গল্প : নিখোঁজ নিয়ে যা বলা যায়

 

নিখোঁজ নিয়ে যা বলা যায় – সৌনক দাশগুপ্ত
নাম- খোকন নস্কর
জন্ম: ১১/০৯/২০০৯
বয়স: ৮ বছর
উচ্চতা: ৪ ফুট ২ ইঞ্চি
গায়ের রঙ চাপা, বাঁ গালে আঁচিল, পরনে ছিল লাল রঙের গেঞ্জি ও সবুজ প্যান্ট।

গত ২৯শে সেপ্টেম্বর চরকডাঙ্গা বাদুড়তলা দুগ্গা মেলা থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়। খোঁজ পেলে অনুগ্রহ করে নিচের ঠিকানায় যোগাযোগ করুন:

মনোহর নস্কর
নস্করপাড়া, জোড়া কল
চড়কডাঙ্গা
থানা: বারুইপুর
দক্ষিণ ২৪ পরগণা

———————————-

দরজা দিয়ে উঠেই বাঁদিক থেকে তিন নম্বর সিটটায় বসেছে নচিকেতা। জানলার ধারে। আধুনিক কলকাতার পুরোনো বাড়ির সাথে যে গরাদের জানলাগুলো নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে, তাদেরকে আসলে ট্রেনের জানলায় পাওয়া যায়। শিকগুলো এদেশের রাজনৈতিক রোজনামচার জলজ্যান্ত সাক্ষী। গদি আসে গদি যায় চুক্তি পাশে নিয়ে, কিন্তু শিকগুলো বদলায় না। আমাদের গল্পে যে জানলাটার ধরে নচিকেতা বসেছে, তার উপরে গোটা কয়েক নিরুদ্দেশের পোস্টার সাঁটানো, খোকন নস্কর বলে কোনও এক বাচ্চা ছেলের। গোলাপি, হলুদ আর সাদা, তিন রঙের পোস্টার। আর পাঁচজনের মত নচিকেতারও চোখে পড়েছে, যেমন পড়তে হয় আরকি! পোস্টার গুলোর কয়েকটা গোটা আছে, কয়েকটার উপর আবার ভালোবাসাবাসি আঁকা, কয়েকটা কান ছিঁড়ে ট্রেনের হাওয়ায় দুলছে। রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার মত। বহুদিন পরে এইদিকে আসছে ও, প্রায় বছর কুড়ি। ভালই লাগছে নচিকেতার। ট্রেনের জানলা জুড়ে হেমন্তের রেশ। কাঁচা পাকা চুলগুলোও কিরম ওপর দিকে উড়ু উড়ু করছে। এই সময়টা ডাউনের ট্রেনে ভিড় কম। লোকজন যা আছে তাঁদের কথাবার্তায় নচিকেতা বুঝতে পারছে নামখানা-লক্ষ্মীকান্তপুর লাইনের স্কুলে পড়াতে যাচ্ছে এরম শিক্ষকই বেশি কম্পার্টমেন্টটায়। নানা রকম আলোচনার বেচা-কেনা চলছে। মেয়ের স্কুল, ছেলের দুধ, বকেয়া ডি. এ, বিরাট কোহলি, মোদি-মমতা কিছুই বাদ নেই। নচিকেতার পাশের লোকটা টোয়েন্টি নাইনের হিসেবটা সবে সেরেছেন, ট্রেনটা নরেন্দ্রপুর স্টেশনে থামল। স্টেশনের ওপর ছাতিম গাছটা দিব্বি নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। কলেজ হস্টেলের গা ঘেঁষেই একটা ছাতিম গাছ ছিল, নচিকেতার তিনতলার রুমের জানলা দিয়ে দিব্বি হাত পাওয়া যেত। গাছটা যখন ফুলে ভরে যেত, নচি জানলা খুলে আয়েশ করত, ছাতিমের  গন্ধ নিয়ে। রুকসানার গায়ের গন্ধটা খানিক ওরকমই ছিল। ছেলেবেলায় লুকোচুরি, বাঘ-বন্দি সব কিছু জুড়ে ছিল গন্ধটা। তারপর একদিন রুকসানা চলে গেল, গন্ধ নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে। নচিকেতা গন্ধটার প্রেমে পড়ল, আদর করত, জানলা জুড়ে। যেমন এখন করছে।
নরেন্দ্রপুর থেকে সোনারপুর যাবার পথে রেলের কারসেড পড়ে। সার সার ট্রেন অপেক্ষায়, কিছু মরচে পরা পুরোনো বগি, বাতিল, নিত্যযাত্রীদের স্মৃতি থেকে নিখোঁজ।
তো ট্রেনটা আস্তে আস্তে সেই কারসেড পার করে সোনারপুর ঢুকছে। কলেজে পড়ার সময় অনেকবার এসেছে নচিকেতা সোনারপুরে। সৌম্যর বাড়িতে। ওরা একসাথেই পড়ত কলেজে। চাঁদমারী ঝিলপারে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে আড্ডা দিত, ঘাসের শরীর ফ্যাকাশে হয়ে আসত ওঁদের সিগারেটের ছাইয়ে। ঘাটের শ‍্যাওলা ধরা সিঁড়ি গুলো সাক্ষী ছিল সৌম্যর প্রথম প্রেম ভাঙার, বিয়ারের ক্যান ঠোকাঠুকির। সৌম্যর মা খুব ভালো ঘুগনি রাঁধতেন। নচিকেতা এলেই ওর জন্যে দু’বাটি ধরাবাঁধা ছিল। নচিকেতা বুঝতে পারত ওই বাড়তি বাটিটা আসলে কাকিমার আশ্রয়, আস্কারা। উহুঁ এখন আর সোনারপুর আসা হয়না। সৌম্য ইউ.এস-এ থিতু হয়ে গেছে, কাকিমা কাকু কেউই বেঁচে নেই। একে একে সবাই নিরুদ্দিষ্ট। ছেলেবেলায় নচিকেতা লুকোচুরি খেলতে ভালোবাসত খুব। ওর খালি মনে হতো লুকিয়ে লুকিয়ে ও হারিয়ে যাবে। কেউ টেরটিও পাবেনা। কোনও বাঁধন নেই, দেশে দেশে ঘুরে বেড়াবে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে হারিয়ে যাবে।
ট্রেনটা জয়নগর স্টেশন পৌঁছাল সবে। এখানে বাতাসে অক্সিজেন নয়, বেঁচে থাকার রসদ যোগায় নতুন গুড়ের গন্ধ। ঢিমে আঁচে গুড় পাক হবার গন্ধ, সর্বনাশা নেশা। স্টেশন জুড়ে অনেক মিষ্টির দোকান; মোয়া, গুড়, পাটালি নিয়ে। নোটনদের দোকানটা শেষ মাথায় একদম। নোটন সকাল সকাল বাবার সাথে দোকানে চলে আসে, গুড় নিয়ে। আসলে স্টেশনটা ওকে টানে। ট্রেনগুলো আসা যাওয়ার পথের মাঝে ওর জন্যে স্বপ্ন রেখে যায়। সেও একদিন ট্রেনে চাপবে, দূরে যাবে, জানলার ধারে বসে। ধানক্ষেত, খেজুর গাছ, মা’র হাতের পুঁটি মাছের ঝাল সব্বাই হয়ত ওর সাথে আসবে, কিন্তু ও কারোর জন্যে টিকিট কাটবে না। ও একাই চাপবে ট্রেনে। কলকাতা যাবে। ওখানে নাকি একটা বইয়ের পাড়া আছে, খালি বইরাই থাকে। নোটনও সেই পাড়ায় থাকবে। বই পড়বে, শিখবে কি করে মানুষকে মরে যাওয়া থেকে আটকাতে হয়। বাবা তো জানেনা, তাই মা’কে আটকাতে পারল না। নোটন সাদা জামা পরে ডাক্তার হবে। নোটন হারিয়ে যাবে। কিন্তু ওর বাবা কি নিরুদ্দেশ নিয়ে বিজ্ঞাপন দেবে?

নাম : নচিকেতা মন্ডল
জন্ম: ১২/০৭/১৯৮৭
বয়স: ৩০
ঠিকানা: মনসাপাড়া, জয়নগর
গায়ের রঙ...

সামাজিক কর্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *