অবতরণ (ঋতুপর্ণা মজুমদার)

 

এস্ক্যালেটর এর সামনে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করল তরী। হাতে বেশ কটা প্যাকেট এর মধ্যেই। পারবে তো নামতে? পা টলে যাবে না তো? কবজি ঘুরিয়ে ঘড়ি দেখল তরী – প্রায় সাড়ে তিনটে। খিদেও পাচ্ছে, এদিকে ঠিক ৪টে তে ডাক্তারের কাছে নাম লেখানো।

এদিক ওদিক দেখল একটু – নাহ – ভর দুপুরের শপিং মলে দু চারটে সিকিউরিটি গার্ড দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঢুলছে; এক আধ জোড়া কলেজ কেটে যুগলে ঘুরতে আসা ছেলে মেয়েরা ইতি উতি ঘুরছে ঠিকই, তবে এস্ক্যালেটরের কাছাকাছি কেউ নেই।

গতকাল সাত মাসে পড়েছে তরী। শরীর বেশ ভারি হয়ে এসেছে। এখন আগের মত দৌড়ঝাঁপ করতে পারে না; হাঁফ ধরে যায়। কোমরে খিঁচ লাগে। অফিস যাওয়াটাও কঠিন হয়ে উঠছে দিনদিন। এখন যেরকম এই চলমান সিঁড়ীটা – পেনাল্টি কিক এর মত লাগছে। নিচে নেমে যেতে পারলেই গোল পোস্টে বল, না পারলে নক আউট।

আর ঠিক কি কি কঠিন হয়ে উঠছে তরীর? এতদিনের সাজানো গোছানো জীবনের একেকটা পাতা কেউ যেন কাঁচি দিয়ে মহা সমারোহে কেটে দিয়েছে। জীবনের প্রতিটা ছন্দ এখন ভারি। টেনসানের দস্তাবেজে ঠাসা। রোজই যেন দিন শুরু হয় অন্ধকার দিয়ে। শেষ হয় শুধু ভয়ে, অনিশ্চয়তায়।

আর একবার সিঁড়ির দিকে তাকালো তরী। ওঠার সময় তো কোনও সমস্যা হল না, নামার সময়ে সিঁড়ি গুলোকে যেন পাহাড় মনে হচ্ছে। পাহাড় চড়া তরীর কাছে সব সময়েই জলের মত সোজা যে। কিন্তু ডিঙিয়ে নামবে কি করে তরী! এই অবতরণটাই যে কি ভীষণ অস্বস্তির! নিজের অজান্তেই তলপেটে হাত চলে গেলো তরীর। পঁচিশ সপ্তাহ হয়ে গেছে, এখনও মুভমেন্ট ফিল করেনি একবারও তরী। করবে কিনা জানেও না। আরও কতো কি জানে না তরী। জানে না কি হতে চলেছে; যত দিন এগোচ্ছে, তত আরও বেশি করে টেস্ট, আরও ওষুধ, আরও ডাক্তারের শলাপরামর্শ।

হতো না। এসব কিছুই হতো না, সামনে এগোনোর রাস্তা এতো বেশি বোল্ডারময় বলে মনে হতো না যদি না সমীরণের এবং আরও সকলের কথা মত অ্যাবরশানটা করে নিতে রাজি হতো। অনেক চেষ্টা করেছিল সমীরণ। তরীকে বোঝানোর। বলেছিল, “উই ক্যান ওয়ার্ড অফ দ্য রিস্ক।” আর বলবে নাই বা কেন। একজন সাকসেসফুল ব্যাংকার জেনে শুনে জীবনে এতো বড় রিস্ক নেবে কেমন করে! বাচ্চা তো আবারও আসবে। “আরও দু-তিন বার ডেট দেখে লাগাতে পারলেই হল।” বলেছিল সমীরণ। ঘাড় বেঁকা, হাত বেঁকা দলাপাকানো একটা বাচ্চা কে জেনে শুনে জন্ম কেন দিতে হবে কোনও কারণ খুঁজে পায়নি সমীরণ। কিন্তু কোন প্রানে নষ্ট করবে তরী বাচ্চাটা? এতো শুধু বাচ্চা নয় – তরীর জীবনের প্রথম ধাক্কা, প্রথম চ্যালেঞ্জ। “ডাউন সিনড্রোম” তার জীবনের প্রথম প্রতিকূলতা! দু-হাত বাড়িয়ে তাকে গ্রহন করা ছাড়া আর কিই বা করতে পারত তরী!

সমীরণ শেষ পর্যন্ত পারলো না, ছেড়ে দিল তরীকে। বাচ্চা জন্মানোর আগেই ডিভোর্সটা সেরে ফেলে ঝাড়া হাতপা। আর জরি? তরীর যমজ বোন জরি? সেই বা কি পারলো? সারাটা জীবন ফোঁস করে ফণা তুলে এসেছে যে জরি, সারা জীবন তরীকে ঘেন্নাকে করে এসেছে যে জরি, কিরকম যেন কাঠের পুতুলের মত হয়ে গেছে।

জরি আর তরী। এক মায়ের পেটের দু’বোন যেন দুই ভিন্য সূর্য মাথায় নিয়ে জন্মেছে। স্কুলের পরীক্ষা, গানের প্রতিযোগিতা – সবেতেই তরী সেরা। তরী ছাড়া পাড়ার নৃত্যনাট্য, আবৃতির অনুষ্ঠান অসম্ভব। স্কুল, কলেজ, সেখান থেকে আমেরিকায় পড়তে যাওয়া, ভাল চাকরি, সমীরণের সাথে প্রেম, বিয়ে, গাড়ি, বাড়ি – তরীর হাতের রেখা যেন স্কেল দিয়ে আঁকা স্ত্রেট লাইন। কোথাও এক চিলতে পা পিছলানো নেই, বাবা-মা’র রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া নেই, বন্ধুদের সাথে ঝগড়া নেই। মরমে মরে যেত তরী যখন রেজাল্ট তালিকায় তরীর নাম থাকতো সবার উপরে, আর জরি অনেক তলানিতে। জরি রাগে ফুঁসত, হিংসে করত। চু-কিতকিত খেলতে গেলে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিত, বলতো, তুই আমার দলের নস। নিজের ব্যর্থতার দায়ভার চাপাত তরীর ঘাড়ে। হিস হিস করে বলতো এসে তরীকে, কষ্ট কি জিনিস জানিস? না পাওয়ার মানে কি জানিস? শুনে লজ্জায় মিশে যেত তরী। মনে হতো কেন সে জানে না ব্যর্থতার সংজ্ঞা? কেন তার চলার পথ বরাবর মাখন।

সম্পর্ক রাখেনি জরি। পাশের পাড়ার রুবালদা কে পালিয়ে বিয়ে করে সেই যে বাড়ি ছেড়েছিল আর আসেনি।

এসেছিল সেদিন – যেদিন পেটে পাঁচ মাসের বাচ্চা নিয়ে সমীরণের বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি পাকাপাকি ভাবে চলে এলো তরী। কথা বলেনি একটাও। শুধু নিঃশব্দে তরীর পাশে এসে বসেছিল অনেকক্ষণ পাথরের মত চোখ নিয়ে। সে চোখের ভাষা পড়তে পারেনি তরী। শুধু নিজের চোখ দিয়ে বার বার বলেছে জরিকে, আমাকে দলে নে জরি। আমিও জানতে চাই কষ্ট কি। না পাওয়ার ব্যর্থতা কি।

আর সবার মত অস্ফুটে মাও একদিন থাকতে না পেরে জিগ্যেস করেছিল তরীকে, কেন এমনটা করছিস! বুঝতে পারেনি ঠিক কোন কাজটার কথা বলছে মা। ডিভোর্সটা নাকি হয়ত দুটোই! কি করে জরি কে, মাকে, বাকি সব্বাইকে বোঝায় সে, যে এই রোজকার অনিশ্চয়তা, দিন রাত্তিরের চ্যালেঞ্জ তার কাছে এক বুক ভরা নিঃশ্বাস। ওর জীবনের এই প্রথম অবতরণ।

“এক্সকিউজ মি”, পিছনর আওয়াজে স্তম্বিত ফিরল তরীর। পেছন ঘুরে দেখল দুটো কম বয়েসি মেয়ে এক  মুঠো বিরক্তি নিয়ে তার দিকে চেয়ে আছে। এস্ক্যালেটরের মুখ জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছিল তরী। কতক্ষণ কেটে গেছে কে জানে, চকিতে ঘড়ি দেখল তরী – পউনে চারটে। নাহ – এবার দেরী করলে অ্যাপয়েন্টমেন্টটা মিস করবে সে। কিন্তু নামবে কি করে – পড়ে যায় যদি? একবার ভাবল সরে দাঁড়ায়, মেয়ে দুটো চলে যাক। পরোক্ষনেই ভাবল, না। নামতেই হবে ওকে। কাঁধের ব্যাগটাকে আরও কাঁধের ভেতরের দিকে ঠেলে হাতের প্যাকেট গুলো মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরল। মাথা উঁচু করে চলন্ত সিঁড়িতে পা বাড়াল তরী। প্রথম অবতরণ।

 

Facebook Comments
শেয়ার

2 Replies to “অবতরণ (ঋতুপর্ণা মজুমদার)”

  1. বর্তমানের চালচিত্র ধরা পড়ে গল্পে। ভালো লাগল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *