আমার পুজো তোমার পুজো ২ – অভিজিৎ পাল

 

“এসেছে শরৎ হিমের পরশ লেগেছে হাওয়ার পড়ে

সকালবেলা ঘাসের আগায় শিশিরের রেখা ঝরে”

রবি ঠাকুরের লেখা ছড়াটার বাস্তব ছবি খুঁজে বেড়ায় হাফ হাতা গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পড়া দেড়ফুটিয়া একটা ছেলে,  বয়সে নেহাতই কাঁচা। খুদে খুদে হাত পায়ে আর বিস্ময়ে ভরা দু’চোখে আবিষ্কার করতে চায় যেন ওই লেখার অর্থ।  শরৎকাল কেমন, এই সময়ে প্রকৃতির রূপই বা কেমন থাকে,  সাদা পেঁজা তুলোর মত মেঘেরা আকাশের বুকে ভেলা ভাসিয়ে দেয় বা বিস্তীর্ণ মাঠ -প্রান্তরের বুকে কাশফুলেরা শারদীয়ার আতুর হাওয়া গায়ে মেখে মাথা দোলায় পরম শান্তিতে-একটু একটু করে বুঝে নিতে তার অসুবিধা হয় না মোটেই।  নীলাভ আকাশের গায়ে যেন সূর্য্যিমামাও মাতোয়ারা হয়ে নিজের তেজ মিহি করে ফেলতে বাধ্য হয় কিছুটা, আসলে আনন্দের ছোঁয়াচ থেকে সেই’ই বা বাদ কেন যাবে?  শরৎকাল মানে উৎসবের ঢাকে কাঠি পড়া, ড্যাংকুড়াকুড় বাদ্যিতে মনপাখি ডানা মেলে দেয় উজ্জ্বলতায় স্নান করবে বলে, দুগ্গা ঠাকুর সেইই এক বছর বাদে আবার আসছে বাপের বাড়ি,  ঘরের মেয়েকে বরণ করে নেওয়ার জন্য পাড়া প্রতিবেশীরাও তাই উষ্ণ অভ্যর্থনার ডালি সাজিয়ে প্রস্তুতিতে মজে। মা যে সব্বার,  তাই আকাশচুম্বী বাড়ি থেকে কুঁড়েঘরের মানুষ, যে যার সাধ্য মত চেষ্টা করে পুজোর এই ৫টা দিন সমস্ত বিষাদ অভিমান দুঃখ ভেদাভেদ ভুলে গা ভাসাতে আনন্দ জোয়ারে।  ‘অবাক পৃথিবী, অবাক করলে তুমি’-ঠিক এমন অভিব্যক্তি নিয়েই ওই ছোট্ট ছেলেটার শরৎকালের রূপে রসে সুগন্ধে ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ এক্কেবারে।  শুকতারা বা আনন্দমেলার পুজোবার্ষিকীটা পেপারকাকু যেদিন বারান্দায় রেখে যায়,  ছোট্ট ছেলেটার পুজোর যেন ওইদিনই শুভ সূচনা,  মহালয়ার আগেই একরাশ খুশি এসে ওকে পেয়ে বসে,  পুজো পুজো গন্ধ শুধু আকাশে বাতাসে নয়,  লেগে রয়েছে ওই বইয়ের প্রতি ভাঁজে ভাঁজে।  লেখাপড়ার বইয়ের আছিলায় অলস দুপুরগুলোয় তখন মায়ের চোখ রাঙানির আড়ালে গিয়ে গোগ্রাসে পড়ে নেওয়ার পালা বহুল প্রতীক্ষিত পুজোসংখ্যার।

এই ধেড়ে বয়সে এসেও যেন মনের আনাচে কানাচে নিরন্তর উঁকি দিয়ে দেখে চঞ্চল ওই ছোট্ট ছেলেটা,  ফেলে আসা দিনগুলোর অমোঘ আকর্ষণ আর বুক চিনচিনে ব্যাথাটা উপলব্ধি করি আজও।  এই চালাকফোন আর সোশ্যাল মিডিয়ার টেকস্যাভি যুগেও যেন মনটা আনচান করে ওঠে মুঠো থেকে খসে যাওয়া মুহূর্তগুলোর জন্য।  যখন খুব ভোরে দাদাইয়ের সাথে শিউলিফুলের বিছানো গালিচা থেকে ফুল তুলে আনতাম সাজি ভরে আর ঠাম্মি যত্নে মালা গাঁথত ওই ভোরের মিঠে গন্ধ মাখানো শিউলি দিয়ে, হাতে কমলা ছাপ পড়ে যেত বোঁটার রঙে লেগে।  সারাবছর ইস্কুলের মাঝে ওই একমাস টানা ছুটির আনন্দে আত্মহারা হওয়ার মতই ব্যাপার ছিল।  হোমওয়ার্ককে একটু সরিয়ে রেখে তখন শুধু আঙ্গুলের কর গোনার পালা!যৌথভাবেই এ বাড়িতে বেশ কয়েকঘর পরিবার আমরা একসাথে থাকতাম আর তখন কাছের সমবয়সীদের সাথে একটা বিষয়ে প্রতিযোগিতা হতই,  সেটা হলো পুজোয় কার কটা নতুন জামাকাপড় হলো।  আসলে কাঁচা বয়সের বোধের বিকাশ সেভাবে হয়নি,  নাহলে এখন বুঝতে পারি বেশ যে আমারই মত কত কত রক্ত মাংসের মানুষগুলোর এই আনন্দের দিনে একটুকরো কাপড়ও জোটে না।  খারাপ লাগে কিন্তু সত্যি এখানে এসে বারবার হেরে যাই যেন।  ক্রমাগত পাওয়ার জন্য আশায় উন্মুখ হয়ে থাকা জীবনে চাহিদার শেষ থাকে না,  অন্যদিকে অনেকের পেটে ক্ষুধার ভাতটুকুও জোটে না কোনো কোনোদিন।  এ এক বড্ড কঠিন আর নিষ্ঠুর বাস্তব,  যা সমান্তরালভাবেই সমাজে বয়ে চলেছে।

দুর্গাপুজোর নস্টালজিয়াতে অনিবার্যভাবেই থেকে গেছে আমার এলাকার উৎসবমুখর দিনগুলোর স্মৃতি, তার ঢিল ছোঁড়া দূরত্বেই গঙ্গাপাড়ের স্বনামধন্য উত্তর কলকাতা, যার কথা বললেই একসাথে অসংখ্য রঙিন প্যাস্টেল রঙা ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে,  নাড়া দিয়ে যায় ব্যাপকভাবে।  থিম পুজো কারে কয়,  সেটা টের পেয়েছি অনেক পরে,  গোঁফের রেখা সবে দেখা দিয়েছে তখন।  তার আগে অব্দি প্যান্ডেল আর প্রতিমা,  দুইয়েতেই ছিল নিখাদ সরলতায় মোড়া সাবেকিয়ানার স্নেহাতুর পরশ।  ডাকের সাজের দুগ্গা ঠাকুরের অভিনব শিল্পকলায় যে স্বচ্ছতা থাকত তা যেন আজকের যুগে মলিনতায় পর্যবসিত হয়েছে,  যদিও দুই’এক জায়গায় আজও নজরে পড়ে যায় এহেন দেবীমূর্তি,  তবুও থিমের স্টাইলিশ ঝাঁ চকচকে মন্ডপসজ্জা আর আধুনিকতার পাল্লায় পড়ে আমাদের ছোটবেলার সাবেকিয়ানার নাভিশ্বাস উঠবার জোগাড়।  তবুও এই ধারাকে আজও বুকের কাছে আগলে রেখেছে বাগবাজার সার্বজনীন,  যাকে ছাড়া পুজোটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।  একচালার বিশাল আকৃতির দেবীমূর্তি যেন মাথা উঁচু করে রয়ে গিয়েছে।  এখনকার প্রতিযোগিতার ভরা বাজার এখানে ব্যতিক্রমী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নাড়ির টানটা অটুট রেখে দিয়েছে আমার মত সেকেলেপন্থীদের।  তথাকথিত স্মার্টনেসের মুখে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সাবেকিয়ানার সহজ সাবলীল স্পন্দনের সাথেই একাত্ম হতে বেশি ভালবাসি কারণ ওই হাফপ্যান্টের বয়স অবধি যে চোখের সামনে ‘আনস্মার্ট’ ভাবে থেকে যাওয়াটাই স্বাভাবিকতা ছিল।

 

মহালয়া মানে দেবীপক্ষের সূচনা, আর সেই আনকোরা ভোরবেলায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের  মায়াবী কণ্ঠের সেই পাঠ’কে পেশ করত দাদাইয়ের পুরোনো আমলের রেডিওটা।  মহালয়ার সাথে যার সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য।  আগের দিন রাতে বারবার মনে করিয়ে দিতাম যেন যে কোনোভাবেই আমাকে ডেকে দেওয়া হয়।  ভোরবেলা ঘুম ভাঙত মহালয়ার ‘আশ্বিনে শারদ প্রাতে…’ শুনতে শুনতে,  ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় আজও।  রোমকূপে শিহরণ জাগানো সেই মহালয়ার আমেজ আজ কিছুটা হলেও ফিকে হয়ে গেছে,  এখন ভোরে ঘুম না ভাঙ্গলে ইউটিউব আছে!দাদাইয়ের রেডিওটা গেছে অনন্ত নিদ্রায়,  শুধু শৈশবের স্মৃতির এক অনবদ্য চিহ্ন হিসেবে সেটা শোকেসবন্দী হয়ে রয়ে গেছে।  একবার হাজার ডাকাডাকি করেও আমার সুখনিদ্রা না ভাঙ্গায় সেবার মহালয়ার ভোরবেলাটা নাকের তলা দিয়ে পালিয়ে যায়।  ঘুম থেকে উঠে সকালে আমার কান্নার চোটে ঘরশুদ্ধু লোকজন ব্যতিব্যস্ত, সাতসকালে ওরম কান্না শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় মা ঠাম্মি আর বাবার তাতে বেজায় হাসি পায়। তারপর বাজারে গিয়ে হলধর ঘোষের মিষ্টির দোকানের কচুরি ছোলার ডাল আর গরমাগরম জিলিপির তৃপ্তি দিয়ে দাদাই সে যাত্রা রক্ষা পায়, আমার দুঃখও কিছুটা সান্ত্বনা পায় ওই উপাদেয় জলযোগ সেরে। এরপর হাতছানি দেবে টানা একমাস ইস্কুলের ছুটি যা এককথায় হাতে চাঁদ পাওয়ার মত। যদিও বন্ধুদের জন্য মন কেমন করত, একথা বলাই বাহুল্য, তবুও ছুটি সততই সুখের। হোমওয়ার্কের খাতা আর বই পত্রের মুখদর্শনে সাময়িক বিরতি, এটা ভাবলেই মজাটা দ্বিগুণ হয়ে যেত। নিয়মের ফাঁদ থেকে কিছুটা নিস্তার পেয়ে খুশিতে ডগমগ হওয়া,  সেদিন কি আর ভোলা যায়? না আছে ইস্কুলে যাওয়ার তাড়া বা নাকে মুখে গুঁজে বাসে চাপবার জন্য ছুট লাগানো, না আছে দিদিমণি বা মাস্টারমশাইয়ের ভ্রুকুটি কিংবা মায়ের উত্তম মধ্যম দাওয়াই-এই ক’টা দিন যেন খাঁচায় বন্দী পাখির স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়ার মত, খাঁচায় ফিরতে হবে জানলেও আনন্দ উপভোগ বা উদযাপন করায় কসুর কি? অতএব পুজো শুধু পুজো নয়, এ হল গিয়ে মুক্তির অনাবিল আবিলতা। সকাল সকাল দাদাইয়ের হাত ধরে বেরিয়ে পড়া,  দাদাই যাবে গঙ্গার ঘাটে,  তালই মানে দাদাইয়ের বাবার উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে। বাগবাজার ঘাট জুড়ে সেদিন হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণের সংস্কারকে লক্ষ্য করে। তার ঠিক পাশেই আছে কুমোরটুলি,  এখানে যেন পুজো সবার আগেই এসে হাজির হয়, জানান দিয়ে যায় মা আসছেন। রথযাত্রার দিন বনেদী বাড়িগুলোতে কাঠামো পুজোর রীতি চলে আসছে বহু আগে থেকেই, এমনকি বাগবাজারের পুজোও তার ব্যতিক্রমী নয়। কাঠামোয় এরপর খড় বেঁধে মূর্তির আদল দেওয়ার শুরু, খুব কাছ থেকেই ধীরে ধীরে প্রতিমা মূর্তি গড়ে ওঠবার শিল্পকর্ম পর্যবেক্ষণ করবার সৌভাগ্য হয়েছিল শৈশব থেকেই। বিকেলে মাঠের ধূলোবালি মেখে বাড়ি ফেরার পথে ওই কুমোরটুলির অলিগলি বেয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে ঠাকুর গড়ার কাজ দেখবার মজাই ছিল আলাদা। গণেশ দাদার পেল্লাই ভুঁড়ি বা সিংহমামার বিশাল হাঁ দেখে তাক লেগে যেত বটে। আর অসুরকাকুর চেহারা দেখে আঁতকে ওঠাটা অস্বাভাবিক কিছুই ছিল না। গঙ্গার ঘাটের দুইপাড় জুড়েই যেন তখন সাজো সাজো রব। পেঁজা তুলোর মত মেঘের আদানপ্রদানে মিলে যেত এপার ওপার। সমস্ত বিষয়ের জন্য তো তখন দুই একজন শিক্ষক শিক্ষিকাই বরাদ্দ থাকত, আমাদের কোচিং’য়ের ঠিক গা ঘেঁষেই ছিল মৃৎশিল্পীদের কারখানা, ঠাকুরের গায়ে রং লাগত যেদিন, মনটা উড়ুউড়ু হয়ে যেন পড়ার বইকে ফাঁকি মেরে ওদিকেই পড়ে থাকত। মায়ের হাত ধরে কোনো কোনোদিন গঙ্গার পাড়ে গিয়ে বিশুদ্ধ হাওয়া বাতাস মাখতাম যখন, সত্যি বলছি, পুজো পুজো গন্ধে যেন ম ম করত চারপাশটা। এখন যদিও হাজারো হোর্ডিং আর বিজ্ঞাপনের ঠেলায় এবং আরো বিবিধ কারণে ওই গন্ধটা বিলকুল উবে গেছে কর্পূরের মত, আজ আর সেই সুঘ্রাণ আমি অবধি পৌঁছয় না, হয়ত বয়সের বেড়াজালে আটকে গিয়েছে তার অবাধ যাতায়াত। তেলেভাজা থেকে শুরু করে হরেকরকমের মিষ্টির দোকান হল এই উত্তর কলকাতার অন্যতম প্ৰাপ্তি। গিরিশচন্দ্র দে ও নকুড় চন্দ্র নন্দীর মিষ্টি, ঐতিহ্য বজায় রেখেছে তার স্বাদে। আর যাই হোক না কেন, এর আভিজাত্য ছিল একঘর,  বাড়ি ফেরার পথে বাবার হাতে কিছু না কিছু মিষ্টির প্যাকেট থাকাটা ছিল অলিখিত নিয়মের মত। এই কলকাতার মধ্যেও আছে আরেকটা কলকাতা, তাতে আছে প্রাণের স্পন্দন, মাটির গন্ধ, আলাপচারিতার অবকাশ। পাড়ার রোয়াক জুড়ে দেখতাম আড্ডা জমেছে ব্যাপকভাবে, আলোচনার মূলে বিষয়েরও অভাব নেই। দাদুর বয়সী মানুষগুলোর প্রায় চুলোচুলির পর্যায় যাওয়া তর্কের নিরলস একটা আনন্দ উপভোগ্য ছিল একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে থেকে। পুজোর চাঁদা তোলা ঘিরে লেগে যেতে ধুন্ধুমার কান্ড। হাড় কিপটে কিছু কিছু লোককে জব্দ করবার জন্য হরেক ট্যাকটিক্স নেওয়া হত, যার মাস্টারপ্ল্যান করা হত ক্লাবে বসে। বাবা কাকা বা তাদের বন্ধুদের দেখেছি কাজকর্ম থেকে বাড়ি ফিরে অদম্য উৎসাহের সাথে বাড়ি বাড়ি ঘুরছে, ক্লান্তির লেশমাত্র নেই কোথাও, এরকম উদ্দীপনার আমেজের মঞ্চ গড়ে দিত দুর্গাপুজো। হলদে আলোর ল্যাম্পপোস্টে সারাবছর পাড়ার চেহারাটা যেন খোলনলচে বদলে ফেলত এই সময়। মাঠে প্যান্ডেলের বাঁশ পড়লে একটা হইহই রব পড়ে যেতে যেন। দেখতাম কি কুশলী কায়দায় কাকুগুলো অক্লেশে উঠে চড়ে যাচ্ছে একটু একটু করে প্যান্ডেলের কাঠামো তৈরি করতে করতে। যেদিন পাড়াজুড়ে আলো লাগানোর জন্য ঠেলাগাড়িটা এসে দাঁড়াত, কতখানি যে ভালো  লাগত তা ভাষায় প্রকাশ করবার নয়। আলোকোজ্জ্বল সাজে সেজে আমার পাড়াটাও আর পাঁচ জায়গার মত অপেক্ষা করে থাকত যেন ষষ্ঠীর মহাবোধনের জন্য। হলুদ রঙা বাল্বগুলো ঠিক চেইনফ্ল্যাগের মত করে টাঙিয়ে দেওয়া হত সমস্ত পাড়াটা জুড়ে, চতুর্থী বা পঞ্চমীর সন্ধ্যেবেলা যখন ওগুলো একসাথে জ্বলে উঠত, এতদিনকার প্রতীক্ষার সুমধুর অবসান ঘটত যেন। আগামী দিনগুলো জুড়ে শুধু আর শুধু হুলাবিলায় মেতে থাকা, ব্যস!

খুদে খুদে ছেলেমেয়েরা আজ ক্যাপ বন্দুক ভুলে দিব্যি অভ্যাস করে ফেলেছে মোবাইল গেমসের দুনিয়ার অবাধ যাতায়ত, কিন্তু মনে আছে ক্যাপ ফাটানোর মজাটা ছিল সেরার সেরা। ফি বছর পুজোয় একটা করে নতুন  বন্দুকও জুটে যেত দাদাই বা বাবার কাছ থেকে আর সঙ্গে থাকত লায়ন বা বুড়িমা কোম্পানির খোলতাই আওয়াজওলা ক্যাপ। সকালগুলোয় তখন আপনা থেকেই খুব তাড়াতাড়ি ঘুমটা ভেঙ্গে যেত আর চোখ মেলেই যেন এসে হাজির হত একটা অন্য জগৎ, বছরের বাকি দিনগুলোর একঘেয়ে রুটিনের থেকে ছুটি পেয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মত ডানা মেলে আকাশে উড়বার সময় এসে পড়েছে, এবার শুধু আলমারি থেকে নতুন জামাকাপড় বের করে স্নানটান সেরে ওসব গলিয়ে ক্যাপবন্দুক হাতে পাড়ায় বেরিয়ে পড়বার অপেক্ষা। অলিগলি বেয়ে পুজো মন্ডপের কাছাকাছি এসে শুরু হয়ে যেত বন্দুক তাক করে ক্যাপ ফাটানোর লড়াই, দুই বা তার বেশি দলে ভাগ হয়ে লুকোচুরি খেলার আদল নকল করে চলত এই মিছিমিছি যুদ্ধ। বয়সে বড় কোনো মানুষের পিছনে গিয়ে হঠাৎ করে ক্যাপ ফাটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুখ ছিল লুটোপুটি খাওয়ার মত, একটু আধটু বকাঝকা খেতে হলেও এই বদমাইশিগুলো ছিল মজাদার। এরপর ছিল দাদাই ঠাম্মির সাথে কাছে পিঠের ঠাকুর দেখতে বেরোনোর পালা, কোনো কোনোবার ওদের উৎসাহে ভাঁটা পড়লেও আমার একবগ্গা জেদের কাছে নতি স্বীকার করা ছাড়া উপায় ছিল না!কুমোরটুলি পার্ক, কুমোরটুলি সার্বজনীন,  আহিরিটোলা, বেনিয়াটোলা হয়ে হাতিবাগান অবধি ছিল এই পরিক্রমা। বাবা মায়ের হাত ধরে ট্রাম লাইন পথ হেঁটে বইপাড়ার কলেজ স্কোয়ারে পৌঁছে যেতাম, ওখানকার লাইটিং দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যেত। মহম্মদ আলি পার্কে এক একবার এক একরকম ঘটনা বা দুর্ঘটনার বিষয় নিয়ে তাক লাগানো মন্ডপসজ্জায় অভিনবত্ব ছিল দর্শনীয় ব্যাপার। এছাড়াও চালতাগান, তেলেঙ্গাবাগান, করবাগান হয়ে লেকটাউন শ্রীভূমি অবধি গিয়ে মোটামুটি সেদিনকার মত প্যান্ডেল হপিং শেষ হত। এর মাঝে শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো ছিল অন্যতম আকর্ষণ, বনেদিয়ানার ঔজ্জ্বল্য তার ঐতিহ্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এখানে। বাড়ি ফেরার পথে অবশ্যই বাবার ঘাড় ভেঙ্গে কোনো রেস্তোরাঁয় পেটপুজো সারতে পারলে মনোবাঞ্ছা পূরণ হত। কত শত মানুষ একসাথে বেরিয়ে পড়ে এই দিনগুলো প্রায় একই উদ্দেশ্য নিয়ে, গন্তব্যটাও সাদৃশ্যসম্পন্ন। সকল ধর্মের সকল সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে খুঁজে নিত উৎসবের আনন্দ, ভেদাভেদ সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মাতোয়ারা হত এই আনন্দে শরিক হতে। যদিও আজকের দিনে এই ঐক্যবদ্ধ রূপটা কিছুটা হলেও ভঙ্গুরতায় পর্যবসিত হয়েছে, কারণ কথাতেই আছে ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’। রাজনৈতিক অভিসন্ধি চরিতার্থ করার নিষ্ঠুরতার আঁচ এসে পড়ে এই দুর্গোৎসবেও। ছোটবেলায় এই সমস্ত বিষয়ে মাথাব্যাথা ছিল না ঠিকই কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে ক্রমবর্ধমান চাপানউতোরগুলো আশঙ্কার উদ্রেক ঘটায়। পরবর্তী প্রজন্ম হয়ত আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোর আস্বাদ পাবে না, কিন্তু হিংসার আগুনে যেন এই আনন্দঘন দিনগুলো মাটি না হয়, এই আশা রাখি।

 

অষ্টমীর দিন সকাল সকাল স্নান সেরে মায়ের সাথে যেতাম পুষ্পাঞ্জলি দিতে। সকাল থেকেই মাইকে প্রচার করা হত অঞ্জলির নির্ঘন্ট পেরোনোর আগে যেন সবাই এসে পড়ে। নতুন পাঞ্জাবি আর পাজামা গায়ে চাপিয়ে নিজেকে বেশ বড় বড় মনে হত, যদিও ওই খুদে খুদে হাত পায়ে ঠাকুরের পা অবধি অঞ্জলির ফুল পৌঁছত না। তাই পুরুতমশাইয়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়াতে পারলে এক্কেবারে মায়ের শ্রীচরণ অবধি মনোকামনা পৌঁছে যাবে, এই ছিল আমার অটুট বিশ্বাস। ধুনুচি নাচে পাল্লা দিয়ে আসরে নামত পাড়ার দাদা কাকুরা, সব মিলিয়ে জমজমাট ব্যাপার। ফি বছরই অষ্টমীর রাতে বাড়ি থেকে সারারাতব্যাপী পুজো পরিক্রমার প্ল্যানটা একপ্রকার বাঁধাধরা ছিল, যদিও একটা সময়ের পর প্রচুর হুল্লোড় করে ক্লান্ত আমি গাড়ির ভেতরেই ঘুমের দেশে পাড়ি দিতাম নিশ্চিন্তে। ঘুম যখন ভাঙত, দেখতাম পুবের আকাশ ফরসা হয়ে উঁকি দিচ্ছে নতুন দিনের সূর্য্যটা। হিমেল হাওয়া গায়ে মেখে বাড়ি ফিরতাম জানলার ধারের সিটে বসে। নবমীতে ছিল অন্য উত্তেজনা, পাড়ায় সেদিন প্যান্ডেল বেঁধে নবমী ভোগ খাওয়ানোর চল ছিল যেটা এখনো রয়ে গেছে। গরমাগরম লুচি আর ছোলার ডাল,  লম্বা লম্বা বেগুন ভাজা, ঘিয়ের হলদে পোলাও আর ছানার ডালনা দিয়ে এই ভোজ শুরু হত। শেষ পাতে চাটনি পাঁপড় রসগোল্লা আর মিষ্টি দই দিয়ে এই ভুঁড়িভোজে ইতি পড়ত। এর পাশাপাশি আমাদের অঞ্চলের দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলোর জন্যও পুজো কমিটির উদ্যোগে ওইদিন দুপুরে তাদের খাওয়ানোর বন্দোবস্ত করা হত। তখন হাতে বিশ পঞ্চাশ টাকা পাওয়া মানে ছিল বিশাল ব্যাপার, পকেট গরম আর কি। টুকিটাকি খাওয়ার অসুবিধা হত না। বন্ধুরা মিলে দল বেঁধে মণ্ডপের বাইরে গোল করে চেয়ার পেতে বসে গল্প করতাম কত কিছু নিয়ে। পালা করে একে অপরকে খাওয়ানো হত। আইসক্রিম কোল্ড ড্রিঙ্কস ভাজাভুজি রোল চাউমিন ইত্যাদি। যারা পুজোয় কলকাতা ছেড়ে ঘুরতে চলে যায়, তাদের প্রতি আমি সমবেদনা জানাই। কিছু মনে করবেন না, বিশ্বাস করুন, দূর্গাপুজোয় এই শহরকে বাদ দিয়ে অন্যত্র এক্কেবারে মন টেকে না। নবমী নিশি পোহালেই বেজে উঠত দশমীর করুণ সুর। কয়েকবার মণ্ডপে গিয়ে সন্ধিপুজোর সময়টা থেকেছি, দেখেছি একটা অন্য মাত্রার প্রশান্তি যেন বিরাজ করে চারপাশে। ধুনোর গন্ধ আর পুরুতমশাইয়ের মন্ত্রপাঠ মিলে সৃষ্টি হয় একটা নৈসর্গিক আবহ, যারা এই অভিজ্ঞতালব্ধ, নবমী নিশি যাপন করছেন, তারাই জানেন এর সুগভীর ব্যাপ্তিটা। দশমীর দিনটা ছিল যারপরনাই মনখারাপ হওয়ার মত, এক দেড় মাস আগে থেকে যার জন্য এত তোড়জোর উন্মাদনা, তারজন্য আবার গোটা একটা বছরের অপেক্ষা। আবার সেই একঘেয়ে রুটিনমাফিক জীবনে ফেরা, বইমুখো হওয়া, ইস্কুল টিউশন , নিয়মের মাঝে জড়িয়ে পড়া ব্যথাতুর মনের শৈশব যা বাস্তবিকই চাইত যেন নবমীর রাত্রি না ঘোচে। মা কাকিমা ঠাম্মিদের দেখতাম লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পড়ে মণ্ডপে যাচ্ছে প্রতিমা বরণ করতে, পান পাতা প্রদীপ মিষ্টান্নে ঘরের মেয়েকে এবার বিদায় জানানোর পালা,  নীলকন্ঠ পাখিও উড়ে গেছে উমার কৈলাসে ফেরার বার্তা নিয়ে। সিঁদুর খেলা শেষে ‘আসছে বছর আবার হবে’ ধ্বনিতে আকাশ বাতাস গমগম করত, ঢাকিও ওবারের মত ঢাকের বাদ্যিতে তাল তুলত ব্যাপকভাবে। উলুধ্বনি কাঁসর ঘন্টার শব্দে এবার বিসর্জনের পালা। মায়ের বরণ করার সময়ই আমি উপস্থিত সমস্ত সদস্যদের পায়ে, আর বেশি করে সরস্বতী ঠাকুরের পাদপদ্মে অংকের বইটা ছুঁইয়ে আশীর্বাদ চেয়ে নিতাম। পাড়া থেকে প্রসেশন বেরোত, তাতে পা মেলাত বয়সের সীমারেখা ভুলে অনেকেই। ঘাটে পৌঁছে দেবীকে সাতপাক ঘুড়িয়ে ‘বলো দুর্গা মা কি জয়’ এর গগনভেদী শব্দে প্রতিমা নিরঞ্জন সম্পন্ন হত। এসবের সাথে আজকের পুজোরও সাদৃশ্য আছে অনেক ক্ষেত্রেই কিন্তু সেই ছোট্ট ছেলেটার উৎসাহী অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তখনকার পুজো দেখবার নজরটা ছিল ভিন্নমাত্রারই,  তাই চাইলেও এই বয়সে দাঁড়িয়ে ওই দৃষ্টিটা ফিরে পাওয়া যাবে না। অতএব স্মৃতির পথে ফিরে খুঁজে নিতে চাইছি ওই মুহূর্তগুলো যার তীব্র অভাববোধ হয় ইঁদুরদৌড়ের এই জীবনে যেখানে শ্বাস ফেলবার সময়টুকুও নেই আমাদের কাছে। বাড়ি ফেরার পথে মন্ডপের ওই একলা প্রদীপটা যেন বড্ড বেদনাদায়ক, গোটা মণ্ডপটা খাঁ খাঁ করে, আর একলা জ্বলতে থাকে সেই প্রদীপটা। বাড়ি বাড়ি মিষ্টি নিমকি নাড়ুর ঢালাও রমরমা তারপর, ফাঁকতালে প্রণাম সারলেই উপাদেয় জিনিসগুলোর যোগান হয়ে যেত। তাছাড়াও বাড়ির বড়দের প্রণাম করার  পর খালি মুখে কেউই ছেড়ে দিত না। আধুনিকতা আমাদের ভঙ্গুরতাও দিয়েছে ভরপুর, তাই ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে এই অবধি এসে পৌঁছলেও এহেন রীতি রেওয়াজগুলো টিকে আছে। তবুও যেখানে আজো অনাহারে বা অর্ধাহারে মানুষ মারা যায় বা আত্মহননের পথ বেছে নেয় হকের টাকা না পাওয়া শ্রমিক কৃষক, সেখানে পুজো নিয়ে এরম রোমান্টিসিজম হয়ত বড্ড ক্লিশে। তবুও এই স্মৃতিগুলো ভাগ করে নিতে ইচ্ছে হলো সব্বার সাথে। উৎসবে একদিন মুখর হতে পারবে সমস্ত মানুষ, এই আশা করি, যদি কখনো এই দিবাস্বপ্ন সত্যি হয়ে যায়।

এই ছিল ছোটবেলার ফেলে আসা দিনের দুর্গাপুজো, যা শৈশবের অনেকখানি জুড়ে রয়ে গেছে, আমৃত্যু থেকেও যাবে আর থাকবে আক্ষেপটা ওই সময়ে না ফিরতে পারার জন্য। তখনও ব্যস্ততা ছিল কিন্তু তার মাঝেও মানুষ হালহকিকত জিজ্ঞেস করতে ভুলত না। দেখনদারির প্রতিযোগিতায় ডুবে প্রাণের স্পন্দনটা স্তব্ধ হয়ে যেত না, সাধারণের মধ্যেই যে আসাধারণত্বের সন্ধান পাওয়া যায়, সেটা উপলব্ধি করতে পারি বেশ। স্মৃতিরা মূলত দুর্গা পুজোর স্মৃতি সততই সুখের। আসলে দুর্গা পুজো নিছকই একটা পুজো নয়, এ হল এক অনবদ্য অনুভূতি যার স্পর্শকাতরতা অসীম। ছোটবেলার ধুলোয় মাখা এই অধ্যায়ের পাতায় সময়ের অনুপেক্ষনীয় ছাপ পড়লেও তা জীবন্ত হয়ে আছে মনের গভীরতম প্রকোষ্ঠে যার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পেরে যেন এর মধ্যে দিয়েই আরো একবার ফিরে যেতে পারলাম ছোট দেড় ফুটিয়া সেই ছেলেটার কাছে। কে জানে, হয়ত আপনাদেরও কেউ কেউ খুঁজে নিতে পারেন আপনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশকে, যে আজও খেয়ালে বেখেয়ালে উঁকি দিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকায় আর আবার মুচকি হেসে লুকিয়ে পড়ে ওই গলিপথের কোনো এক কোণে। সহজ সরল সাবলীল প্রাণবন্ত দুর্গাপুজো ছিল সমগ্র ছোটবেলাটা জুড়ে যার গুরুত্ব ওই খাবারে নুনের মত, যা ছাড়া কিছুতেই রুচি লাগে না…

 

 

Facebook Comments
শেয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *