই শ্রেণীটা মূলতঃ তারা যারা এক-স্তরীয় ব্যবস্থায় ব্যবসাটা করেন।
ঠিকে শ্রমিকরা মূলতঃ চাষবাসের কাজেই যুক্ত থাকে বছরের বাকি সময়। বা চাষবাসের পাশাপাশি টুকটাক বাজি তৈরির কাজ করেন মালিকপক্ষের অধীনে।
এরা ছাড়াও আর এক শ্রেণীর মানুষ আছেন, যাঁরা স্থায়ী চাকরি করেন; সরকারি অথবা বেসরকারি। কিন্তু পুজোর আগে পরের এই মাস তিনেক বাজি তৈরির কাজটাও করেন। উপরি আয়ের জন্যই।
কিন্তু এদের কেউই বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে বাজি শিল্পে যুক্ত নন। এদের কথায় বছর কুড়ি আগেও এত বড় বাজার ছিল না, ছিল না এত চাহিদা। অর্থাৎ বাজি বাজার বাড়ছে। বাড়ছে ফুল টাইম-হাফ টাইম কাজের যোগান।

আমদানি-রপ্তানি: পাঠক যদি ধারণা করে থাকেন নুঙ্গি, হাড়াল এসব জায়গায় সমস্ত বাজি সেখানেই তৈরি হয় তাহলে একটু ভুল হবে। দক্ষিণ ভারতের শিবকাশি থেকে অনেক রকমের আতশবাজি প্রতি বছর এখানে আমদানি করা হয়। রঙের বাহার এর দিক থেকে সেগুলো এখানকার আতশবাজির থেকে হয়ত অনেকটাই ভালো কিছু কিছু ক্ষেত্রে। এর মূল কারণ শিবকাশির ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বছরের অধিকাংশ সময় শিবকাশির আবহাওয়ার শুকনো থাকে অর্থাৎ বাজি শিল্পের মূল সমস্যা বৃষ্টি এবং জলীয় মেঘলা আবহাওয়া থেকে শিবকাশি অনেকটাই মুক্ত। সেদিক থেকে পশ্চিমবঙ্গে জ্যৈষ্ঠের শেষ থেকে শুরু করে আশ্বিনের শুরু অবধি বৃষ্টি চলে। শুধু তাই নয়, এর সাথে আছে চৈত্র-বৈশাখ মাসে বৃষ্টিসহ কালবৈশাখী। তাই রসায়ন ও পরিবেশ সঠিক অনুপাতে মিশে যাওয়ায় উৎকৃষ্টতার দিক থেকে শিবকাশির আতশবাজি যে এগিয়ে সে সত্য অস্বীকার করা যায়না। বছর ছয়েক আগে শিবকাশি থেকে একদল কারিগর এসে প্রশিক্ষণ দিয়ে যান স্থানীয় কারিগরদের। তার পরে কিছুটা গুণগত পরিবর্তন হলেও তা কখনই শিবকাশির সাথে তুলনায় আসে না; বিধি বাম সেই বৃষ্টি!
তবে এখান থেকে বাজি কি রপ্তানি হয়না? হয়। সারা বছরই সল্প হলেও চাহিদা থাকে। কাজ চলে। বাইরে রপ্তানি হয়। সারা রাজ্য থেকে খুচরো ব্যবসায়ীরা আসে। তবে জানা গেল এক অদ্ভুত তথ্য। এখান থেকে বাজি রপ্তানি হয় বেলুড়ে বুড়িমার কারখানায়। হ্যাঁ, কাঁচা মাল আসে মূলতঃ বড়বাজার থেকে। আতশবাজি এখানে তৈরি হয়, তারপরে চলে যায় বেলুড়ে বুড়িমার কারখানায়। সেখান থেকে লেবেলিং হয়ে চলে আসে বাজারে। অতএব হে সুধী পাঠক চাম্পাহাটি-হাড়াল এর বাজি শিল্পীদের নৈপুণ্যতা খাটো করার বিন্দুমাত্র কোনও উপায় নেই।

শিয়রে শমন: বাজি নিয়ে যখন কথা হচ্ছে তখন অনিবার্যভাবে আলোচনায় আসবে বাজি তৈরির উপাদান। ছেলেবেলা থেকেই জানার আগ্রহ ছিল কিভাবে ওই রঙ-বেরঙের বাজি তৈরি হয়। লাল, সবুজ, সোনালী, রুপোলি। যে ব্যবসায়ী দাদার সাথে কথা বলছিলাম তাঁকে জিজ্ঞেস করতেই সহজ উত্তর এলো। বেরিয়াম সবুজ রঙের জন্য, আ্যলুমিনিয়াম উজ্জ্বল রুপোলি রঙের জন্য, আ্যন্টিমনি ব্যবহার হয় চিকচিকে ব্যাপারটার জন্য, ক্যালসিয়াম লবণ কমলা রঙের জন্য, কপার ব্যবহার হয় নীল রঙের জন্য, লিথিয়াম ব্যবহৃত হয় লালচে ভাব আনতে এবং ইত্যাদি। কিন্তু এগুলো তো সবই আদতে মানব দেহের ক্ষতি করে। এই যেমন ক্যাডমিয়াম, এটা কিডনি আর নার্ভের জন্য যথেষ্ট ক্ষতিকারক। বা যদি ধরি নাইট্রেট, বাজি তৈরির অপরিহার্য উপাদান, অতিরিক্ত পরিমানে শরীরে প্রবেশ করলে মানসিক স্থিতাবস্থা নষ্ট করে। তেমনই কপার সরাসরি শ্বাস প্রবাহে প্রবেশ করলে স্বাভাবিক শ্বাস প্রক্রিয়ার যথেষ্ট ক্ষতি হয়। এবং সবথেকে ঘাতক, হ্যাঁ ঘাতক, অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল রাসায়নিকটি হল পটাশিয়াম ক্লোরেট। সরকারি ভাবে এটার ব্যবহার একেবারেই নিষিদ্ধ। কিন্তু আতশবাজি শিল্পে অত্যন্ত জনপ্রিয় এর ব্যবহার। তাই আইন ভেঙেই চলছে এর ব্যবহার। পটাশিয়াম ক্লোরেট সালফারের সাথে মেশানোর পরে এটি এতটাই বিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে যে ঘর্ষণে উৎপন্ন তাপশক্তিই যথেষ্ট হয় এর বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্যে। বছর কয়েক হল বাজি বাজারে নতুন একটি বাজি এসেছে- জেনারেটর বাজি। এর মূল উপাদানটাই হলো পটাশিয়াম ক্লোরেট। খোঁজ নিয়ে জানা গেল ইতিমধ্যেই এই বাজি বানাতে গিয়ে অসাবধানতায় গেছে বেশ কিছু প্রাণ। এই বছরই লক্ষ্মী পুজোর সময় পটাশিয়াম ক্লোরেট ভর্তি ড্রাম বিস্ফোরণ ঘটে দুটি শিশু শ্রমিকের প্রাণ গেছে। এটা নতুন নয়। বাজি শিল্পে মৃত্যুর হার ক্রমবর্ধমান। আইন যতই কড়া হচ্ছে, আইনের ফাঁক গলে বেরোতে গিয়ে ধরা পড়ছে মৃত্যুর ফাঁদে।

বাজারবাজি ও সমকাল: এত তথ্য, এত পরিসংখ্যান এসব কিছুই আদতে শুকনো কথা হয়েই থাকবে যদি বাজির বাজারের সমকালীন বাস্তব নিয়ে কিছু না বলি। চাম্পাহাটি-হাড়াল এর আগেও বেশ কয়েকবার গিয়েছি ওই দিকে কিছু বন্ধুর বাড়ি থাকার সুবাদে। বছর পাঁচেক আগে শেষবার। প্রতিবারই দেখেছি জমজমাট বাজার, মানুষের ঢল। ধাক্কা খেলাম এইবার গিয়ে। কালীপুজোর আগের শেষ রবিবার, অথচ সেই উন্মাদনা, সেই গা ঘেষাঘেষি মানুষের জোয়ার কই? আতশবাজির চাহিদা কি তবে কমে এলো? স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞেস করতেই উঠে এলো কিছু তথ্য।
প্রথমত, পরিবেশ সচেতনতা। একথা অস্বীকার করার জায়গা নেই  ইদানিংকালে সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে পরিবেশ সচেতনতা মূলক প্রচার যথেষ্ট গতি পেয়েছে। অতি বড় আতশবাজি প্রেমীও স্বীকার করবেন প্রতিটি আতশবাজি আমাদের জলবায়ুগত ভারসাম্যকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাই সমাজের একটা বড় অংশ আতশবাজি বয়কট করছেন এবং বাকিদেরও আতশবাজির ক্ষতিকর দিক গুলো বুঝিয়ে তা ব্যবহারে বিরত করছেন। দীপাবলী প্রকৃত অর্থেই আলোর উৎসব হয়ে উঠছে অনেকাংশে।
দ্বিতীয়ত, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এবং সরকার যৌথভাবে বহু শব্দবাজি এবং ক্ষতিকর বাজি নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। অথচ এই বাজি গুলো সাধারণ মানুষের কাছে ভীষণ রকম জনপ্রিয় ছিল। বছর কয়েক আগে অব্দি যাও লুকিয়ে চুড়িয়ে এসব বাজির উৎপাদন চলছিল, এখন আইনি কড়াকড়িতে তা সম্পূর্ণ বন্ধ। তার বদলে নতুন যেসব বাজি উৎপাদন হচ্ছে জনসাধারণ বিশেষ করে যুবসমাজ তাতে খুব বেশি উৎসাহী নয়। অথচ বাজির বাজারে ক্রেতার সিংহভাগ কিন্তু যুবসমাজ।
তৃতীয়ত, বছর কয়েক ধরে চাম্পাহাটি-হাড়াল যাওয়া আসার পথে বেড়েছে পুলিশি কড়াকড়ি। ব্যবসায়ীদের কথায় জুলুমবাজি। বাজি কিনে ফেরার পথে অনেক সময়ই সাথে শব্দবাজি না থাকলেও সমস্ত বাজি আটক করা হচ্ছে। দিনের শেষে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে ক্রেতাকে।
চতুর্থত, এইসব কিছুর উপরে মরার উপর খাঁড়ার ঘা এর মত কাজ করেছে জি.এস.টি। ঊনত্রিশ শতাংশ জি.এস.টি দিতে হচ্ছে বাজির কাঁচা মালের উপর। স্বাভাবিক ভাবেই দাম বেড়েছে আতশবাজির। যার ফলে অন্য বছরের তুলনায় এবছরের উৎপাদন কমেছে। সল্প পুঁজি সম্বলিত বহু ব্যবসায়ী এবছর পসরা সাজিয়ে বসেনি। পাল্লা দিয়ে কমেছে ক্রেতা।

সাম্প্রতিককালে সুপ্রিম কোর্ট দিল্লীতে এই বছর সমস্ত রকম বাজি নিষিদ্ধ করেছে। প্রায় একই পথে হাঁটতে চলেছে মহারাষ্ট্র সরকার। সারা দেশ জুড়েই পরিবেশবিদরা আতশবাজি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ঝাঁপিয়েছেন। পরিবেশ আদালতে মনে হয় হাজার হাজার মামলা চলছে আতশবাজি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে। আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যেভাবে বেআইনি, নিষিদ্ধ উপাদান প্রয়োগ করা হচ্ছে আতশবাজি শিল্পে, তা আদতে এই শিল্পের প্রতিই বিপদ ঘনিয়ে আনছে। এবং এর সাথে আছে নিয়ন্ত্রণহীন শব্দবাজি, বেলাগাম আতশবাজির ব্যবহার। কিছু দায় যেমন এই শিল্পের সাথে রুজি-রোজগারে বাঁধা পরা মানুষ গুলোর, ততোধিক দায়ভার আমাদের। বেলাগাম আমরাই হই; উলঙ্ঘনের উল্লাসে, বেপরোয়া নিশিডাকে।

 

 

Facebook Comments
শেয়ার

2 Replies to “বাজারবাজি (সৌনক দাশগুপ্ত)”

  1. সময় করে পড়া হচ্ছিল না। তবে দারুণ লাগলো। এই ধরনের লেখা আরো লেখ। অনেক আগ্রহ রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *