ফ্যাকাশে আত্মা ও একটি আনকোরা কালার প্যালেট সম্পর্কে এই মাত্র যা ভাবলাম/দেবজিৎ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়

পর্ব ৪

।চ।

departure, arrival, departure

সারা সত্যি হলো।সারা মিথ্যে হলো। হেনরি ফিরে আসে,সেটাও লাঞ্চের আগেই। সারার মুখ চোখ উজ্জ্বল হয়ে যায়। হেনরি লাল চোখ( যা সারা রাত নেশা ও জেগে থাকার জন্য হয়েছে), ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ঢুকে মৃদু হাসে। নিজের টি শার্টটা খুলে চেয়ারের ওপর রেখে বাথরুমে ঢুকে যায়। সারা চোয়ালে শক্ত করে বল্লো,”দেখলে? কিছু বুঝলে?”।যথারীতি আমি কিছুই বুঝিনি,অন্ততপক্ষে সারা কি বোঝার কথা বলছে,তাও না। সে কেটে কেটে বলে,
– হেনরির টি’তে সেই বাজারী পারফিউমটার গন্ধ…ঘাড়ের কাছে কামড়ের দাগ…

হেনরি বাথরুমের শাওয়ার ছেড়ে সেই অন্য ভাষার ভীষণ যৌনতা ঠাসাঠাসি গানটা গাইতে শুরু করেছে। সারার মুখ চোখ কঠিন হয়ে আসছে।

হেনরি বাথরুম থেকে বেড়িয়ে সেদ্ধ মাংস, বান খেয়ে ঘরে ঢুকে ঘুমাতে শুরু করলো মরার মত। সে যেনো এক খুলি ঘুম নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। সারা গ্যাঁট হয়ে সোফায় বসে রইল। সে লাঞ্চ স্কিপ করলো এবং আমাকে খানিকটা বাধ্য হয়েই তাকে ছাড়াই খেয়ে নিতে হলো।

(তোমার বাড়ি গিয়ে দেখেছি,আবার তোমরা বাড়িসুদ্ধ কোথাও চলে গেছো। তোমাদের সবার একসাথে চলে যাওয়া কি করে এত এত ঘনঘন পায়,আমি বুঝি না। তোমাদের দরজার নিচ থেকে আজকের খবরের কাগজটা নিয়ে এসেছি কারণ ওটা পড়ার কেউ নেই। তাতে কয়েকখানা দারুণ খবর আছে। কোথাও একটা দীর্ঘদিনের নদী জেগে উঠেছে, একজন স্ত্রী তার পুরোন প্রেমিকের সাথে ফন্দি করে স্বামীকে খুন করেছেন, কর্পোরেশন এর কুকুর ধরা গাড়ি পাড়ার প্রিয় কুকুরটাকে ধরতে গেলে বিক্ষোভের মুখে পরে, একটি বাচ্চাছেলে নিজেই নিজের কাটা হাত নিয়ে ডাক্তারের কাছে যায়-কারণ সে কার্টুনে দেখেছে এরকম)

বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দেখি,হেনরি তখনও ঘুমাচ্ছে। সারা সম্ভবত সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। এখন সে নিজের জন্য কফি বানানোর জল নিচ্ছিলো সসপ্যানে। আমাকে আড়চোখে দেখে আমারও জল নেয়। কফি ও সিগারেট খাওয়ার পর,আমি সারাকে জানাই,আমার বোধহয় তাকে ও হেনরি কে আলাদা সময় দেওয়া উচিৎ। কারণ এর আগে প্রত্যেকবারই এরকম ঝগড়ার পর মীমাংসাদর্শন করতে হয়েছে তাদের উগ্র সেক্স দিয়ে,যা আমার তৃতীয় পক্ষ স্বত্বার কাছে বেশ অস্বস্তিকর। সারা কেটে কেটে বলে,

-তুমি যে কারণে পালাতে চাইছো,সে সব কিছুই হবে না। যদিও আগের সবকিছু তোমাকে যথেষ্ট অস্বস্তি দিয়েছে তা স্পষ্ট। তার জন্য আমি দুঃখিত। তবে আজ থেকে যাও। আজ ওরকম কিছু হবে না। আজ তোমার থাকাটা প্রয়োজনীয়।

আমি সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে ছাদের দিকে চলে যাই।

।ছ।

when you utter dirty secret, it brings the winter

একঘেয়ে বিরক্তিকর ভাবে তিনদিন কেটেছে। উল্লেখযোগ্য কিছু তেমন ঘটেনি বলে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেওয়ার দরকার নেই। আমি এই তিনদিনের প্রত্যেকদিন শহরে গেছি কামানোর ধান্দাতে,এবং কামিয়েওছি প্রচুর। সারা বাড়িতেই ছিলো (একদিন শুধুমাত্র তাকে জ্বর ও পেটে ব্যাথার ওষুধ এনে দিতে হয়েছিলো)। হেনরিও বাড়িতেই থেকেছে। যদিও সে তার জমানো টাকা দিয়ে প্রচুর মদ, মারিজুয়ানা ও মাংস কিনেছে। তার এমন হাবভাব,যেনো বড় কোন খনির সন্ধান পেয়েছে, ফলে তার নিজেস্ব সঞ্চয় সে দেদার খরচা করছে।

জানো তো শহর টহরগুলো
খুব অদ্ভুত অদ্ভুত মানুষে ঠাসা
অনেকে পাপেটেও
আর সেখানে আমার রোজগারও বেশ ভালোই হয়
ফলে শহর আমার খুব ভালোলাগে
যদিও লোকজন যে কেন তার কালো কালো ধোঁয়া,পাট কলে ফ্যাঁসা ভর্তি বাতাস, হরেকরকমের পারফিউমের গন্ধ আর যক্ষা রোগিদের একটানা কাশির শব্দে বিরক্তিবোধ করে কে জানে

আজ অনেকটা বেশিই কামিয়ে ফেলেছিলাম ফলে
এক বেশ্যার সাথে দরাদরি করেছি
এমনি মজা করেই
সে পাঁচশো থেকে শুরু করেছিলো
আমিও দুঁদে হাবভাব করে দরকষাকষি করে
শেষতক ভাত ডালে পাকা করি
সে খানিক মেনেও নেয়
তবে আগে খাওয়ানোর শর্ত ছিল

সে আঁচানোর পর তাকে বলি,
আমার তাকে করার ইচ্ছে নেই
সে বলে,খেয়েছে যখন তখন সে সার্ভিস দেবেই
ওই সাদা গাড়ির পেছনে সে আমাকে ব্লোজব দিতে পারে
আমি তাতেও না বললে,
সে খানিক বিরক্ত হয়
বুক থেকে কড়া সস্তা সিগারেট বাড় করে ধরায়
আমাকেও দেয়
তারপর দমক দেখিয়ে বলে,
এসব ভালমানুষি দেখিও না তো বাপু…গা ম্যাজম্যাজ করে…ঢং দেখিও না তো…
ঈশ্বর অব্ধি ছাড়লো না,আর এ এসেছে ভালোমানুষি দেখাতে…
চলো ঝটপট…সিগারেটের ঝ্যাঁকা আর বোঁটা কামড়াবে না…ব্যাস তাহলেই হবে…

আমি দেখি
সে শহরের প্রত্যেকটা মানুষকে এই একই কথা বলে চলেছে…অনেক আগে থেকে অনেক পরে পর্যন্ত…

সারা কোথাও গেছিলো আজ সন্ধ্যেবেলা। ঘামতে ঘামতে ফেরে। হেনরি তখন লোকাল কাফেতে গেছে সন্ধ্যে কাটাতে। সে রান্নাঘরে ঢুকে হেনরির জন্য বানানো রাতের স্যুপে কিছু একটা মেশাচ্ছিলো। আমি তা দেখে ফেলি। বিষ? সারার সাথে চোখাচোখি হয়। সে প্রথমে ব্যাপারটা লোকানোর চেষ্টা করলেও পরে নিজে থেকেই বলে,আজ সে মিসেস ব্ল্যাকের কাছে গেছিলো। সে নাকি তুকতাক জানে। নিজের প্রেমিক টিকেও সে প্রায় কুকুর বানিয়ে রেখেছে। সারা কে কিছু একটা দিয়েছে। হেনরি নাকি তাতে বশে থাকবে। আমি সারার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। সে অসহায় বোধ করে। আমি তার চোখে শীতল দৃষ্টি আটকে রাখলে,সে এক সময়,”এই নোংরা জঞ্জালময় স্বার্থপর পৃথিবীতে একলা থাকলে চাই না” বলে বিচ্ছিরি রকমের ভুতুড়ে চিৎকার করে হেনরির স্যুপের ব্যোলটা মাটিতে আছাড় মারে।

সারা বেড়িয়ে যায়। আমি অস্বস্ত হই। যদিও বাড়িতে বাসন সংখ্যা কমা নিয়ে চিন্তায় মাথা যন্ত্রণা শুরু হলো।

 

 

তৃতীয় পর্ব

Facebook Comments
শেয়ার

One Reply to “ফ্যাকাশে আত্মা ও একটি আনকোরা কালার প্যালেট সম্পর্কে এই মাত্র যা ভাবলাম/দেবজিৎ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *